অন্তিম শয়নে বীর মুক্তিযোদ্ধা খসরু, আমরা প্রদীপ্ত হবো আপনাকে ধারণ করার অমেয় অঙ্গীকারে

সাড়ে তিন হাত মাটির কবরে অন্তিম শয়নে শায়িত হলেন বীর মুক্তিযোদ্ধা বজলুল মজিদ চৌধুরী খসরু। বৃহস্পতিবার জানাজা ও অসংখ্য ভক্ত-অনুরাগী- স্বজনের ফুলেল ও অশ্রুসিক্ত শ্রদ্ধা-ভালোবাসায় সিক্ত হয়ে, রাষ্ট্রীয় অভিবাদন নিয়ে ওই শেষ ঠিকানার আশ্রয়ে চলে গেলেন তিনি। অন্তিম বিদায় বলছি আমরা একে। কিন্তু আসলেই কি এর নাম বিদায়? শারীরিক অনুপস্থিতিই কি কোনো ব্যক্তিকে বিস্মৃতির নিঃসীম অন্ধকারে ঠেলে দিতে পারে ? নিশ্চয়ই না। শতহাজার বছর পেরিয়েও কীর্তিমান বহু মনীষী আজও আমাদের দৈনন্দিন চর্চার বিষয়বস্তু রয়ে গেছেন। অতীত ছাড়া বর্তমান কিংবা ভবিষ্যৎ রচিত হয় না, বরং বলা চলে অতীতের ভিত্তির উপরই তৈরি হয় বর্তমান। এই ভিত্তিই আমাদের নিয়ে চলে ভবিষ্যতের দিকে। অতীত-বর্তমান-ভবিষ্যতের মধ্যে সেতুবদ্ধ কি ? ওই সেতুবদ্ধের নাম হলো- কীর্তি। কীতিমানরা সুকৃতির কারণে সেতুর এক একটি স্তম্ভ রচনা করেন। ওই স্তম্ভ রচনার কাজ শুরু হয়েছিলো মানবসভ্যতার আদিকাল থেকেই। আমরা আজ যেখানে দাঁড়িয়ে আছি সেটি হাজার-লক্ষ বছর ধরে নির্মিত অসংখ্য স্তম্ভের উপর তৈরি হওয়া সুবিশাল পাটাতন ছাড়া আর কিছু নয়। এটি দিনে দিনে আরও সমৃদ্ধ হবে। সভ্যতা এভাবেই একটি গাঁথা মালার মতো পরস্পর সংলগড়ব থেকে μমশ নিজের পরিধি বাড়িয়ে চলেছে। এই জায়গায় ব্যক্তি মানুষের ছোট-বড় সমস্ত সুকীর্তিগুলোই এক একটি ফুলের অহংকার হয়ে গেঁথে আছে।
বজলুল মজিদ খসরু ইতিহাসের ওই মালার একটি ফুল। সুতরাং তিনি আছেন-থাকবেন। আমাদের যাবতীয় প্রাত্যহিকতায়, ভাবী প্রজন্মের প্রগতির উচ্চারণে, অধিকারকামী মানুষের সশব্দ মিছিলে, আমাদের চিন্তা-চেতনার অলিতে-গলিতে থাকবে তাঁর সদম্ভ অবস্থান। এইভাবেই তিনি বেঁচে থাকবেন। সুতরাং তাঁর শারীরিক বিদায়কে আমরা বিদায় বলছি না। তাঁর আদর্শিক ও চেতনাগত অবস্থানটিকে আমরা তাঁর প্রোজ্জ্বল বিচরণ হিসাবে অমরত্বের আঙ্গিকে বিবেচনা করব। তিনি বেঁচে থাকবেন তাঁর আদর্শবাহী কোনো প্রৌঢ়, যুবক, তরুণ, কিশোর; এদের মাঝে।
সময়ের ব্যবধানে নাম পাল্টাবে, চরিত্র পাল্টাবে; কিন্তু খসরুর যে চেতনা, যেটি তিনিও পেয়েছিলেন অনাদী উত্তরাধিকারিত্ব থেকে; সেটি কেবল এগিয়েই যাবে। শোকগ্রস্ততা কেটে যাবে, আর তখন সেখানে জেগে উঠবে দীপ্ত শপথ। সেই শপথ হলো- একজন মুক্তিযোদ্ধা, একজন মুক্তিযুদ্ধ চর্চাকারী, একজন সুলেখক, একজন পরিব্রাজক, একজন আইনজীবী, একজন সংগঠক, একজন মানবতাবাদী, একজন সুসংস্কৃতিবান, একজন অভিভাবক খসরুর অবয়বে নিজেকে তৈরির। এইভাবে আমরা তাঁকে বাঁচিয়ে রাখব। এই হলো আমাদের অঙ্গীকার। তিনি যে সাহস দেখিয়েছেন ইতিহাসের অনুঘাটিত তথ্য চয়নে, তিনি যে অমিত বিক্রম দেখিয়েছিলেন ফসলহারা কৃষকের অধিকার রক্ষায়; তার সবকিছুই এই অঞ্চলের অনবদ্য অহংকার। তিনি মুক্তিযোদ্ধা ছিলেন। সে নিয়ে তাঁর অহংকার ছিলো কিন্তু ছিল না বাড়াবাড়ি। তিনি মনে করতেন সময়ের প্রয়োজনে ওইসময় তাঁর যা করার সামর্থ ছিলো সেটি তিনি করেছেন। দেশের প্রতি ওই কর্তব্যবোধকে তিনি কখনও দোকানের প্রদর্শনীবাক্সে তুলতে দেননি। বরং তিনি দেখিয়ে দিয়েছেন একজন
মুক্তিযোদ্ধার স্বাধীন দেশে কী কর্তব্য। একদিকে তিনি মুক্তিযুদ্ধের আঞ্চলিক ইতিহাসকে বিলুপ্তির হাত থেকে বাঁচিয়ে রাখায় নিয়োজিত থেকেছেন অন্যদিকে মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে সর্বত্র ছড়িয়ে দিতে নিরস্তর শ্রম দিয়ে গেছেন। এই রকম কর্তব্যবোধ সকলের থাকে না। তাই তিনি অনন্য। আর অনন্য কর্মপুরুষরা কখনও মানুষের-ইতিহাসের-অঞ্চলের স্মৃতি থেকে বিস্মৃত হন না। তাঁরা সময়ের অনন্ত অদৃশ্য সুতোয় মুক্তোদানার মতো নিজেকে অস্তিত্ববান রাখেন। তাই বিদায় নয় বীর মুক্তিযোদ্ধা। আজ আমরা প্রদীপ্ত হবো আপনাকে ধারণ করার অমেয় অঙ্গীকারে।