অন্যরা পালাক্রমে থাকেন অনুপস্থিত

সুব্রত দাশ খোকন, শাল্লা
গতকাল বেলা ঠিক পৌনে বারটায় শাল্লা সরকারি হাসপাতালের দক্ষিণ দিকে প্রবেশ দ্বারের লাগোয়া মেডিজোন ডায়গনস্টিক সেন্টারের নিচ তলায় শাল্লা সরকারি হাসপাতালের উপসহকারি কমিউনিটি মেডিকেল অফিসার ডা: মো: সুমন আহমেদ রোগী দেখায় ব্যস্ত ছিলেন। হাসপাতালের প্রবেশ মুখের সম্মুখ ভাগে টিকেট কাউন্টারে গিয়ে দেখা যায়- রাজু, সাজু ও আকাশ মিয়া নামের তিনজন আউট ডোরের রোগী হাসপাতালের টিকেট সংগ্রহ করছেন। একটু ভিতরে প্রবেশ করতেই চোখে পড়ে ঔষধ বিতরণ কক্ষ ফাঁকা। ঔষধ বিতরণ কক্ষের পর আবাসিক মেডিকেল অফিসারের কক্ষটি তালা লাগানো। তারপর জরুরী বিভাগে গিয়ে দেখা যায়, ৭/৮ বছরের একটি ছেলে বেডে শুয়ে কাতরাচ্ছে, ছেলেটির মা ছেলেটিকে ধরে রেখেছেন আর আউটসোর্সিং এর মাধ্যমে নিয়োগকৃত ওয়ার্ডবয় আশিক আহমেদ বাচ্চাটিকে চিকিৎসা দিচ্ছেন। জরুরী বিভাগে কর্তব্যরত ডাক্তার কোথায় ? প্রশ্ন করলে আশিক বলেন- নাছির স্যার বাচ্চাটিকে দেখে গেছেন। আমাকে বাচ্চাটির কাটা পা ড্রেসিং করতে বলে গেছেন। জরুরী বিভাগের ঠিক দক্ষিণ দিকের ব্লকে আবাসিক চিকিৎসকের অন্য একটি রুমের সম্মুখে ১০/১২ জন রোগীকে বারান্দায় দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা যায়। ভিতরে উঁকি দিলে কক্ষটির দুইজন চিকিৎসকের চেয়ার খালি পড়ে থাকতে দেখা যায়। দরজার নিকট টুলে বসা আয়াকে ডাক্তার কোথায় জিজ্ঞাস করলে বলেন- ডা: সালমা ম্যাডাম নাস্তা করতে গেছেন, এরপর টিএইচও এর রুমের দিকে এগিয়ে গেলে এই রুমটিও ফাঁকা দেখা গেল। অত:পর অফিস সহকারীর কক্ষে গেলে অফিস সহকারী নিশিকান্ত দাসকে বসে থাকতে দেখে রুমের ভেতরে ঢোকে হাসপাতাল ডাক্তার শূন্য থাকার কারণ জানতে চাওয়া হয়। একথা শুনে অফিস সহকারী ডা: সাদিককে সাংবাদিক এসেছে বলে ফোন করলে কিছুক্ষণের মধ্যে ডা: সালমা ও ডা: মো: আবুল ফাত্তাহ সাদিক টিএইচও এর রুমে ছুটে আসেন।
ভারপ্রাপ্ত টিএইচও এর অনুপস্থিতিতে দায়িত্ব পালন করা ডা: মো: আবুল ফাত্তাহ সাদিক সুনামগঞ্জের খবরকে বলেন- আমি একটি সেমিনারে ছিলাম, অন্যদের তো থাকার কথা। কামরুল স্যার টিএইচও এর দায়িত্ব পাওয়ার পর ঢাকা, সিলেট ও সুনামগঞ্জে বিভিন্ন সেমিনারে ব্যস্ত থাকেন। আজকেও উনার সুনামগঞ্জে একটি মিটিং আছে। উনি একেবারেই আসেন না, এটা ঠিক না । সেমিনারের ফাঁকে ফাঁকে আসেন, তবে উনার অনুপস্থিতিতে হাসপাতালে সেবা দেওয়ার ব্যাপারে কোনো সমস্যা হচ্ছে না। আগের যে কোনো সময়ের তুলনায় বর্তমানে ডাক্তার সংখ্যা বেশি এবং সেবার মানও ভাল।
সচেতন এলাকাবাসী ও নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক দুইজন স্বাস্থ্য সহকারীর অভিযোগ, গত ২৬ জানুয়ারি তারিখে কামরুল হাসান ভারপ্রাপ্ত টিএইচও’র দায়িত্ব পাওয়ার পর মাসের অধিকাংশ সময় নিজ বাড়ি কুমিল্লায় থাকছেন। মাস শেষে বেতন উত্তোলনের সময় আসেন, আর উনার অনুপস্থিতিতে কর্মরত বাকী সাতজন ডাক্তারও পালাক্রমে কর্মস্থলে অনুপস্থিত থাকেন। অর্থাৎ ২/৩ জন কর্মস্থলে উপস্থিত থাকেন তো বাকীরা অনুপস্থিত। যারা থাকেন তারাও হাসপাতালে নিজের খেয়াল খুশিমত আসেন আবার খেয়াল খুশিমত হাসপাতাল ত্যাগ করেন। আর এ কারণে প্রায় সোয়া লক্ষ জনসংখ্যা অধ্যুষিত হাওরের রাজধানী খ্যাত পশ্চাৎপদ শাল্লা উপজেলার একমাত্র হাসপাতালটিতে চিকিৎসা নিতে আসা লোকজন আগ্রহ হারিয়ে ফেলছেন। যার ফলস্বরুপ তারা হাতুড়ে ডাক্তারদের চিকিৎসাকেই বেছে নিতে বাধ্য হচ্ছেন।
হাসপাতালের অফিস সূত্রে জানা গেছে, হাসপাতালটিতে ১৩টি পদের বিপরীতে এখন ডাক্তার আছেন ৮ জন, কিন্তু সংশ্লিষ্ট অফিস সূত্রে জানা গেছে গতকাল উপস্থিত ছিলেন ৪জন। বর্তমানে ৩১ শয্যা বিশিষ্ট হাসপাতালটিতে বহির্বিভাগে প্রতিদিন গড়ে ১০০ থেকে ১৫০ জন রোগী সেবা নিতে আসেন। হাসপাতালে ভর্তিকৃত রোগী থাকে গড়ে ২০/২৫ জনের মত। রোগীরা সময়মত ডাক্তার না পেয়ে চরম ভোগান্তিতে পড়েন।
হাসপাতালের লাগোয়া গ্রাম ডুমরার বাসিন্দা প্রধান শিক্ষক অরবিন্দু দাস বলেন- হাসপাতলটিতে স্বাস্থ্য ও প: প: কর্মকর্তার কক্ষ, হাসপাতালের জরুরী বিভাগ সহ স্বাস্থ্য কর্মকর্তাদের প্রত্যেকটি কক্ষ প্রায়ই শূন্য পাওয়া যায়। সবখানেই যেন শুনশান নিরবতা। একসময় ডাক্তারের পদ শূন্য থাকত বলে আমরা মনকে শান্তনা দিতাম, কিন্তু বর্তমানে ৮ জন ডাক্তারের পদায়ন হওয়া স্বত্বেও হাসপাতালে গেলে ডাক্তার পাওয়া যায় না। অবহেলিত জনপদ শাল্লায় সরকারি হাসপাতাল থাকলেও মানুষ সরকারি সেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে।
ভারপ্রাপ্ত উপজেলা স্বাস্থ্য ও প: প: কর্মকর্তা ডা: কামরুল হাসান বলেন- আমি একেবারেই থাকি না, কথাটা ঠিক না। প্রশাসনিক কর্মকর্তা হিসেবে প্রায়ই আমাকে ঢাকা, সিলেট ও সুনামগঞ্জে বিভিন্ন সভা সেমিনারে থাকতে হয়। আমার এক আত্মীয় মারা যাওয়ায় কারণে বিগত কয়েকদিন যাবত বাড়িতে আছি। বাড়ি থেকে এসে আপনার প্রত্যেকটি অভিযোগের উপর প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করব।
সুনামগঞ্জের সিভিল সার্জন ডা: সামস উদ্দিনকে একাধিকবার তার মোবাইলে ফোন করলেও উনি ফোন রিসিভ না করাতে তার বক্তব্য নেওয়া সম্ভব হয়নি।