অবশেষে দখলমুক্ত হল সাচনাবাজারের রাস্তা

বিন্দু তালুকদার
জামালগঞ্জের সাচনাবাজার ইউনিয়নের দুর্লভপুর গ্রামের সাথে সাচনাবাজার হয়ে জেলা ও সারা দেশের সড়ক যোগাযোগ রয়েছে। গ্রামের বাসিন্দা এনামুল হক আফিন্দী (৬২) গত ২৪ এপ্রিল সুনামগঞ্জ জেলা শহরে মৃত্যুবরণ করেন। মৃত্যুর পরদিন ২৫ এপ্রিল এম্বুলেন্স যোগে তার লাশ সড়কপথে গ্রামের বাড়িতে নিয়ে যাওয়া সম্ভব হয় নি।
বাড়ির সাথে সড়ক যোগাযোগ থাকার পরও সরাসরি বাড়িতে না যাওয়ার মূল কারণ ছিল পথে ঐতিহ্যবাহী সাচনাবাজারের মূল গলিতে শত শত অবৈধ ভাসমান দোকান।
শুধু মরদেহ পরিবহনে বাধা তৈরিই নয়, বাজারের মাঝে অবৈধ ভাসমান দোকানের কারণে প্রতিদিনই দুর্ভোগ পোহাতেন পথচারী, ব্যবসায়ী, সাধারণ ক্রেতা-বিক্রেতাসহ সবাই।
কয়েকশতবর্ষী উপজেলার প্রধান ও জেলার অন্যতম এই বাজারে প্রায় হাজারো ব্যবসা প্রতিষ্ঠান থাকলেও জেলা বা রাজধানী শহর থেকে সরাসরি মালামাল পরিবহনকারী কোন যানবাহন বাজারে ঢুকত না।
গত কয়েক মাস আগে সাচনাবাজারের উত্তর দিকে একটি দোকানে আগুন লাগলে খবর পেয়ে সুনামগঞ্জ থেকে ফায়ার সার্ভিস ঘটনাস্থলে যায়। কিন্তু ভাসমান দোকানের কারণে ফায়ার সার্ভিসের গাড়ি বাজারে ঢুকতে পারছিল না। তাৎক্ষণিক বাজারের ব্যবসায়ীরা কয়েকটি দোকান ভেঙে ফায়ার সার্ভিসকে সহযোগিতা করলে আগুন নেভানো হয়।
জানা যায়, গত প্রায় ৪০ বছর ধরে সাচনাবাজারের প্রধান গলিটি ছিল কয়েক শত ভাসমান ব্যবসায়ীর অবৈধ দখলে। গত ওয়ান ইলিভেন সরকারের সময় কিছু দিনের জন্য উচ্ছেদ করা হয়েছিল ভাসমান দোকানগুলো। কিন্তু পরে আবারও দখল করা হয় বাজারের প্রধান সেই রাস্তা। বিষয়টি নিয়ে উপজেলা পরিষদের সমন্বয় সভায় বারবার আলোচনা হলেও ভাসমান দোকানগুলো সরানো যাচ্ছিল না।
অবশেষে জামালগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী অফিসার মো. শামীম আল ইমরান শুক্রবার রাতে সাচনাবাজারের মূল রাস্তা দখলমুক্ত করার উদ্যোগ নেন। শুক্রবার রাতে নিজে সাজনাবাজারে গিয়ে অবৈধ ভাসমান ব্যবসায়ীদের রাতের মধ্যে সরে যাওয়ার অনুরোধ করেন। বিষয়টি নিয়ে রাতেই উপজেলা প্রশাসনের সরকারি ফেইসবুক পেজেও বার্তা দেয়া হয়।
উপজেলা নির্বাহী অফিসারের কঠোর নির্দেশনায় শুক্রবার রাত থেকে শুরু হয় বাজারর ফাঁকা করার কাজ। শনিবার সকালে পুরো বাজারের রাস্তা অবৈধ ভাসমান দোকানমুক্ত করা হয়। এতে খুশি হয়েছেন ব্যবসায়ীসহ পুরো উপজেলাবাসী।
বাজারের একাধিক ব্যবসায়ী বলেন,‘ সাচনাবাজার জেলার ঐতিহ্যবাহী একটি বড় বাজার। প্রতিদিনই হাজার হাজার ক্রেতা বিক্রেতার সমাগম ঘটে বাজারে। কিন্তু ভাসামন দোকানগুলো ছিল গোদের উপর বিষফোড়া। বাজারের মাঝের রাস্তা প্রায় ৪০ ফুট প্রশস্ত থাকলেও রাস্তার মাঝামাঝি দুই সারিতে শত শত দোকান স্থাপনের ফলে সড়কের মাত্র কয়েক ফুট জায়গা খালি থাকে দুই দিকে। বাজারের অবৈধ ভাসমান দোকান থেকে নিয়মিত অর্থ আদায়ও করতেন ইজারাদার। ভাসমান দোকানীদের পুনর্বাসনের নামে বাজারের ভেতর খাল ভরাট করা হয়। অনেকেই সেখানে ভিটও পান। কিন্তু পরবর্তীতে সেই ভিট বিক্রি করে আবারও বাজারের মাঝে ভাসমান দোকান দিয়ে ব্যবসা করতে থাকেন।
সাচনাবাজারের বিশিষ্ট ব্যবসায়ী স্বপন রায় বলেন,‘ দীর্ঘদিন পর হলেও রাজারের প্রধান রাস্তা থেকে ভাসমান দোকান উচ্ছেদ করার ফলে সবার দুর্ভোগ লাঘব হয়েছে। এত বড় রাস্তা থাকার পরও এম্বুলেন্স, ফায়ার সার্ভিস, লাইটেস, কার, ট্রাক, পিকআপসহ কোন গাড়ি নিয়ে বাজারে ঢুকা যেত না। ভাসমান দোকানের কারণে লোকজন সরু রাস্তা দিয়ে ধাক্কাধাক্কি করে চলাচল করত। ভাসমান দোকানগুলো সরানোর কারণে সবারই খুব উপকার হয়েছে। ’
দুর্লভপুরের মরহুম এনামুল হক আফিন্দীর ছোট ভাই সাচনাবাজার ইউপির সাবেক চেয়ারম্যান নূরুল হক আফিন্দী বলেন,‘ রাজারের প্রধান রাস্তায় ভাসমান দোকান থাকায় চলাচলে চরম দুর্ভোগ সইতে হত সবাইকে। শুধু ভাইয়ের মরদেহই নয়, বাড়িতে যাওয়ার রাস্তা ও নিজের গাড়ি থাকার পরও বাজারের উত্তর দিকে গাড়ি রেখে রিকশা, মোটরসাইকেল করে আসা-যাওয়া করতে হত।’
সাচনাবাজার বণিক সমিতির সভাপতি সাবেক উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান ইউসুফ আল আজাদ ও সাধারণ সম্পাদক মানিক লাল রায় বলেন,‘ বাজারের মাঝে ভাসমান দোকান থাকায় সবারই দুর্ভোগ ছিল। উপজেলা প্রশাসন, বাজার পরিচালনা কমিটি, ব্যবসায়ী, ক্রেতা-বিক্রেতা সবারই দাবি ছিল রাস্তা থেকে ভাসমান দোকানগুলো সরানোর। উপজেলা প্রশাসন উদ্যোগ নিলে আমরা সহযোগিতা করেছি। সবার সম্মিলিত প্রচেষ্টায় শনিবার সকালে বাজারের অন্তত ৩০০ ভাসমান দোকান সরানো হয়েছে এবং পাশাপাশি উচ্ছেদকৃতদের পুনর্বাসনের বিষয়ে কথা বলেছি। ’
সাচনাবাজার ইউপি চেয়ারম্যান রেজাউল করিম শামীম বলেন,‘ বাজারের মাঝের ভাসমান ব্যবসায়ীদের রাস্তা থেকে সরে যাওয়ার জন্য উদ্বুদ্ধ করা হয়েছে। উপজেলা প্রশাসন, বণিক সমিতিসহ আমরা তাদের অনুরোধ করেছি। শনিবার তারা স্বেচ্ছায় দোকানগুলো সরিয়ে নিয়েছেন। আমরা প্রশাসনের কাছে দাবি জানিয়েছি, ভাসমান ব্যবসায়ীদের দ্রুত যেন পুনর্বাসন করা হয়। ’
উপজেলা নির্বাহী অফিসার মো. শামীম আল ইমরান বলেন,‘ সাচনাবাজার ভাটি অঞ্চলের অন্যতম প্রসিদ্ধ, সমৃদ্ধ ও প্রাচীন একটি বাজার। বাজারটির বিভিন্ন গলি দখল করে কয়েক শতাধিক দোকান অবৈধভাবে তৈরী হয়েছিল। এর ফলে বাজারে পণ্য পরিবহন, যাতায়াতসহ মারাত্মক জনদুর্ভোগ তৈরী হয়েছিল। আমি জামালগঞ্জে যোগদান করার পরই সর্বস্তরের মানুষের দাাব ছিল অবৈধ দোকানগুলোর অপসারণ। কয়েকবার চেষ্টা করেও এই উদ্যোগ সফল হয়নি। অবশেষে মাননীয় সংসদ সদস্য, জেলা প্রশাসক মহোদয়, স্থানীয় জনপ্রতিনিধি, রাজনৈতিক নেতবৃৃন্দ, বণিক সমিতি, সাংবাদিকসহ সকল শ্রেণীর মানুষের সহযোগিতায় দোকানদারদের সরে যাওয়ার নির্দেশ দিলে স্বেচ্ছায় তারা দোকান সরিয়ে নিয়েছেন।