অপ্রাপ্তির দহনে ভস্ম মেসি বিশ্বজিত রায়

বয়সটা তার একত্রিশ। এ বয়সে গুণে গুণে চারটি বিশ্বকাপ খেলে ফেলেছেন লিওনেল মেসি। এটাই হয়তো মেসির সর্বশেষ বিশ্বকাপ। আগামী বিশ্বকাপ আসতে তার বয়স হবে পঁয়ত্রিশ। বাইশ বিশ্বকাপের শ্রেষ্ঠত্ব আঙ্গিনায় পা রাখতে পারবেন কি না তা নিয়ে রয়েছে দোদুল্যমানতা। চলতি বিশ্বকাপ আসরটাই ছিল মেসির অপূর্ণতা ঘুচানোর সর্বশেষ সুযোগ। কিন্তু পূর্ণতায় ভাসতে পারলেন না গ্রহের অন্যতম এই সেরা ফুটবলার। ভাগ্যের বালখিল্লেপনায় প্রাপ্তির অভাগা অঙ্গন থেকে খালি হাতেই ফিরতে হয়েছে তাকে।
মেসির অপ্রাপ্তি প্রস্থানে পা বাড়িয়েছেন গ্রহের আরেক ফুটবল মহারথী ক্রিস্টিয়ানো রোনাল্ডু। একই দিনে বর্তমান ফুটবলের দুই মহাতারকার অস্তমিত আভা মেসি-রোনাল্ডুর পৃথিবীকে করেছে তমসাচ্ছন্ন। গত এক দশকের ফুটবল নৈপুণ্যে দুজনার কে সেরা, এই নিয়ে যখন চলছে চুলছেড়া বিশ্লেষণ তখন পাঁচবারের ব্যালন ডি’অর জয়ী মেসি-রোনাল্ডুর বিদায়ী বেদনা স্পর্শ করেছে পৃথিবীর এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্ত। রোনাল্ডুর বিদায়টা যতটা না আলোচনায় তার চেয়ে বেশি বারুদ ছড়িয়েছে মেসির বিশ্বকাপ প্রস্থানের বিষয়টি। ফুটবলে সর্বদা ঝলক ছড়ানো তারকা মেসির বিশ্বকাপ বিদায়ী মুহূর্তটা ছিল বেদনায় ভরপুর।
আবারো সেই স্বপ্নভঙ্গ। মনে হয় বাতির নিচে অন্ধকার। গত বিশ্বকাপের পর চলতি বিশ্বকাপেও শ্রেষ্ঠত্বের লড়াইয়ে হারের পুনরাবৃত্তি। সোনালি ট্রফিটা হাতে নিয়ে উঁচিয়ে ধরার সৌভাগ্য কখনো হয়ে ওঠেনি লিওনেল মেসির পক্ষে। পাঁচবারের ব্যালন ডি’অর পুরস্কারে মেসি যখন সেরাদের সেরা তখন আর্জেন্টিনার জার্সি গায়ে শিরোপাবঞ্চিত এক অভাগা মানুষ তিনি। অসংখ্য পুরস্কার হাতে নিয়ে হেসেছেন বারবার। কিন্তু দেশের হয়ে না পারার ব্যর্থতা এবং দর্শক বিচারে সর্বকালের সেরা স্বদেশি ম্যারাডোনা ও ব্রাজিলিয়ান পেলের কাতারে নাম লেখানোর প্রয়োজনীয় প্রাপ্যতা ঘুচাতে পারেননি বিধায় মেসিকে জাপটে ধরে হাজারো দুঃখ-গ্লানি। বিজয়ী অঙ্গে প্রতিপক্ষ বলয় আনন্দধুলোয় লুটোপুটি খেললেও অন্যপ্রান্তে নির্ভার মেসি। প্রিয় মানুষটির এ রকম অসহায়ত্ব চেহারা কখনো ভুলতে পারবে না কেউ। এ যেন দেশকে কিছু না দেওয়ার চরম বহিঃপ্রকাশ।
লিওনেল মেসি। অনেকটা হত। দেহদুর্গে প্রাণ আছে, প্রাণ নেই। দাউদাউ করে জ্বলছে অনুভূতির অন্দর মহল। ভেতরের বিপন্ন বহ্নিশিখায় বিদীর্ণ প্রাণ। অপ্রাপ্তির অগ্নি উষ্ণতায় ভারাক্রান্ত চোখে ঝরছে অনবরত অদৃশ্য অশ্রু। নির্বাক নিঃস্ব অবয়বে কান্নার নিঃশব্দ আবহ। অবর্ণনীয় কষ্টের নীল সাগরে ঝটিকা জঞ্জালে আটকা পড়েছে ওই তীরহারা তরী। বেদনার্ত উত্তাল তরঙ্গে অস্বস্তির অস্পষ্ট আওয়াজ। চারপাশ থেকে তেড়ে আসা নিন্দুক নাদে প্রকম্পিত প্রাণ। চোখ ছলছল। মনটা ভালো নেই। অসহ অশান্তিরা তাড়া করছে বারবার। বেদনার বিমর্ষ বিষে নীল পরাস্ত দেহ। বিষাদে ভরপুর চারপাশের পৃথিবী। অপূর্ণতায় চেয়ে গেছে দৃষ্টির সীমারেখা। আঁধারে আচ্ছন্ন ভিন গ্রহের এই কীর্তিকায়া।
মাঠের এক প্রান্তে যখন ফরাসি উৎসব অন্যপ্রান্তে কান্নার নিরব আর্তনাদ। প্রতিপক্ষ দলের এই আনন্দ উচ্ছ্বাসী রব সেদিন সুঁই হয়ে বিদ্ধ হয়েছিল মেসির পরাভূত অঙ্গে। তখন শূন্যহাতে প্রস্থানের পীড়িত যন্ত্রণায় কাতর মেসির চোখজোড়া হয়ে পড়ে অশ্রুশূন্য। বছর দু’য়েক আগে কোপা আমেরিকার ফাইনালে চিলির কাছে টাইব্রেকারে হারের যন্ত্রণা সহ্য করতে না পেরে অঘোরে কেঁদেছিলেন মেসি। কিন্তু সম্প্রতি বিশ্বকাপের বিদায়ী ম্যাচ শেষে মেসি ছিলেন নিষ্প্রভ। সেদিনের মতো হারের অসহনীয় উষ্ণতায় তার চোখ ফেটে বের হয়নি নুনাফোটা। হয়তো পরাজয়ের বেদনাশ্রিত শোকে পাথর হয়ে গিয়েছিলেন ফুটবলের এই বিস্ময় জাদুকর। মুখচ্ছবিতে ছিল অন্তহীন বিষণœতার ছাপ। কিছু সময় আগেও যার দিকে তাকিয়েছিল পৃথিবী, অল্প সময়ের ব্যবধানে পাল্টে গেল মেসির রঙিন দুনিয়া। এই যন্ত্রণাই হয়তো পুড়িয়েছে মেসির মানবদেহ।
এক অব্যক্ত প্রাণে পরাজয়ের তিক্ততা। বিফলতার বিবর্ণ জাদুকর জীর্ণ অঙ্গে ঠাঁয় দাঁড়িয়ে মাঠের সবুজ আল্পনায়। গোটা বিশ্বের বিস্মিত দৃষ্টি ও আকাশী সাদার নিস্তব্দ গ্যালারি তাকিয়ে তার পরাভব কায়ায়। পরাজিত এই মুহূর্তে কঠিন যন্ত্রণা টুকরে টুকরে আঘাত করছিল তাকে। ফুটবল পৃথিবীর সমগ্র ক্ষোভ হতাশার বিষবাষ্পে বিপন্ন ভিনগ্রহী মানুষটি নিজেকে হারিয়ে অসহায়ের মতো খোঁজে ফিরছিল ফুটবল জাদুকরী এক মেসিকে। ব্যর্থতার সকল দায় নিজ গ্রীবায় নিয়ে কেবল নিরাশার প্রতিবিম্ব হয়ে দাঁড়িয়ে থাকলেন পরাজয় পীড়িত সবুজ আঙ্গিনায়। মাটিমুখো হয়ে দাঁড়ানো নিজ আবছা ছায়াটুকুই যেন তাকে বিরক্তির টিপ্পনী দিয়ে আসছিল। ভাগ্য বিড়ম্বিত দেহখানি সেখানে অসহায়ের মতো দাঁড়িয়ে থাকা ছাড়া আর কোনো পথ খোঁজে পাচ্ছিল না। পরাজয়ের কষ্টকথন নিজের মধ্যে চেপে রেখে শান্তনার স্তুতিকথা শুনতে চূর্ণ প্রাণটা পদতলের মাঠ মাটিকেই শেষ আশ্রয়স্থল হিসেবে বেছে নিলেন। অবশেষে অভিশপ্ত পায়ে ধীরে ধীরে এগিয়ে গেলেন বিশ্বকাপ বিদায়ী মঞ্চের শেষ ঠিকানায়। মেসির এই প্রস্থানের মধ্য দিয়েই যেন ছিটকে পড়লো এক মহাতারকার বিশ্বকাপ জয়যাত্রা। এটি হয়তো ফুটবলের খেরোখাতায় ইতিহাস হয়ে থাকবে।
ভক্তদের চোখে তিনি ফুটবলের ‘ঈশ্বর’। ফুটবলবিশ্ব স্বীকৃতি দিয়েছে সেরা ফুটবল প্রতিভা বলে। রেকর্ড এবং পুরস্কারের উর্ধ্বে নিয়ে এসেছেন নিজেকে। পাঁচবার ব্যালন ডি’অর, গোল্ডেন বুট, গোল্ডেন বলসহ বিশ্ব ফুটবলের প্রায় সমস্ত সম্মান তার। শুধু বিশ্বকাপটাই অধরা রয়ে গেল তার জীবনে। ২০০৫ সালের ১৭ আগস্ট আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারে অভিষেক হয় মেসির। ২০০৭ সালে কোপা আমেরিকার ফাইনালে উঠেছিল আর্জেন্টিনা। তখন দলে আসা তরুণ মেসি পারেননি কোপা জয় করতে। এরপর ব্রাজিলে ২০১৪ বিশ্বকাপ ফাইনালে জার্মানির কাছে ১-০ গোলে হেরে স্বপ্নভঙ্গ। ২০১৫ সালে কোপা আমেরিকার ফাইনাল। চিলি মেসির দলকে এবারও হারিয়ে দেয়। এরপর ২০১৬ সালের ২৭ জুন চিলির সাথেই আবারো ফাইনালে হার। ২০১৪ সাল থেকে মেসির নেতৃত্বে আর্জেন্টিনা টানা ৩টি ফাইনাল খেললেও (২০১৪ বিশ্বকাপ, ২০১৫ কোপা আমেরিকা, ২০১৬ কোপা আমেরিকা) ভাগ্য বা ফলাফলে পরিবর্তন হয়নি। ১৯৮৬ সালে বিশ্ব ফুটবলের মহানায়ক দিয়েগো ম্যারাডোনা সর্বশেষ বিশ্বকাপ এনে দেন। ১৯৯৩ সালে তারা সর্বশেষ কোপা আমেরিকা চ্যাম্পিয়ন হয়। এরপর আর সফলতা আসেনি। সর্বশেষ আশায় বুক বেঁধেছিল মেসিভক্তরা। এবার যদি কিছু হয়। কিন্তু সে আশা গুড়েবালি।
আকাশি-সাদা জার্সি দেহে জড়িয়ে মেসি হয়তো নিজ দেশকে কিছু দিতে পারেননি। তবে ক্লাব ফুটবলে মেসির রয়েছে গগনস্পর্শী অর্জন। ২০০৪ সালে পেশাদারি ফুটবল ক্যারিয়ার শুরুর পর একের পর এক সাফল্য পেয়েছেন মেসি। তবে সবকিছুই স্প্যানিশ ক্লাব বার্সেলোনার হয়ে। গত এক যুগ ধরে কাতালানদের হয়ে জিতেছেন আট স্প্যানিশ লা লিগা, চার কোপা ডেল’রে ও চার চ্যাম্পিয়ন্স লিগ শিরোপা। লা লিগার সর্বকালের সর্বোচ্চ গোলদাতার রেকর্ডটিও নিজের করে নিয়েছেন। ২০০৯ সাল থেকে বর্ষসেরা ফুটবলার নির্বাচিত হয়েছেন পাঁচবার। বার্সার হয়ে ২৮টি শিরোপা এবং পাঁচবার ব্যালন ডি’অর জয়ী মেসি দেশের হয়ে থেকে গেলেন হীরো থেকে জিরো কাতারে। জীবনযুদ্ধে যতটা না জয়ী মেসি ফুটবল মাঠে ততটা বেশি সফল এই খুদে জাদুকর। ফুটবল পায়ে মেসি এক জীবন্ত দর্শন। তার ফুটবল নৈপুণ্যে মুগ্ধ দুনিয়া। আকাশি-সাদা জার্সিতে মেসি যদি হন ঝুলিশূন্য ভালবাসার রাজসিক পোশাকে তিনি মুকুটহীন মহারাজা। তাই তো মেসির ব্যথায় সমব্যথী গোটা বিশ্ব।
লেখক: কলামিস্ট