অবাধ্য কোলাজ

সুখেন্দু সেন
পেছনের মুখোমুখি সিটে ছ’জন। কতকথার কাকলি আর অকারণ হাসির ঝলকানি মিলেমিশে মধুমালতীর ফুল ভলিউম মিউজিক। সামনে ইজি-বাইক ড্রাইভারের পাশে জড়োসড়ো হয়ে উপরের রড ধরে কোনরকমে আত্মরক্ষা করে বসা আমি। তাতে কি? অপরের একটু খানি সুবিধা করে দেয়ার জন্য এইটুকু কষ্ট মেনে নিতে হয়। আজ যে স্বাধীনতা দিবস।
ঘর থেকে বেরিয়ে এমন ভিড়ের দিনে খালি একখান ব্যাটারি চালিত ইজি-বাইক। ভাগ্য বটে। তড়িঘড়ি চেপেও বসেছিলাম। জ্যামের ফাঁক গলিয়ে বেরিয়ে যেতে ত্রস্ত্র ড্রাইভারকে সে মুহূর্তে থামিয়ে দিলো রাস্তার ওপাশ থেকে কয়েকটি আন্দোলিত হাত। কব্জি ভরা লালসবুজ চুড়ির রিনিঝিনি সিঞ্জন আর মিহি কন্ঠে ড্রাইভার ভাইয়া, ড্রাইভার আংকেল বলতে বলতে অনভ্যাসের শাড়ি আবৃতা ক’জন বঙ্গনারী ভিড় ঠেলে একেবেঁকে গা বাঁচিয়ে এপাশে ইজি-বাইকের কাছে। কচিমুখ, সরল চাউনি। শাড়ি পরে নারী হয়ে ওঠার গৌরব আর হাসির প্রকোপ সামলাতে আঁচলের এক প্রান্ত দাঁতে চেপে রাখলেও ছোট জটলায় জীবন্ত উচ্ছ¡াস ঝড়ে কাঁপা বেতস ঝাড়ের মত দোলে।
একসাথে দল বেঁধে সেজেগুজে বেরিয়েছে ওরা। কত ছাত্রছাত্রী, শিশু কিশোর, আমজনতা। এখানে ওখানে কত অনুষ্ঠান, মেলা, কুচকাওয়াজ, মিছিল, গানবাজনা, খাওয়া দাওয়া, কেনাকাটা। দশদিগন্তে আনন্দের আমেজ। রংএর মেলা। স্বাধীনতা দিবস বলে কথা। আনন্দ তো থাকবেই। স্বাধীনতারও রং আছে। লাল সবুজ। সে রং অনেকের মনেও লাগে। মেয়েগুলি স্বাধীনতার রঙেই সেজেছে। স্বাধীনতার জন্য যত রক্ত যত অশ্রæই ঝরুক-স্বাধীনতা আনন্দেরই। এ আনন্দটুকু পাওয়ার, নিজেদের করে নেয়ার জন্যই তো এত ত্যাগ। এত তিতিক্ষা।
সিট থেকে নেমে ওদের বসতে বলি, তোমরা যাও আমি পরে যাচ্ছি।
আজ ফাঁকা কোন বাহন পাওয়া মুশকিল। ওদের কখনও একসাথে যাওয়ার সুযোগ হবে না। আজকের এই আনন্দের দিনে এ সুযোগটা ওদের করে দেই। আমার হেঁটে যেতেও আপত্তি নেই।
তবে অপর পক্ষ থেকে ঘোরতর আপত্তি।
না না আংকেল আপনি কেনো নামবেন। আগে বসেছেন। আপনাকে নামিয়ে আমরা যাব? তা কি করে হয়।
কোন অসুবিধা নেই। তোমরা একসাথে যাও।
না-না, আমরা এভাবে যাবো না।
মেয়েগুলি এবার দৃঢ়তা দেখায়। চপলতা, কপটতা যে নয়, তা বুঝতে পারি।
তাহলে আমি সামনে বসি।
সেই থেকে রড ধরে ঝুলছি। হালকা পাতলা শরীর হলে ওমন সিটে বসা যায়। ভারী দেহের ভারে ডানায় টান ধরে। ব্যথা ব্যথা লাগে। হাসি মুখে সহ্য করি। পেছনে কলরব। নিজেদের মধ্যে ঠেলাঠেলি হুড়াহুড়ি বসাবসি করতে যেয়ে হৈ হৈ। হা.. হা.. হি.. হি.. এখনও থামেনি।
অকারণ আনন্দ। তবুও মেয়েগুলির মাঝে একটা বিনয়ের ভাব আছে। সরলতা আছে। আমি স্বেচ্ছায় নেমে গেলে ওরা খুশী হয়ে কিছু না বলেই উঠে যেতে পারতো। তা করেনি। ড্রাইভার আংকেল, ড্রাইভার ভাইয়া এমন আন্তরিক সম্বোধন, আমাদের ছেলেবেলায় প্রচলিত ছিল না। স্বাধীনতা কিছুটা হলেও অর্থবহ হয়ে উঠছে। একে অপরকে সম্মান দেওয়ার সংস্কৃতি। আমরা শুধু এখনকার প্রজন্মকে দোষারোপই করি। নিজেরা উদাহরণ হয়ে উঠতে পারি না।
গার্জেন আছেন একজন। কারো খালা, কারো আপা হয়তো। তিনি আবার লাল-সবুজে নন। স্মার্ট হিজাবী। ওদেরে সামলে রাখা আর বকবকানি বন্ধ রাখার ব্যর্থ চেষ্টায় একেকবার এক একজনকে মুটকি, ঢংগী, চিকরী বলে ধমক দিয়েই যাচ্ছেন। সে ধমকের কার্যকারিতা নাই মোটেও। বরং হাসির মাত্রা দ্বিগুণ হয়। হালকা বাইক দুলে উঠে।
কিছুদূর যেতেই জ্যাম। এটিও হাসির আরেক কারণ। তবে এবার কাজের কাজ। বসে থেকেই ট্রাফিক পুলিশের মত হাত তুলে থামিয়ে দিল এগিয়ে আসা অটো পিছেনের মুটকী, ঢংগি নয়তো কোনো চিকরী। পিছনে যাও পিছনে যাও। ডান দিকের আরেক জন হাত নেড়ে নেড়ে আরেকটি রিক্সাকে বেরিয়ে যেতে বললো, সেটি চলেও গেলো। হিজাবি মহিলাও ওদের সাথে সোৎসাহে কাজে লাগলেন। রিক্সার ওভারটেক হাত বাড়িয়ে থামিয়ে দিলেন। দূরে লাইন ভেঙ্গে বকের বাচ্চার মত গলা বের করেছে একটি অটো। এই দেখো। ক্যামনে গলা বাড়াচ্ছে, বলেই হাসি। পরে হাত নেড়ে চিৎকার। গলা বাড়াবা না। লাইনে ঢুকো, লাইনে। বেচারা অটো আবার গলাটা ঢুকিয়ে দিলো। ওরা পারেও বটে। কেমন সার্ভিস দিচ্ছে। স্কুল কলেজের ছাত্রছাত্রীদের যদি ট্রাফিক নিয়ন্ত্রণের দায়িত্ব ভাগ করে দেয়া যেতো তা হলে পুলিশের চেয়ে ভালো পারতো। ৭১ এ অসহযোগ আন্দোলনের সময় ঢাকায় ছাত্ররা ট্রাফিক কন্ট্রোল করেছে। গত বছর সড়ক আন্দোলনে ছাত্ররা গাড়ির লাইন কেমন সোজা করে ছেড়েছিলো। কিন্তু আমরা ওদের করতে দেই না। কোন লাইন তাই সোজা হয় না।
এর মাঝেই ওদের কাছে কিভাবে খবর পৌছে গেলো সামনে এক্সিডেন্ট হয়েছে। হাত পা ভেঙ্গেছে। মাথা ফেটেছে। রক্তারক্তি ব্যাপার। এবার নিরবতা। কিছুটা ইস্ আস্। হঠাৎই হাততালি দিয়ে একজন- আপা আমি কারো জন্য রক্ত দেবো। কোন দিন দেইনি। রক্ত দেয়ার জন্য কি ব্যাকুলতা, অন্যকে রক্তদানে কি আনন্দ। হবে না কেনো। আজ যে আনন্দের দিন। স্বাধীনতা দিবস। স্বাধীনতা তো অন্যকে সাহায্য করার আনন্দ।
গার্জেনের এক ধমক। থাম্ ঢংগী। কোথায় কি। উনার রক্ত দেয়ার জন্য এখন এক্সিডেন্ট হতে হবে।
আবারও হাসি। কত আর বয়স হবে। অনুমান করি নবম থেকে দ্বাদশ। মানুষের জন্য মমত্ববোধ,সহানুভূতি বাসা বেঁধে আছে। ওরা তরুণ। ওদের রক্তে যদি স্বাধীনতার চেতনার মিশ্রণ ঘটানো যেতো তবে কী বিপ্লবই না ঘটে যেতো। কিন্তু আমরা তা করতে পারছি না।
যানজট কমে গেছে। জ্যামের কারণ এ্যাকসিডেন্ট নয়। নদীর পাড়ের রাস্তা থেকে বালু বোঝাই ট্রাক্টর সামনের অংশটা মেইন রাস্তায় তুলে পেছনের ট্রলির অংশটা আর তুলতে না পেরে কোমর বাঁকা করে ত্রিভঙ্গ মুরারী হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। দু পাশ থেকে অন্য গাড়িগুলি একের পর এক ওর মাথাটা চেপে ধরছে। বেচারা ট্রাক্টর না পারছে সামনে পেছনে যেতে না পারছে কোমর সোজা করতে।
অটো চলছে। সঙ্গে কলরবও। কোথায় আগে যাওয়া সিদ্ধান্ত হচ্ছে না। আব্দুর জহুর ব্রিজ, রিভার ভিউ, স্বাধীনতা মেলায় নাকি আগে খাওয়া দাওয়া। মাথা না ঘুরিয়েও বুঝি বেচারা গার্জেনের কি করুণ দশা। অবশেষে রিভার ভিউ’র সামনে এসে মধুমালতিরা নামলেন। আমাকে কষ্ট দেয়ার জন্য সবিনয় ক্ষমা প্রার্থনা করতেও ভুল হলো না। সবার পক্ষ থেকে গার্জেনও বললেন, ওই পাগলিরা কোন কথাই শুনে না। ভীষণ অবাধ্য। আপনি কিছু মনে করেননি তো? এতো ভিড়েও একটা নীরবতা কেবল আটকে থাকলো আমার আশপাশে।
মুখে বলিনি, মনে মনে বললাম আজকেই প্রাণভরে স্বাধীনতার নিখাদ আনন্দটা টের পেলাম। কত সরলতায় চঞ্চলতায় ওরা তৈরি করে রেখেছিলো এক অবাধ্য কোলাজ।
শাড়ি সামলাতে সামলাতে চঞ্চল পায়ে হেঁটে যাচ্ছে ওরা। আমি দেখছি এক ঝাঁক পায়রা যেনো উড়ছে মুক্ত আকাশে।
এ আকাশটা তোদের হয়েই থাক। তোদের ভুবনে থাক নিজস্ব নির্মাণের অবিনাশী আয়োজন। তোদের কাছেই তোলা রইল আপন আপন একাত্তর গঠনের উত্তরাধিকার।
লেখক: প্রাবন্ধিক