অভ্যন্তরীণ কোন্দলে ডুবলো নৌকা

বিশেষ প্রতিনিধি
অভ্যন্তরীণ কোন্দলে সুনামগঞ্জের জগন্নাথপুর পৌরসভায় ডুবেছে নৌকা। এ কারণে জগন্নাথপুর পৌরসভা উপ-নির্বাচনে বিজয়ী মিজানুর রশিদ ভ্ইূয়াকে দেড় মাসের মাথায় মেয়রের চেয়ার ছাড়তে হচ্ছে। আওয়ামী লীগের ঘাটি হিসাবে পরিচিত এই পৌরসভায় নৌকার পরাজয়ের জন্য আওয়ামী লীগের বিবদমান দুই গ্রুপ একে অপরকে দোষারোপ করছেন। পরাজিত মেয়র মিজানুর রশিদ ভূইয়াও দাবি করেছেন, দলের একাংশ নৌকার ব্যাজ বুকে লাগিয়ে চামুচে ভোট দিয়েছে।
প্রয়াত জাতীয় নেতা আব্দুস সামাদ আজাদের বাড়ি এবং পরিকল্পনা মন্ত্রী এমএ মান্নানের নির্বাচনী এলাকা সুনামগঞ্জের জগন্নাথপুর পৌর এলাকা আওয়ামী লীগের ঘাটি হিসাবে পরিচিত। এই পৌরসভায় শনিবারের নির্বাচনে মাত্র ৩৬০ ভোটের ব্যবধানে স্বতন্ত্র (বিএনপি বিদ্রোহী) প্রার্থী আক্তার হোসেনের কাছে পরাজিত হয়েছেন আওয়ামী লীগের প্রার্থী মিজানুর রশিদ ভূইয়া। মিজানুর রশিদ ভূইয়া জগন্নাথপুর উপজেলা আওয়ামী লীগের সাবেক সভাপতি প্রয়াত আওয়ামী লীগ নেতা হারুনুর রশিদ হিরন মিয়ার ছেলে। পৌর মেয়র আব্দুল মনাফের মৃত্যুর কারণে গেল ১০ অক্টোবরের উপ-নির্বাচনে আওয়ামী লীগ মনোনীত প্রার্থী হিসাবে জয়ী হয়েছিলেন যুক্তরাজ্য প্রবাসী মিজানুর রশিদ ভুইয়া (নৌকা)। শপথ গ্রহণের দেড় মাসের মাথায় পৌরসভার নির্বাচনে হেরে গেলেন তিনি। নির্বাচনে স্বতন্ত্র (বিএনপি বিদ্রোহী) প্রার্থী আক্তার হোসেন ৮৩৭৮ ভোট এবং মিজানুর রশিদ ভূইয়া পেয়েছেন ৮০১৮ ভোট।
মিজানুর রশিদের পরাজয়ে নেতাদের উপর ক্ষুব্ধ আওয়ামী লীগের তৃণমূলের কর্মীরা। কর্মীরা বলছেন, দলের অভ্যন্তরীণ কোন্দলের জন্যই নৌকার পরাজয় হয়েছে।
উপজেলা যুবলীগের সহসভাপতি সাইফুল ইসলাম রিপন বললেন, দলের একটি অংশ নৌকার পক্ষে সক্রিয় ছিল না। তারা আনুষ্ঠানিক পথসভায় এসে নৌকার পক্ষে বললেও ভেতরে ভেতরে নৌকার বিরোধীতাই করেছে। বিগত উপজেলা পরিষদ নির্বাচনেও এরা নৌকার বিপক্ষে ছিল। ২০০৮ সালে নৌকায় ভোট না দিয়ে ‘না’ ভোট দিয়েছে। ২০১৪ সালে এরা নৌকার বিরোধীতা করে স্বতন্ত্র প্রার্থী আজিজুস সামাদ ডনের পক্ষে প্রকাশ্যে ছিল।
জগন্নাথপুর পৌর আওয়ামী লীগের সভাপতি পৌর নির্বাচন পরিচালনা কমিটির আহ্বায়ক ডা. আব্দুল আহাদ বললেন, নৌকার পরাজয় মেনে নিতে পারছি না। খুবই দু:খজনক বিষয় এটি। জগন্নাথপুর পৌর নির্বাচনে নৌকার পরাজয় বিশ^াস করার মত নয়। বিগত সময়ে সংসদ নির্বাচনসহ বিভিন্ন নির্বাচনে যারা নৌকার বিরোধীতা করেছে এরাই দলে থেকে, নির্বাচন পরিচালনা কমিটিতে থেকে নৌকার ক্ষতি করেছে।
স্থানীয় রাজনীতিতে আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য আজিজুস সামাদ ডনের সমর্থক হিসাবে পরিচিত উপজেলা আওয়ামী লীগের শিক্ষা ও মানবসম্পদ বিষয়ক সম্পাদক মিন্টু রঞ্জন ধর বললেন, নৌকার প্রতি সম্মান দেখিয়ে গেল উপজেলা পরিষদ নির্বাচনে প্রার্থী হবার ইচ্ছা থাকলেও প্রতিদ্বন্দ্বিতা করি নি। আমি কোন দিন নৌকার বিরোধীতা করি নি। নৌকার পক্ষে প্রচারণার জন্য কেন্দ্রীয় নেতা আজিজুস সামাদ ডন আসতে চেয়েছিলেন ৬ জানুয়ারি। আমার সামনেই তিনি উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক রেজাউল করিম রিজুকে ফোন দিয়েছিলেন, তারা কর্মসূচি দেন নি। এরপর তিনি আর আসতে পারেন নি। ১১ জানুয়ারির পর তিনি অসুস্থ্য হয়ে পড়েন।
এই বলয়ের অপর নেতা উপজেলা আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক বীরেন্দ্র সুত্রধর বললেন, আজিজুস সামাদ ডন নৌকার পক্ষে প্রচারণায় জগন্নাথপুরে আসতে চেয়েছিলেন। উপজেলা আওয়ামী লীগ সহযোগিতা না করায় আসা হয় নি। তিনি আসলে নৌকা জয় পেতো।
উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক রেজাউল করিম রিজু বললেন, নির্বাচন প্রচারণায় জেলা আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদককে নিয়ে জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ব্যারিস্টার এম এনামুল কবির ইমন এসেছেন, কেন্দ্রীয় কমিটির সাংগঠনিক সম্পাদক সাখাওয়াত হোসেন শফিককে নিয়ে পথসভা করেছেন, নৌকায় ভোট চেয়েছেন। এভাবে দলের কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য আজিজুস সামাদ ডনও আসলে ভালো হতো। রিজু জানালেন, সংগঠনের উপজেলা কমিটির ৫-৬ জন নেতার ভোটকেন্দ্র জগন্নাথপুর আদর্শ প্রাথমিক বিদ্যালয়। ওই কেন্দ্রে সব সময় নৌকার জয় হয়, এবার সেই কেন্দ্রে আমাদের চেয়ে বিএনপির বিদ্রোহী প্রার্থী ভোট বেশি পেয়েছেন। একইভাবে শহরের স্বরূপচন্দ্র উচ্চ বিদ্যালয়ে জেলা ও উপজেলা নেতারা ভোটার। ওখানে নৌকার ভরাডুবি হয়েছে। এটি দু:খজনক।
উপজেলা সভাপতি আকমল হোসেন বললেন, দলের একটি অংশ কেবল আনুষ্ঠানিকতায় নৌকার পক্ষে ছিল, আন্তরিকভাবে ছিল না। সকলে আন্তরিক থাকলে আমাদের পরাজিত হবার কথা ছিল না। কেন্দ্রীয় নেতা আজিজুস সামাদ ডন আসার আগে বর্ধিত সভা ডাকার জন্য বলেছিলেন। আমরা কর্মী সভা ডেকে তাঁকে জানিয়েছি, তিনি ব্যস্ততার জন্য আসতে পারেন নি।
আওয়ামী লীগের প্রার্থী মিজানূর রশিদ ভূইয়া বললেন, আওয়ামী লীগের কোন্দলের বলি হয়েছি আমি, একাংশের নেতা কর্মী সমর্থকরা নৌকার ব্যাজ বুকে লাগিয়ে চামচে ভোট দিয়েছে। এজন্য আওয়ামী লীগের ঘাটিতে নৌকা পরাজিত হয়েছে।
আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য আজিজুস সামাদ ডন বললেন, জগন্নাথপুর পৌরসভা নির্বাচনে আওয়ামী লীগ প্রার্থীর পরাজয় হয়েছে যুক্তরাজ্য প্রবাসী দলের বিদ্রোহী প্রার্থী আমজাদ আলী শফিকের প্রার্থীতার কারণে। তিনি ৮০০ ভোট পাওয়ায় নৌকা ৩৬০ ভোটে হেরেছে।
উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি আকমল হোসেন এবং সাধারণ সম্পাদক রেজাউল করিম রিজু অবশ্য বলেছেন, আমজাদ আলী শফিক আওয়ামী লীগের কেউ নয়। তিনি দলের মনোনয়ন চান নি। ভোট পেয়েছেন ৫৭৫ টি। তাকে বিদ্রোহী প্রার্থী বলা যায় না।
প্রসঙ্গত. জগন্নাথপুর উপজেলায় আওয়ামী লীগের শক্তিশালী অবস্থান থাকলেও অভ্যন্তরীণ কোন্দল দীর্ঘদিনের। একসময় ওই কোন্দলে একাংশ প্রয়াত জাতীয় নেতা আব্দুস সামাদ আজাদের এবং অপরাংশ প্রয়াত জাতীয় নেতা হুমায়ুন রশিদ চৌধুরী এবং সুরঞ্জিত সেন গুপ্তের আনুকূল্য পেত।
আব্দুস সামাদ আজাদের মৃত্যুর পর উপ-নির্বাচনে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসাবে এমএ মান্নান সামান্য ভোটের ব্যবধানে চার দলীয় জোটের মাওলানা শাহীনুর পাশার সঙ্গে পরাজিত হন। ওই সময়ও দলের একপক্ষ এম এ মান্নানের পান পাতা প্রতীকের বিরুদ্ধে শাহীনুর পাশের ধানের শীষে হাওয়া দিয়েছে বলে থাকেন নেতা কর্মীরা।
২০০৮’এর জাতীয় নির্বাচনে এম এ মান্নান নৌকা প্রতীক নিয়ে প্রার্থী হলে দলের একপক্ষের অনেকে ‘না’ ভোট দিয়েছে। ২০১৪ সালে দলের গ্রুপিং প্রকাশ্য হতে থাকে। দলীয় মনোনয়ন এম এ মান্নান পেলে আজিজুস সামাদ ডন বিদ্রোহী প্রার্থী হিসাবে ভোটে লড়েন। দলের একপক্ষ প্রকাশ্যে তাঁর পক্ষে অবস্থান নেয়।
গেল জাতীয় নির্বাচনে আবার এমএ মান্নান দলীয় মনোনয়ন নিয়ে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন। ওই সময় মান্নান রাজধানীতে আজিজুস সামাদ ডনের বাসায় যান। নির্বাচনী প্রচারণায় যুক্ত হবার অনুরোধ জানান। এই নির্বাচনে আজিজুস সামাত ডনের সমর্থকদের অনেকেই নৌকার পক্ষে কাজেও যুক্ত হন।
এভাবে দীর্ঘদিন ধরেই জগন্নাথপুর আওয়ামী লীগের কোন্দল কখনো চাঙা, কখনো বা শিথিল পর্যায়ে ছিল।
সম্প্রতি আজিজুস সামাদ ডন কেন্দ্রীয় আওয়ামী লীগের সদস্য হবার পর তাঁর সমর্থকদের মধ্যে চাঙা ভাব দেখা দেয়। জগন্নাথপুর পৌর নির্বাচনে মিজানুর রশিদ ভূইয়ার পরাজয়ে কোন্দলের আগুনে ঘি ঢেলে দেওয়া হলো।