অকেজো এম্বুলেন্স অকেজো স্বাস্থ্যসেবারই চিত্র

ধর্মপাশা ও তাহিরপুর হাওর অধ্যূষিত এলাকা হিসাবে জনগণের স্বাস্থ্যসেবা জোরদারকরণে সরকার নৌ এম্বুলেন্স সরবরাহ করেছিলেন। কিন্তু এই নৌ এম্বুলেন্সগুলো রোগীদের কল্যাণে একদিনও ব্যবহার করা যায়নি। কারণ নৌ এম্বুলেন্স দেয়া হলেও এর কোন চালক দেয়া হয়নি কোথাও। বহু মূল্যবান নৌ এম্বুলেন্স দুইটি অকেজো পড়ে পড়ে বিনষ্ট হয়ে সরকারি অর্থের অপচয় ঘটিয়েছে। গতকাল দৈনিক সুনামগঞ্জের খবরে প্রকাশিত একটি সংবাদ থেকে জানা যায়, জামালগঞ্জ উপজেলার এম্বুলেন্সটি (নৌ এম্বুলেন্স নয়) চালকবিহীন অবস্থায় গ্যারেজে পড়ে থাকতে থাকতে নষ্ট হওয়ার দ্বারপ্রান্তে পৌঁছেছে। খোঁজ নিলে জানা যাবে, আরও বহু উপজেলায় এরকম চালক না থাকার কারণে এম্বুলেন্সগুলো নষ্ট হচ্ছে। সম্পদ ক্রয় করে ব্যবহার না হলে এর কোন উপযোগিতা তৈরি হয় না। ওই সম্পদ অর্জনের জন্য যে পরিমাণ অর্থ ব্যয় করা হয় তার পুরোটাই তখন অপব্যয় হিসাবে বিবেচিত হয়। শুধু এম্বুলেন্স কেন, হাসপাতালের আরও বহু ক্ষেত্রে এরূপ অপচয়ের বিশাল বিশাল কাহিনি ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে। যেমন প্রায় সকল হাসপাতালেই এক্সরে মেশিন আছে। কিন্তু টেকনিসিয়ান না থাকা কিংবা অন্য কোন কারণে অধিকাংশ উপজেলাতেই এইসব এক্সরে মেশিন দিয়ে রোগীদের কোন পরীক্ষা-নীরিক্ষা করা সম্ভব হয় না। শুধু এক্সরে মেশিন কেন আরও বহু মূল্যবান যন্ত্রপাতি হাসপাতালগুলোতে রয়েছে যা ব্যবহার করা সম্ভব হয় না। বহু যন্ত্রপাতি যেভাবে বাক্সবন্দী অবস্থায় আসে সেভাবেই গোদামে পড়ে থাকতে থাকতে একসময় পরিত্যক্ত হয়ে যায়। এই যে ঘোড়ার আগে গাড়ি জোড়ে দেয়ার সংস্কৃতি সেটি আমাদের জাতীয় অর্থনীতির কী পরিমাণ ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে তার কোন পরিসংখ্যান কখনও প্রকাশ করা হয় না। যদি এরূপ পরিসংখ্যান প্রকাশিত হত তাহলে তার পরিমাণ শুনে অনেকেই ভিরমি খেতেন।
এই যে জামালগঞ্জ বা অন্য যেকোন উপজেলা হাসপাতালে এম্বুলেন্সগুলো চালক না থাকার কারণে অথবা অন্যান্য যন্ত্রপাতি অব্যবহৃত পড়ে আছে, তাতে ক্ষতি হচ্ছে কার? আসল ক্ষতিটা হচ্ছে হাসপাতালে আসা সেবগ্রহীতা রোগীদের। সরকারি সেবা প্রাপ্তি থেকে তারা বঞ্চিত হচ্ছেন। অন্যদিকে এইসব সেবা বেসরকারি ব্যবস্থাপনা থেকে ক্রয় করে তারা বড় অংকের আর্থিক লোকসানের সন্মুখীন হচ্ছেন। সরকারি হাসপাতালে এখন আর সামর্থ্যবান কেউ চিকিৎসা নিতে আসেন না। আর কোন উপায় নেই যাদের, অর্থাৎ আর্থিকভাবে অস্বচ্ছল ব্যক্তিরাই কেবল রোগ সারাতে সরকারি হাসপাতালের দ্বারস্থ হন। হাসপাতালে এসেও তাদের নিস্তার নেই। পরীক্ষা-নীরিক্ষা, ঔষধপথ্য মায় বড় হাসপাতালে যেতে এম্বুলেন্স; সবই তাদের পয়সা খরচ করে পেতে হয়। অর্থাৎ গরিব মানুষই এই আর্থিক চাপের মধ্যে পড়ছেন। স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানের এই সেবা সক্ষমতার অভাব আমাদের দারিদ্র দূরিকরণের পথে অন্যতম অন্তরায় বলা হলে কোন অন্যায় হবে কি?
উন্নত হচ্ছে বটে দেশ। তবে সেই উন্নয়ন সুষম নয়। এমন অসম এই উন্নয়ন, যা আকাশ পাতাল ব্যবধান। এমন অসম উন্নয়ন একটি দেশের প্রকৃত উন্নয়ন হিসাবে বিবেচিত হতে পারে না। দেশের অধিকাংশ মানুষকে নানা ধরনের বঞ্চনা করে ও সুযোগ সুবিধার বাইরে রেখে কখনও আমরা তৃপ্তির ঢেকুর তুলতে পারি না। যেমন পারি না, বিভিন্ন হাসপাতালে এম্বুলেন্স ও যন্ত্রপাতিগুলো অকেজো রেখে স্বাস্থ্যসেবার উন্নয়নের চিত্র আঁকতে।