অগ্রিম টাকা দিয়েও শ্রমিক মিলছে না হাওরে

বিশেষ প্রতিনিধি
আবহাওয়া অনুকূলে থাকলে বৈশাখের ৭-৮ তারিখেই হাওরজুড়ে শুরু হবে ধান কাটা। কিন্তু সুনামগঞ্জের সর্বত্র এবার ধান কাটা শ্রমিকের সংকট রয়েছে। গত বছর হাওর তলিয়ে যাওয়ায় দরিদ্র কৃষি শ্রমিকরা এলাকা ছেড়ে কাজের সন্ধানে অন্যত্র চলে যাওয়ায় এই সংকট বেড়েছে।
সুনামগঞ্জের হাওরে ধান কাটার জন্য এক সময় কুমিল্লা, নোয়াখালী, পাবনা, বগুড়া, ফরিদপুর, ভৈরব ব্রাহ্মণবাড়িয়া, ময়মনসিংহসহ উজান এলাকা থেকে কৃষি শ্রমিকরা ধান কাটতে আসতেন। সাত বা ৮ ভাগে ধান কাটতেন এসব শ্রমিকরা। গত ১৫ বছর ধরে ভাগালো এসব শ্রমিকরা আসছেন না। এখন ৪-৫’এর ভাগে, কোন কোন ক্ষেত্রে আধাআধি হিসাবে ধান কাটাচ্ছেন কৃষকরা।
বিশ্বম্ভরপুরের করচার হাওরপাড়ের রাধানগরের কৃষক কফিল আহমদ বলেন,‘১৫ বছর আগেও পৌষ মাসে ফরিদপুরসহ বিভিন্ন জেলা থেকে ভাগালো শ্রমিকরা এসে কৃষকদের অগ্রিম টাকা দিয়ে বিশ্বাস অর্জন করে যেতেন। পরে বৈশাখে এসে ধান কাটতেন। শ্রমিকরা পৌষ মাসে আসার সময় শুকনা গুড়, পাটালি গুড়সহ নানা উপঢৌকন কৃষকদের জন্য নিয়ে আসতেন। যাওয়ার সময় ধান বা নগদ টাকা দিয়ে তাদের অগ্রিম দেওয়া টাকা শোধ করার পাশাপাশি তাঁদেরকেও উপঢৌকন হিসাবে পাঠা- খাসি দিয়ে দিতেন কৃষকরা। এখন এসব কথা গল্পের মতো মনে হবে। বাইরের এই শ্রমিকরা এখন আর আসেন না। ভাটি অঞ্চলের চেয়ে তাদের এলাকা এখন সমৃদ্ধ।’
দিরাই উপজেলার কালিকোটা হাওরপাড়ের রাজাপুরের গৃহস্থ আব্দুস সাত্তার বললেন,‘আমি ৮ হাল (৪৮ একর) জমি চাষাবাদ করেছি। ৩-৪ দিন পর ধান কাটা শুরু হবে। দিরাই-শাল্লায় অনেক খোঁজাখুঁজি করেও শ্রমিক পাইনি। শেষে
বিশ্বম্ভরপুরের চিনাকান্দি ও মঙ্গলকাটা থেকে ২২ জন শ্রমিক মিলিয়েছি, তারা প্রতি কেয়ার (৩০ শতক) ২ হাজার টাকা করে কেটে খলায় কেবল এনে দেবে। মাড়াইসহ অন্যান্য দায়িত্ব আমাদের নিজেদের।’ তিনি জানান, অনেকে শ্রমিক পাচ্ছেন না, যারা ফাল্গুন মাসে বা চৈত্রের প্রথম দিকে কথা বলেছেন তারা ছাড়া অন্যরা ধান কাটার শ্রমিক অগ্রিম টাকা দেবার শর্তেও মেলাতে পারছেন না।
দেখার হাওরপাড়ের জালালপুরের কৃষক ফজলু মিয়া বললেন,‘গত বছর ধানের গোটা আসার আগেই হাওর ডুবায় জীবিকার তাগিদে হাওরপাড়ের গ্রামগুলোর শ্রমিকরা ভোলাগঞ্জ-কোম্পানীগঞ্জ, ঢাকার গার্মেন্টস ফ্যাক্টরীসহ বিভিন্ন অঞ্চলে কাজে চলে গেছে। এদের বেশিরভাগেই ফিরে নি। এখন শ্রমিক পাওয়া যাচ্ছে না। তাহিরপুরের লাউড়ের গড়, বিশ্বম্ভরপুরের পলাশ চিনাকান্দি এলাকা থেকে অন্য বছর শ্রমিকরা ধান কাটতে আসে। ওখানে গিয়েছিলাম শ্রমিক আনতে তারা বললো, বৈশাখ মাসে ধানের মূল্য থাকে ৫-৬’শ টাকা মণ, ধান কাটতে গেলে দিনে ১ মণের মতো রোজগার করা যায়। কিন্তু বালু-পাথরের মহালে কাজ করলে দিনে হাজার-বার’শ টাকা মিলে।’ একই সমস্যার কথা জানালেন, দেখার হাওরপাড়ের জালালপুরের কৃষক জামাল উদ্দিন এবং নাগের গাঁওয়ের সচিন্দ্র কুমার দাস। এই কৃষকরা জানালেন, তাহিরপুরের ফাজিলপুর, সুনামগঞ্জ-বিশ্বম্ভরপুরের ধোপাজান, দোয়ারা ও ছাতকের সীমান্ত নদীগুলোতে বালু-পাথর উত্তোলন ধান কাটার মৌসুমে কয়েকদিন বন্ধ রাখলে শ্রমিকরা হাওরে ধান কাটতে আসবে। অন্যথায় ফসল কাটতে কাটতে বিপদের আশংকাও দেখা দিতে পারে।
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ বিভাগের উপ-পরিচালক স্বপন কুমার সাহা বলেন,‘ধান কর্তনের জন্য কিছু আধুনিক যন্ত্রপাতি শীঘ্রই চলে আসবে। যেমন রিপার, কম্বাইন্ড হার্ভেস্টার, মিনি কম্বাইন্ড হার্ভেস্টার এগুলো আসবে। আগেই কৃষকদের তালিকা পাঠানো হয়েছে। ৭০ ভাগ ভর্তুকি মূল্যে এসব যন্ত্রপাতি দেওয়া হচ্ছে। এছাড়া সুনামগঞ্জের বালু-পাথর মহালগুলোতে প্রচুর শ্রমিক কাজ করেন। কয়েকদিন বালু-পাথর মহাল বন্ধ রাখার জন্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সঙ্গে কথা বলছি আমরা। তাহলেই বালু-পাথর শ্রমিকরা ধান কাটতে যাবে এবং শ্রমিক সংকটও কেটে যাবে।’



আরো খবর