অলৌকিকভাবে বেঁচে ফিরেছি

বিশেষ প্রতিনিধি
অনেকটা অলৌকিকভাবেই জীবিতভাবে দেশে ফিরেছে ছাতকের শিপন মিয়া (২০)। দালালের মাধ্যমে ইটালী যাবার উদ্দেশ্যে গত ফেব্রুয়ারি মাসে দেশ ছেড়েছিল সে। শনিবার সকালে ছাতকের মুনিরজ্ঞাতি গ্রামের হেলাল মিয়ার বাড়িতে ছেলে শিপন মিয়ার ফেরার পর পরিবারের সদস্যদের মধ্যে স্বস্তি ফিরে আসে। গত প্রায় ৫ মাস চরম দুশ্চিন্তায় ছিলো এই পরিবারটি।
শিপন মিয়া’র বেঁচে থাকার কাহিনীও অনেকটা লোমহর্ষক। এ প্রতিবেদকের সঙ্গে কথা বলার সময় শিপন বললো, কীভাবে বেঁচে ফিরেছি, আল্লাহ্ ছাড়া কেউ বলতে পারবে না। সিএনজি চালিয়ে জীবন রক্ষা করতাম। পাশের গ্রামের পরিচিত লুৎফুর রহমান লিবিয়ায় থাকে। তার সঙ্গে গত জানুয়ারি মাসে ফোনে প্রথম কথা হয়। সে বললো লিবিয়া থেকে ৮ লাখ টাকা চুক্তিতে অনেকে ইটালী যাচ্ছে। ইটালী পৌঁছার পর টাকা দিলেই চলে।
এরপর ফেব্রুয়ারি’র প্রথম দিকে দুবাই, মিশর হয়ে লিবিয়ার ভেনগাজী শহরে পৌঁছায় সে। এর পরের প্রতিটি দিন-ক্ষণ ছিল তার কষ্টের-বেদনার।
শিপন বললো, লিবিয়ার ভেনগাজি’র একটি ক্যাম্পে আটকে রাখা হয় তাকে। এটি অনেকটা জেলখানার মতো। শারীরিক অত্যাচার প্রতি মূহূর্তে চলতে থাকে। লিবিয়ার এক দালাল মাথায় পিস্তল ঠেকিয়ে বললো, বাংলাদেশ থেকে সাড়ে ৪ লাখ টাকা দ্রুত নিয়ে আসো, না হয় ওখানেই তোমার মৃত্যু। পরে বাড়িতে বাবাকে ফোন দিয়ে সবকিছু জানাই। বাবা জমি বন্ধক দিয়ে আত্মীয়-স্বজনের কাছ থেকে ঋণ করে সাড়ে চার লাখ টাকা তাদের কথা মতো লিবিয়ায় থাকা পাশের গ্রাম মায়েরকোলের লুৎফুরের বাবা জমির আলীর হাতে তুলে দেন। ভেনগাজি থেকে এরপর লিবিয়ার দালালরা আমাদের নিয়ে যায় ত্রিপলি। সেখানে নিয়ে যাবার সময়ও অনেক মারধর করেছে।
এক পর্যায়ে বললো, ২ লাখ টাকা দিতে হবে, না হয় তোদেরকে ইটালী যাবার গেইমের ঘরে নিয়ে যাব না। পরে আমার কাছে থাকা কিছু টাকা এবং লিবিয়ায় থাকা আমার এক বন্ধুর কাছ থেকে ঋণ নিয়ে বাংলাদেশী টাকায় ২ লাখ টাকা দেই তাদের। এপ্রিল মাসে সকলকে নিয়ে গেইমের ঘরে ঢুকায়। জেলখানার মতো ঘর। ছোট্ট একটি ঘর। ৬৪ জনকে ওখানে ঢুকায়। কোন দিন একবার খাওয়া দিতো, কোনো দিন দিতো না। সিলেটি ১৪ জন ওখানে ছিলাম আমরা। রমজান মাস ছিল রোজা তো রাখতেই পারিনি। ওযু কিংবা নামাজ পড়ার সুযোগও ছিল না। এক পর্যায়ে সবাইকে গেইম দেবার জন্য সাগরপাড়ে নিয়ে যায়। তিন দিন রাখে বন্দী অবস্থায়। আবার চাপ দেয় সাড়ে তিন লাখ টাকা দেবার জন্য। মারপিট শুরু হয় আবার। পরে আবার আমার বাবা খালার কাছ থেকে ঋণ করে সাড়ে তিন লাখ টাকা মায়েরকোলের লুৎফুর রহমানের কাছে দেন। কথা ছিল আমাদের বড় জাহাজে গেইম দেবে। কিন্তু তুলে দেয় কয়েকটি বুটে। মধ্যসাগরে যাবার পর বুটের তেল শেষ হয়ে যায়। ৪ দিন ওখানেই না খেয়ে ছিলাম আমরা। পরে তিউনেসিয়ার একটি জাহাজ দেখে বাঁচাও বাঁচাও চিৎকার দিয়ে ১৫ জন আমরা সাগরে লাফিয়ে পড়ি। কিছুক্ষণ পর ওই জাহাজ থেকে রশি সাগরে ছাড়লে আমরা কোনোভাবে জাহাজে ওঠি। অন্যদেরও উদ্ধার করে বুটে রাখে তিউনেশিয়ার ওই জাহাজকর্মীরা। তারাই পরে বাংলাদেশ হাইকমিশনে আমাদের এমন অবস্থার কথা জানায়। হাইকমিশন থেকে শেষে চিকিৎসকসহ হাইকমিশনার নিজেই ওখানে পৌঁছান এবং আমাদের উদ্ধার করেন।
শেষে তিউনেসিয়া থেকে বৃহস্পতিবার কাতার এবং শুক্রবার বিকাল ৫ টায় একসঙ্গে ১৭ জনকে ঢাকায় পাঠানো হয়, আরো ৩ জন পরের ফ্লাইটে আসবে শুনেছি। শনিবার বাড়িতে আসার পর সবাই কান্নাকাটি শুরু করেন। আমি বেঁচে আছি, এটিই আমার পরিবারের কাছে ছিলো অবিশ্বাস্য।
মায়েরকোলের লিবিয়া প্রবাসী লুৎফুর রহমানের বাবা জমির আলীর কোন মুঠোফোন না থাকায় তার সঙ্গে যোগাযোগ করা যায়নি।
জমির আলীর আত্মীয় খুরমা দক্ষিণ ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান আব্দুল মছব্বির জানালেন, কে, কিভাবে লিবিয়া গেছে বা ইটালী যেতে চেয়েছিল আমার জানা নেই। জমির আলী আমার আত্মীয় (বোনের জামাই), তার ছেলে লুৎফুর রহমান লিবিয়া থাকে। জমির আলীও একেবারে সহজ-সরল দরিদ্র মানুষ। দালালি করার মতো বুদ্ধি বা সাহস তার নেই। তবে মুনিরজ্ঞাতির যে ছেলেটি তিউনেসিয়া থেকে ফেরৎ এসেছে, তার বাবা হেলাল মিয়া শনিবার আমাকে জানিয়েছেন তার ছেলেকে লিবিয়া থেকে ইটালী গেইম দেবার সময় জমির আলীর (হেলাল মিয়ার) কাছে তিন লাখ টাকা দিয়েছেন।
ছাতক থানার ওসি (তদন্ত) আমিনুল ইসলাম জানালেন, রোববার বিকাল পর্যন্ত তিউেেনসিয়া থেকে ছাতকের কেউ ফিরেছে সেই তথ্য বা কোন ধরনের অভিযোগ তাদের কেউ জানায়নি।