অভিযোগকারীর উলটো সাজা ও নেপোয় মারে দই

সত্যিই এই দুনিয়ায় কত কিছুই না হয়। দোয়ারাবাজার উপজেলায় আরফান আলী নামের এক গৃহহীন অভিযোগ করেছিলেন, প্রধানমন্ত্রীর উপহার দেয়া ঘর পাইয়ে দিতে একই গ্রামের মানিক মিয়া নামের এক ব্যক্তি এসি (ল্যান্ড) ও পিআইও’র নাম ‘ভাঙিয়ে’ তার কাছ থেকে ২০ হাজার টাকা নিয়েছেন। আরফান আলী প্রতিকার চেয়ে দোয়ারাবাজারের উপজেলা নির্বাহী অফিসারের নিকট অভিযোগ করেন। আরফান আলী উপজেলার লক্ষ্মীপুর ইউনিয়নের ভাঙ্গাপাড়া গ্রামের অধিবাসী। অভিযোগ দাখিলের পর অবিশ্বাস্য দ্রুতগতিতে এর তদন্ত সম্পাদিত হয়। অভিযোগে এসি (ল্যান্ড) এর নাম ‘ভাঙানো’ এর উল্লেখ থাকলেও ইউএনও তাঁকেই তদন্তভার অর্পণ করেন। এসি (ল্যান্ড) সাথে সাথে বাদি-বিবাদী পক্ষকে ঢেকে তদন্ত করেন। তদন্তকালেও আরফান আলী তার নিকট থেকে মানিক মিয়া কর্তৃক ২০ হাজার টাকা নেয়ার কথা দ্ব্যর্থহীনভাবে উল্লেখ করেছেন। তদন্তে এসি (ল্যান্ড) অভিযোগকারী আরফান আলীর অভিযোগের কোনো সত্যতা পাননি। তদন্তের এক পর্যায়ে আরফান আলী ও উপস্থিত তার শ্বশুরকে পুলিশের হাতে ন্যস্ত করেন এসি (ল্যান্ড)। পরে অবশ্য স্থানীয় ব্যক্তিদের হস্তক্ষেপে থানা থেকে ছাড়া পান আরফান আলী ও তার শ্বশুর।
বিষয়টি আমাদের অবাক করেছে। প্রধানমন্ত্রীর উপহারের ঘর কিংবা যেকোনো সরকারি সহায়তা নিয়ে ক্ষেত্রবিশেষে অর্থ লেনদেনের ঘটনা এখন আর গোপন নেই। একটি দালালচক্রের মাধ্যমে কা-টি সুচতুর ও সংগঠিতভাবে সম্পাদিত হয় এবং অবশ্যই দালালরা সংশ্লিষ্ট কর্তাব্যক্তিদের প্রশ্রয়েই থাকেন। এরকম অবস্থায় আরফান আলীর অভিযোগকে ফু দিয়ে উড়িয়ে দেয়ার উপায় নেই। অবৈধ লেনদেনের অর্থ কোনো দলিল দিয়ে করা হয় না। যদিও অবৈধ লেনদেনের সাথে জড়িত উভয় পক্ষই অপরাধী তবু আমাদের সমাজ বাস্তবতায় অনেকেই বাধ্য হয়ে এরূপ অবৈধ লেনদেন করতে বাধ্য হন। আরফান আলী হয়তো সেরকমই একজন। তিনি যদি মানিক মিয়া নামের দালালকে টাকা না দিতেন তাহলে কেন অভিযোগ করে নিজে নিজের বিপদ ডেকে আনবেন? স্থানীয়ভাবে অনুসন্ধান করা গেলে মানিক মিয়া ও আরফান আলীর চরিত্র সম্পর্কে সমস্ত তথ্য বেরিয়ে আসবে। মানুষের এই ধারণাই হতে পারত বর্ণিত তদন্তের একটি অন্যতম অনুষঙ্গ।
আরফান আলীর অভিযোগের সাথে মানিক মিয়ার পাশাপাশি প্রকারান্তরে এসি (ল্যান্ড) ও পিআইও’র নাম জড়িত। তাই অভিযোগের তদন্তভার এসি (ল্যান্ড) কে দেয়াটা সমীচীন হয়নি বলে আমরা মনে করি। ইউএনও নিজে এর তদন্ত করতে পারতেন। তাহলে তদন্তের বিশ্বাসযোগ্যতা প্রশ্নবিদ্ধ হত না। আর এসি (ল্যান্ড) তদন্তে যে দ্রুততা অবলম্বন করেছেন সেটি প্রশংসিত হত যদি তিনি নির্মোহভাবে সেটি করতে পারতেন। কিন্তু তিনি যে সেটি পারেননি ক্ষুব্ধ হয়ে অভিযোগকারীকে পুলিশে ন্যস্ত করা থেকেই তা বুঝা যায়।
আরফান আলীরা চিরকালই সমাজ থেকে উপেক্ষা পেয়ে অভ্যস্ত। আর মানিক মিয়ার মতো ধুরন্ধর দালালরা সবসময় প্রশ্রয় পেয়ে আসছে। কেউ কি অস্বীকার করতে পারবেন, মানিক মিয়ার মতো দালালচক্র ক্রিয়াশীল নেই? এরা কোথায় নেই? বাতাসের মতো সর্বত্র এদের অবশ্যম্ভাবী উপস্থিতি। এদের প্রভাব ভীষণ। এদের বিরুদ্ধে কেউ সত্য অভিযোগ করলেও আরফান আলীর মতো পরিণতি ভোগ করতে হয়। এরকম শক্তিশালী দালালচক্র আর তাদের মদদদাতারা যতক্ষণ বহালতবিয়তে আছেন ততক্ষণ কোনো জনবান্ধব কর্মসূচিই শেষ পর্যন্ত বিতর্কের বাইরে থাকতে পারে না।
আমরা চাই জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে বিষয়টির পুনঃ তদন্ত করা হোক। আরফান আলী যাতে নির্ভয়ে কথা বলতে পারেন এবং অভিযোগের সমর্থনে সাক্ষীসাবুদ আনতে পারেন সেরকম পরিবেশ তৈরি করে দিতে হবে। এতে প্রশাসনের ভাবমূর্তি উজ্জ্বল হবে। ওই তদন্তে যে সত্যই প্রতিষ্ঠিত হোক, তার ভিত্তিতেই আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা সমুচিত হবে।