অণুজীবের হাত থেকে বাঁচার লড়াইয়ে আমরাই জিতব

৮ মার্চ প্রথম কোভিড-১৯ রোগী শনাক্তের পর ইতোমধ্যে ৫৭ দিন অতিক্রান্ত হয়ে গেলেও অবস্থা উন্নতির কোনো লক্ষণ দৃশ্যমান নয়। ৪ মে শনাক্তকৃত রোগী সংখ্যা ১০ হাজার অতিক্রম করে ফেলেছে। গত কিছু দিন ধরে প্রতিদিনই শনাক্তকৃত রোগী সংখ্যা বাড়ছে। এই অবস্থা কোথায় গিয়ে দাঁড়াবে সে সম্পর্কে জাতীয় আন্তর্জাতিক কোনো পর্যায় থেকেই কোনো ভবিষ্যৎবাণী শুনা যাচ্ছে না। এক অজানা চরিত্রের ঘাতক অণুজীবের কাছে আজ পুরো বিশ্ব অসহায়ভাবে আত্মসমর্পণ করে বসে আছে। প্রতিটি শতকে এমন মানবতা বিপর্যয়কারী দুর্যোগ আসে। কিন্তু শতকÑ সে তো বর্তমান মানুষের অদেখা এক বিষয়। তাই প্লেগ, ইনফ্লুয়েঞ্জা, গুটি বসন্ত কিংবা কলেরায় কোটি কোটি মানুষ মরার ইতিহাস থাকলেও আজ যখন করোনায় মৃত্যুর সংখ্যা আড়াই লাখে পৌঁছে যায় তখন পৃথিবীর প্রতিটি মানুষ আতংকে নিজের মধ্যে গুটিয়ে পড়ে। কারণ জ্ঞানে বিজ্ঞানে চরম উৎকর্ষ বলে দাবিদার আজকের পৃথিবীর মানুষ নতি শিকার করতে অভ্যস্ত নয়। কিন্তু মানুষের যে বিজ্ঞান সাধনার জায়গায় থেমে থাকার কোনো উপায় নেই, মানুষ যে সর্বজয়ী হয়ে উঠতে পারেনি, পারবেও না কখনও, নিরন্তর টপকে যেতে হবে বর্তমানকে; প্রকৃতি শত বছরে একবার করে হলেও তা মানুষকে মনে করিয়ে দেয়। তবে পাথর ঘসে ঘসে আগুন জ্বালতে শিখা যে মানুষ এখন গ্রহান্তরেও আধিপত্য প্রতিষ্ঠার কাজ শুরু করছে সেই অদমনীয় মানুষের হাতে যে করোনার পরাজয় ঘটবেই, এই অবধারিত সত্যও আমরা জানি। আর জানি বলেই ভরসা মানুষে, মানুষের আবিষ্কারে, জ্ঞান-বিজ্ঞান সাধনায়।
বাংলাদেশ সরকার পর্যায়ক্রমে ২৬ মার্চ থেকে সাধারণ ছুটি বাড়িয়ে বাড়িয়ে ১৬ মে পর্যন্ত করেছেন। এই ছুটি বাড়ানোর অর্থ হলোÑ মানুষকে ঘরে আটকে রেখে করোনার আক্রমণ থেকে রক্ষা করা। একে লকডাউন বলা হচ্ছে। কিন্তু বাংলাদেশের বাস্তবতায় লকডাউন শব্দটি এখন একেবারেই অর্থহীন হয়ে পড়েছে। জীবন ও জীবিকার কারণে, সংস্কৃতি ও অভ্যাসের বশে প্রতিনিয়তই মানুষ ঘরের বাইরে বেরিয়ে আসছেন। যেন সকলেই পণ করেছেÑ থাকবো নাকো বদ্ধ ঘরে, দেখব এবার জগৎটাকে। কিছু সরকারি সিদ্ধান্তও মানুষের এই হালকা মন মানসিকতাকে উসকে দিয়েছে। যেখানে সাধারণ ছুটি বাড়িয়ে মানুষের ঘরে থাকা নিশ্চিত করার বিষয়টি সরকার বুঝাতে চাইছে সেখানে গামেন্টস খোলে দিয়ে, ১৮ টি মন্ত্রণালয়ের অফিস খোলে দিয়ে, সীমিত আকারে দোকান পাঠ খোলা রাখার অনুমতি দিয়ে কখনও মানুষকে ঘরে আটকে রাখা সম্ভব হবে বলে আমরা মনে করি না। একটি মহামারী থেকে বাঁচতে দুই বা তিন মাস জরুরি পরিসেবা ছাড়া অন্য সবকিছু বন্ধ করে রাখতে পারব না, এমন কথা আমরা মানতে নারাজ। ব্যাপকভাবে মানুষ আক্রান্ত হলে অর্থনীতির চাকা কাকে রক্ষা করবে? অর্থনীতি আগে না মানুষ আগে, এই জায়গায় পরিষ্কার হতে হবে আমাদেরকে। মাঝামাঝি অবস্থান স্পষ্টতই বিপদ ডেকে আনবে।
এই দুর্যোগে নি¤œবিত্ত ও নি¤œমধ্যবিত্ত সম্প্রদায় সবচাইতে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন। তবে নি¤œ মধ্যবিত্তদের অবস্থা ত্রিশঙ্কুর মতো। এরা না অভাবের কথা মুখ ফুটে বলতে পারে, না ক্ষুধার জ্বালা সহ্য করতে পারে। এই চরম অসহায়গ্রস্ত মানুষের পাশে সরকারকে সব সামর্থ নিয়ে দাঁড়াতে হবে। মৌচাকের মধু আহরণকারী পোশাক স¤্রাটদের প্রণোদনা দিয়ে আখেরে কোনো লাভ নেই। বরং ওই অসহায় মানুষগুলোকে বাঁচিয়ে রাখলে আবারও ঘুরে দাঁড়াবে বাংলাদেশ।
আর বাঁচাতে হবে কৃষি। আমরা বরাবরই অটল বিশ্বাসের সাথে বলে আসছি, কৃষিই আমাদের অর্থনীতির মেরুদ-। স্বয়ং প্রধানমন্ত্রীও বলেছেন, এই দুর্যোগে আমাদের কেবল বাঁচাতে পারে কৃষি। সুতরাং কৃষি খাতকে সর্বাধিক গুরুত্ব দিয়ে যাবতীয় পরিকল্পনা ও প্রণোদনা প্যাকেজ ঘোষণা করতে হবে।