অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত উন্নীত প্রাথমিক বিদ্যালয়/ শিক্ষক ও শ্রেণিকক্ষ বাড়ানোর ব্যবস্থা নিন

অস্ত্র ছাড়া যুদ্ধে নামিয়ে দেয়ার পরিণতি হলো নিশ্চিত পরাজয়কে ডেকে আনা। তেমনি কোনো সুযোগ-সুবিধার ব্যবস্থা ছাড়া একটি বিদ্যালয়ে তিনটি উচ্চতর শ্রেণি চালু করে দেয়ারও অর্থ হলো, মূল ও বর্ধিত সবগুলো শ্রেণি কার্যক্রমে স্থবিরতা নেমে আসা। গতকাল দৈনিক সুনামগঞ্জের খবরে প্রকাশিত একটি সংবাদ থেকে জানা যায়, জেলার তাহিরপুর উপজেলার ঘাগটিয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ও সোহালা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত শ্রেণি কার্যক্রম শুরু করার অনুমোদন দেয়া হয়। সে প্রেক্ষিতে ২০১৩ সনে ষষ্ঠ শ্রেণিতে শিক্ষার্থী ভর্তি শুরু হয়। ২০১৩ সনে যারা ষষ্ঠ শ্রেণিতে ভর্তি হয়েছিলেন তারা ইতোমধ্যে অষ্টম শ্রেণি পাস করে চলে গেছেন। তদস্থলে নতুন শিক্ষার্থীরা এসেছেন। এই পৌনপুনিকতা চলতে থাকবে। উন্নত বিশ্বে অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত প্রাথমিক শিক্ষা বিবেচনা করা হয়। সরকার বিশ্বের উন্নত শিক্ষা ব্যবস্থা অনুসরণ করতেই পাইলটিং হিসাবে দেশের বেশ কিছু প্রাথমিক বিদ্যালয়ে অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত শিক্ষা কার্যক্রম শুরু করেন। একইভাবে বেশ কিছু উচ্চবিদ্যালয়ে দ্বাদশ শ্রেণি পর্যন্ত খোলা হয়। অর্থাৎ সরকার অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত প্রাথমিক ও দ্বাদশ শ্রেণি পর্যন্ত শিক্ষার মাধ্যমিক মান স্থির করার লক্ষ্য নির্ধারণ করেছিলো। আমরা এ সিদ্ধান্তকে সাধুবাদ জানিয়েছিলাম। কিন্তু আজ প্রায় ১০ বছরের মাথায় এসে আমরা কী দেখছি? দৈনিক সুনামগঞ্জের খবরে প্রকাশিত সংবাদের তথ্য অনুসারে তাহিরপুরের বর্ণিত দুইটি বিদ্যালয়ে অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত শিক্ষা কার্যক্রম পরিচালনা করার জন্য পর্যাপ্ত শিক্ষক ও অন্যান্য সহায়ক স্টাফের ব্যবস্থা করা হয়নি। বাড়ানো হয়নি শ্রেণিকক্ষ। ধারণা করা যায় সর্বত্রই একই অবস্থা বিরাজমান। উপযুক্ত সংখ্যক শিক্ষক ও শ্রেণিকক্ষ ছাড়া বাড়তি ৩টি শ্রেণির শিক্ষা কার্যক্রম চালানো কী করে সম্ভব? অনুমিত হয় এসব বিদ্যালয়ের ষষ্ঠ-অষ্টম শ্রেণিতে অধ্যয়নরত শিক্ষার্থী সংখ্যা আশানুরূপ নয়। যদিও অল্প কিছু শিক্ষার্থী থাকে তাদেরও যথাযথ পাঠদান হচ্ছে না।
আমরা জাতীয়ভাবে অগ্রগতির কিছু লক্ষ্যমাত্রা স্থির করেছি। এসবের মধ্যে ২০৪১ সনের মধ্যে উন্নত বাংলাদেশ গঠন হলো চূড়ান্ত লক্ষ্য অর্জনের সীমারেখা। এর মাঝখানে আরও বেশকিছু লক্ষ্যমাত্রা আছে (এসডিজিতে বর্ণিত)। এসব লক্ষ্যমাত্রা পূরণ করতে চাই দক্ষ ও শিক্ষিত জনগোষ্ঠী। আধুনিক ও বিজ্ঞান-প্রযুক্তি নির্ভর শিক্ষায় শিক্ষিত ব্যক্তিদের হাত ধরেই কেবল বাংলাদেশকে উন্নত বাংলাদেশে রূপান্তর সম্ভব। কিন্তু শিক্ষার ক্ষেত্রে এখন যে লেজেগোবরে অবস্থা চলছে তাতে জাতীয় লক্ষ্যমাত্রাসমূহ কী উপায়ে অর্জিত হবে তা আমরা ভেবে পাই না। শিক্ষার বিনিয়োগকে কখনও লোকসান বিবেচনা করা হয় না। এ বিনিয়োগ সময়ের ব্যবধানে কয়েক গুণ বেশি ফেরৎ আসে। উন্নয়নপ্রত্যাশী দেশগুলো তাই শিক্ষায় বিনিয়োগ করে সবচাইতে বেশি। কিন্তু আমাদের জাতীয় বাজেটে শিক্ষা এখনও এক নম্বর খাত হতে পারেনি। এই ঘাটতি রেখে কাগজে কলমে তৈরি করা পরিকল্পনা আর বাস্তবতার মধ্যে অনেক ফারাক তৈরি করবে।
শিক্ষা নিয়ে চিন্তা করেন এমন মহলের অভিমত হলোÑ বাংলাদেশের মূল ধারার জাতীয় শিক্ষা ব্যবস্থাকে আরও অনেক বেশি মজবুত করতে হবে। সুতরাং মূল ধারার শিক্ষা ক্ষেত্রে বিনিয়োগ বাড়ানো ছাড়া উপায় নেই। সরকার ভালো ভালো চিন্তা করেন, পরিকল্পনা সাজান; কিন্তু তার সাথে তাল মিলিয়ে বাস্তবায়নের পথরেখা তৈরি করতে পারেন না। এজন্য চালুর ১০ বছরেও প্রাথমিক বিদ্যালয়ে বর্ধিত ৩টি শ্রেণির জন্য কোনো শিক্ষক নিয়োগ করা যায়নি, যায়নি শ্রেণিকক্ষ বাড়ানো। ঘাগটিয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ও সোহালা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের অভিজ্ঞতা থেকে আমরা সরকারের প্রতি আহ্বান জানাই, অবিলম্বে প্রয়োজনীয় সংখ্যক শিক্ষকের পদ সৃজন ও নিয়োগ দানসহ শ্রেণিকক্ষ বাড়ানোর ব্যবস্থা নিন। প্রাথমিক শিক্ষাকে অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত অগ্রায়িত করার শিক্ষাবান্ধব কর্মসূচিটিকে মুখ থুবরে শুকিয়ে যেতে দেয়া যায় না।