অপ্রতিরোধ্য চায়না দুয়ারি জাল/ ধ্বংসের পথে মৎস্য সম্পদ ও জীববৈচিত্র্য

বিশ্বজিত রায়
জামালগঞ্জের হাওর জলাশয়ে এখন মৎস্য নিধনের নতুন আতঙ্ক চায়না দুয়ারি জাল। রেলগাড়ির মতো দেখতে নিষিদ্ধ এই জাল মৎস্য নিধন থেকে শুরু করে জীববৈচিত্র্য ধ্বংসে অন্যতম ভূমিকা পালন করছে। নিষিদ্ধ কোনা ও কারেন্ট জালের মতোই অবাধে ব্যবহার হচ্ছে এই জাল। মৎস্য আহরণ, ব্যবহার ও বহন সহজতর হওয়ায় দিন দিন বেড়েই চলেছে চায়না দুয়ারি ব্যবহারের মাত্রা। জলাশয়ের ট্রেনখ্যাত চায়না দুয়ারি ব্যবহার ও ধ্বংসের দিক থেকে অন্য নিষিদ্ধ জালকেও ছাড়িয়ে যাচ্ছে।
চায়না দুয়ারি জাল সর্বদিক থেকে ক্ষতির কারণ হলেও এগুলো ঠেকাতে মৎস্য বিভাগের বিধি-নিষেধের কঠোর প্রয়োগ তেমন চোখে পড়ে না। উপজেলা মৎস্য বিভাগ কিছু কিছু জায়গায় ধরপাকড়ে নেমে ভূমিকা রাখলেও নিষিদ্ধ জালের ব্যবহার রোধকল্পে তা যথেষ্ট নয়। এতে অবৈধ জাল ব্যবহারকারীরা সাবধানতার বিপরীতে নির্ভয়ে জলজ সম্পদ বিনষ্টে উৎসাহী হচ্ছে। এ থেকে মুক্তি পেতে সংশ্লিষ্ট বিভাগকে কঠোর হওয়ার পাশাপাশি জেলে সম্প্রদায়কে সরকারি প্রণোদনার আওতায় আনার দাবি সচেতন মহলের।
জানা যায়, প্রতিনিয়তই হাওরাঞ্চলের নদীনালা, হাওর-বাওড়, খাল-বিলে অবাধে চায়না দুয়ারি জাল ফেলছে জেলেরা। রাতের আঁধারে জাল ফেলে পরদিন বেলা বাড়ার আগে তড়িগড়ি সেই জাল উত্তোলন করা হচ্ছে। তাতে ছোট বড় দেশীয় প্রজাতির হরেক রকমের মাছ আটকা পড়ছে। এ থেকে বাদ যাচ্ছে না সাপ, ব্যাঙ, শামুক, কাঁকড়া, কুইচ্চাসহ নানা জলজ প্রাণ। এছাড়া এ জাল পানি থেকে তুলে শুকানোর জন্য ডাঙায় মেললে মাছখেকো পাখি মাছ খেতে এসে তাতে আটকে পড়ে মারা যাওয়ার সম্ভাবনাও থেকে যাচ্ছে। এতে একদিকে ডাঙা ও জলের জীববৈচিত্র্য হুমকির মধ্যে পড়ছে আরেকদিকে মাছের বংশবিস্তার চরমভাবে ব্যাহত হচ্ছে।
জেলে ও সাধারণ মানুষের সাথে কথা বলে জানা যায়, বর্ষা মৌসুমে হাওরাঞ্চলের মানুষের প্রধান পেশা হচ্ছে মৎস্য শিকার। এ সময় হাওর ও জলাশয়ে মাছ ধরে জীবিকা নির্বাহ করে হাওর পারের বৃহৎ একটা শ্রেণি। জীবন ও জীবিকার স্বার্থে তারা নিষিদ্ধঘোষিত জাল ব্যবহার করতে বাধ্য হয়। এমনিতেই হাওর এলাকার বিল-বাদাড় প্রভাবশালীদের দখলে চলে যাওয়ায় প্রকৃত মৎস্যজীবীরা সর্বাত্মকভাবে বঞ্চিত হচ্ছে। তাই জেলেদের নিষিদ্ধ পন্থা অবলম্বন ছাড়া কোথাও যাওয়ার সুযোগ নেই। এমন পরিস্থিতিতে অসহায় জেলেদের সরকারি প্রণোদনার আওতায় এনে নিষিদ্ধ পথ থেকে ফিরিয়ে আনার দাবি অনেকের।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক চায়না দুয়ারি ব্যবহারকারী এক জেলে জানিয়েছেন, এ জাল ট্রেনের মতো লম্বা। প্রতিটি রিংয়ের মাঝখানে প্রবেশমুখ আছে। ছোট-বড় সব জাতের মাছসহ যেকোন জলজ প্রাণী এ পথ দিয়ে ঢুকলে আর বের হতে পারে না। প্রতিদিন রাতে হাওর কিংবা নদীতে ফেলে সকালে তুললে মোটামুটি ভালো মাছ পাওয়া যায়।
এ জাল নিষিদ্ধ তারপরও ব্যবহার করছেন এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, এছাড়া আমাদের বাঁচার পথ নেই। খেয়েপড়ে বাঁচতে হলে মাছ মারতে হবে। আর এ জাল নিষিদ্ধ হলে জায়গামতো বন্ধ করলেই তো আমরা পাই না। আমরা যারা মাছ মেরে খাই তাদেরকে চলার পথ করে দেওয়া হোক।
হাওর বাঁচাও আন্দোলনের সাধারণ সম্পাদক অঞ্জন পুরকায়স্থ বলেন, চায়না দুয়ারির মতো নিষিদ্ধ জাল ব্যবহারের কারণে দেশীয় ২৮টি প্রজাতির মাছ জলাশয় থেকে বিলুপ্ত হয়ে গেছে। এসব নিধনে ক্ষতিকারক জালগুলো চিরতরে বন্ধ করা দরকার। মাছের প্রজননকালে প্রকৃত জেলেদের প্রণোদনার আওতায় নিয়ে আসা জরুরী।
এছাড়া তিনি আরও বলেন, কয়েকদিন আগে উপজেলা মৎস্য বিভাগ নিষিদ্ধ জাল ধরতে অভিযানে নামলে তাদের উপর আক্রমণ করে জাল ব্যবহারকারীরা। এদের ধরে কঠোর শাস্তির আওতায় আনার পাশাপাশি এদেরকে চায়না দুয়ারির মতো নিষিদ্ধ জাল ব্যবহারে উদ্বুদ্ধ করে একটা শ্রেণি তাদেরকেও খোঁজে বের করা দরকার।
এ ব্যাপারে সুনামগঞ্জ জেলা মৎস্য কর্মকর্তা সুনীল ম-ল বলেন, নিষিদ্ধ জালে মৎস্য নিধন ও জীববৈচিত্র্য ধ্বংসের যে ব্যাপারটা তার দেখশোন করা মৎস্য বিভাগের একার পক্ষে সম্ভব নয়। আমাদের লোকবল কম। তারপরও জামালগঞ্জের মৎস্য কর্মকর্তা খুবই আন্তরিক। তিনি যথেষ্ট কাজ করছেন। এ অবৈধ পন্থা ঠেকাতে হলে মৎস্য বিভাগ, জনপ্রতিনিধি, আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী, সুশীল সমাজসহ সকলকে ভূমিকা রাখতে হবে। যদি কোথাও সুনির্দিষ্ট তথ্য থাকে তাহলে সহযোগিতা করবেন। আমরা এগিয়ে আসব।
জেলেদের প্রণোদনার ব্যাপারে তিনি বলেন, এখন পর্যন্ত কোন প্রণোদনার ব্যবস্থা নেই। সামনের বছর সংসদীয় আইন পাশ হলে জেলেদের খাদ্য সহায়তা, বিকল্প কর্মসংস্থানসহ অর্থ সহায়তা দিতে পারব। আর মাননীয় প্রধানমন্ত্রী বলে দিয়েছেন মৎস্যজীবীরা চাইলে কম সুদে ঋণ নিয়ে গরু-ছাগল, হাঁস-মুরগী পালন ও মাছ চাষ করতে পারবে।