অর্ধেক দামে ধান বিক্রি করছেন কৃষক

বিশেষ প্রতিনিধি
দেখার হাওরপাড়ের গ্রাম জগন্নাথপুরের খলায় বসেই ধান বিক্রি করছিলেন জগন্নাথপুর গ্রামের কৃষক এখলাছ মিয়া। ৬০০ টাকা মণে শুকনা ৫০ মণ ধান কেনার জন্য মিলারের খেওয়াল (ওজনকারী) দিলোয়ার হোসেন খলায় এসেছেন।’ এখলাছ মিয়া বললেন,‘গত বছর চৈত্র মাসে খেত পানির নীচে গেছে। একমুঠা ধান পাইছি না। সারা বছর ঋণ করে খেয়েছি। টাকা যার কাছ থেকে এনেছিলাম তাঁর সঙ্গে কথা ছিল বৈশাখ মাসে ধান ওঠানোর পর টাকা ফেরৎ দেব। এখন ধান খলায় থাকতেই ঋণ দিতে হচ্ছে। খলা থেকে কেউ ৫০০ থেকে সাড়ে ৫০০ টাকার বেশি ধান নিচ্ছে না। অনেক কষ্টে পাশের বাজার বেতগঞ্জের মিলার আক্রম আলীকে ৬০০ টাকা মণে ধান কিনতে রাজি করিয়েছি। তার লোক এসে আজ (রোববার) শুকনা ধান ওজন করে নিয়ে যাচ্ছে।’
ধান ওজন করতে করতে খেওয়াল দিলোয়ার হোসেন বললেন,‘৬০০ টাকায় ধান কিনলে কী হবে, আমরা আজ বিকালে বা কাল সকালেই এই ধান চাল করে ১২০০ বা ১২৫০ মণে বিক্রি করে দেব। কম দামে ধান কিনে বেশি দামে বিক্রি করার মতো পূঁজি আমাদের নেই।’
এই খলার পাশেই আরেক খলায় ধান শুকাচ্ছিলেন জগন্নাথপুর গ্রামের মিসবাহ্ উদ্দিন। বললেন,‘১২ খানি জমি করতে খরচ হয়েছে ৩০ হাজার টাকা, ধান কেটে আনতে গেছে আরও ২৫ হাজার টাকা। ধান বাড়িতে নিয়েছি আরও ৫ হাজার টাকায়। এখন ধানের মণ ৫০০ টাকা। ৬ মাস কষ্ট করে ধান পেয়েছি ১৫০ মণের মতো। এখন আপনি হিসাব করে দেখেন আমার সংসার কীভাবে চলবে। কৃষকরা কীভাবে বাঁচবে। আমার ধান ৫০০ টাকায় যারা নিতে চাচ্ছে তারাই আবার এই ধান গোডাউনে দেবে ১০৪০ টাকা মণে। অথচ আমি গোডাউনে নিয়ে গেলে বলবে ধান চিটা, কম শুকনা, ধান নিয়ে গোডাউনের সামনে ১৫ দিন বসে থাকতে হবে। এমন যন্ত্রণায় কৃষকরা গোডাউনে যায় না।’
পাশের খলায় ধান শুকাচ্ছিলেন জগন্নাথপুরের কৃষাণি সখিনা বেগম। বললেন,‘এবার আল্লায় ধান দিয়ে গেছেন। কিন্তু আমাদের দুঃখের শেষ নাই। আমরা খলা থেকেই পাওনাদারের ঋণ শোধ করতে কম দামে ধান বিক্রি করতে হবে। যে ধান পেয়েছি, এর দশ ভাগের একভাগও বাড়িতে নেওয়া হবে না।’
সুনামগঞ্জ শহরতলির আপ্তাবনগরের কৃষক হায়দার আলী বললেন,‘সরকার চাল কেনার নির্দেশ দিয়েছে। দুয়েক দিনের মধ্যে শুনেছি চাল কেনা শুরু হবে। কিন্তু ধান কেনার নির্দেশ এখনো আসেনি। গোডাউনে চাল কারা দেয় জানি না। কৃষকরা দেবার সুযোগ নেই। চাল দেয় মিলাররা। মিলাররা চাল দেবার জন্য ধান কিনছে। তারা তাঁদের ইচ্ছামত ধানের দাম নির্ধারণ করেছে। কৃষকরা দাম পাবে কীভাবে?
একই মন্তব্য করলেন হাসননগরের শাহেদ আলী অটো রাইস মিলের মালিক মো. বাবুল মিয়া। তিনি বলেন, ‘বড় বড় চালকলের মালিকরাই ধানের দাম নিয়ন্ত্রণ করছে। সরকার ধান না কিনে আগে চাল কেনায় এই সুযোগ পেয়েছে মিলাররা।’
সুনামগঞ্জের হাওরাঞ্চলের সবচেয়ে বড় আড়ৎ মধ্যনগরে রোববার ধানের দাম ছিল ৭০০ থেকে ৭০৫ টাকা মণ। বৈশাখের শুরুর দিকে এই আড়তে ধানের দাম ছিল ৭২৫ টাকা। এই কয়দিনে ধানের দাম আরও কমেছে।
মধ্যনগর ধান, চাল ব্যবসায়ী সমিতির সভাপতি জ্যোতির্ময় রায় বলেন,‘ট্যাক্স ছাড়া বিদেশী চাল দেশে আসায় প্রচুর চাল বাজারে রয়েছে। এজন্য চালের দাম বাজারে কম। আমাদের ক্রেতারা হচ্ছে চাঁদপুর, মদনগঞ্জ, আশুগঞ্জ, মুন্সিগঞ্জ কাটপট্টি এলাকার মিলাররা। এরা ৭১০ টাকা মণের বেশি ধান কিনছে না। এ কারণে আমরাও ধানের দাম বাড়াতে পারছি না।’ তিনি জানান, এখন প্রতিদিন মধ্যনগরের ৩৫ জন আড়ৎদার ৪০০০ মণের মতো ধান কিনছেন। বৈশাখের শুরু থেকে এই পর্যন্ত প্রায় এক লাখ মণ ধান কিনেছেন তারা।
চাঁদপুরের মিল মালিক নকিব চৌধুরী বললেন,‘বাজারে প্রচুর আমদানী করা চাল রয়েছে। আমাদের চালের চাহিদা নেই। এজন্য আমরা ধান কিনছি না। এখন ৬৯০ থেকে ৭০০ টাকায় ধান কেনা যাচ্ছে।’
সুনামগঞ্জের রাসেল অটো রাইস মিলের মালিক রাসেল মিয়া বললেন,‘আমরা শুকনা ধান ৭৫০ টাকায় কিনছি। জাতীয়ভাবে বিশেষ করে চট্টগ্রাম ও ঢাকার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখেই আমরা দাম নির্ধারণ করেছি। সরকারি ধান কেনা শুরু হলে ধানের দাম আরও বাড়তে পারে।’
জেলা খাদ্য কর্মকর্তা মো. জাকারিয়া মোস্তফা বলেন,‘আগামী কাল (সোমবার) জেলা সংগ্রহ কমিটির সভা হবে। এরপর সুনামগঞ্জের ২৬৩ মিলারের সঙ্গে চুক্তি করে চাল কেনা শুরু হবে। সুনামগঞ্জে সিদ্ধ চাল ৩৮ টাকা এবং আতব কেনা হবে ৩৭ টাকায়। সিদ্ধ ১২০৬ মে.টন এবং আতব কেনা হবে ৫৪৮২ মে.টন। ধান কেনা হবে ১০৪০ টাকা মণে। কিন্তু ধান কেনার নির্দেশনা এখনো আসেনি।’ তিনি দাবি করলেন, নির্দেশনা পেলে তারা প্রকৃত কৃষকদের কাছ থেকেই ধান কিনবেন।
এদিকে, সুনামগঞ্জের কৃষক নেতারা মনে করছেন সরকার কৃষকদের কাছ থেকে দ্রুত সরাসরি ধান না কিনলে এবং ধান কেনার লক্ষমাত্রা না বাড়ালে বাধ্য হবে অর্ধেক দামে ধান বিক্রি করতে।
জেলা সিপিবির সভাপতি চিত্ত রঞ্জন তালুকদার বলেন,‘প্রত্যেক এলাকায় উৎপাদন অনুযায়ী ধান কিনতে হবে। সুনামগঞ্জে এবার উৎপাদন হচ্ছে বেশি। চালের উৎপাদন প্রায় ৯ লাখ মে.টন হবে। এই অবস্থায় শুনেছি ধান কেনা হবে ৩০ হাজার মে.টন এবং চাল ৮ থেকে ১০ হাজার মে.টন। এটি একেবারেই কম। আমরা মনে করছি কৃষক বাঁচাতে সরকারী ক্রয়কেন্দ্র অস্থায়ী ভিত্তিতে ২ মাসের জন্য গ্রামে গ্রামে নিয়ে যেতে হবে। ধান চাল ক্রয়ের লক্ষ্যমাত্রা আরও বাড়াতে হবে।’ তিনি হাওর এলাকার ধর্মপাশার সুখাইড় ও গোলকপুরের পুরাতন ধান ক্রয়কেন্দ্র চালুর দাবী জানান।
কৃষক সংগ্রাম সমিতির কেন্দ্রীয় আইন বিষয়ক সম্পাদক ধর্মপাশার কৃষক নেতা খায়রুল বাশার ঠাকুর খান বলেন,‘সরকার দ্রুত প্রকৃত কৃষকদের কাছ থেকে ধান না কিনলে মধ্যস্বত্বভোগী ফড়িয়া বা সরকারী কৃষকের (সরকার দলীয় প্রভাবশালী ধান-চাল ব্যবসায়ী) কাছে চলে যাবে গরীব কৃষকের ধান। বড় বড় বাজারে আগের পুরাতন ধান ক্রয়কেন্দ্র ছিল, যেমন বাদশাগঞ্জ, বংশিকু-া, মহেষখলা, সুখাইড় রাজাপুর এবং গোলকপুরে, এগুলো চালু করতে হবে। পুরো জেলার বড় বাজার গুলোতে অস্থায়ী ধান ক্রয়কেন্দ্র করে ধান কিনতে হবে। প্রতি জেলায় কমপক্ষে একটি ধান ক্রয়কেন্দ্র থাকতে হবে।’
জেলা প্রশাসক মো. সাবিরুল ইসলাম বলেন,‘কোন অজুহাতে কৃষকের ধান ফেরৎ যাতে না যায়, আমরা সেই বিষয়ে সচেষ্ট রয়েছি। সুনামগঞ্জ থেকে এবার ৩০ হাজার মে.টন ধান সরকারিভাবে কেনার জন্য সুপারিশ পাঠিয়েছি আমরা।