‘অসাম্য -ভেদজ্ঞান দূর করতেই আমি এসেছিলাম’

সজীব দে
আমাদের জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বাঙালি সমাজ-সংস্কৃতি এবং রাজনৈতিক পরিবেশ-প্রকৃতিতে এক অনন্য নাম, বিস্ময়কর স্রষ্টা। বিদ্রোহী সত্তার চেয়ে তাঁর প্রতিভা ও শ্রমনিষ্ঠা প্রকট হয়ে জাগ্রত হয়েছে সাম্যবাদী দৃষ্টিকোণে, অন্যায়-অত্যাচারের বিরুদ্ধে। মানুষকে, মানুষের ধর্মকে নজরুল বড় করে দেখেছেন আজীবন। তিনি চেয়েছেন মানুষের কল্যাণ, সমাজের মঙ্গল, স্বদেশের স্বাধীনতা। ঔপনিবেশিক শোষণ, অত্যাচার এবং ধর্মীয় কুসংস্কারের বিরুদ্ধে সচেতন বিদ্রোহী রূপে বাংলা কবিতায় আত্মপ্রকাশ করেন নজরুল। বিংশ শতাব্দীর তৃতীয় দশকের সবচেয়ে নির্ভীক ও বলিষ্ঠ কবিকন্ঠ তাঁরই। মানবতার সপক্ষে তিনি উচ্চারণ করেছেন বিদ্রোহের বাণী, সত্য সুন্দর মঙ্গলের আকাক্সক্ষায় তিনি বিদ্রোহ ঘোষণা করেছেন যাবতীয় অপশক্তির বিরুদ্ধে, ধর্মীয় শোষণের বিরুদ্ধে এবং জীর্ণ-পুরাতন মূল্যবোধের বিরুদ্ধে।
জনসাধারণের দুঃখ-দুর্দশার জন্য কিছু মানুষের লোভ ও স্বার্থপরতাই দায়ী। তাদের ঐশ^র্যের মূলে আছে শ্রমজীবী জনগণের আত্মদান। কিন্তু সকল ক্ষেত্রেই এরা প্রাপ্য থেকে বঞ্চিত হয়। এরা জমিতে ফসল ফলালেও এদের গোলা শূন্য থেকে যায়। এজন্য শুধু স্বদেশেরই নয় বিশে^র মানব গোষ্ঠীর সাথে নজরুল একাত্মতা অনুভব করে বঞ্চনার অবসান করতে বিদ্রোহীর ভূমিকায় অবতীর্ণ। অবিচার ও নিপীড়নের জন্য বিধাতার কাছে আবেদন করে নিশ্চিত থাকতে পারেননি। তাই নিজেই এসবের অবসান ঘটানোর জন্য সংগ্রামে অংশগ্রহণের ডাক দিয়েছেন। তিনি চেয়েছিলেন আপাত ক্ষমতাহীন অসহায় মানুষ উঠে আসুক কেন্দ্রের ভূগোলে অপাঙক্তেয় শূদ্ররাই শাসন করুক পৃথিবীকে। ঘনিষ্ট মানবতাবোধই তাঁর সাম্যবাদের ভিত্তি। মানুষের ভেদাভেদ তিনি স্বীকার করেননি। নরনারীর মধ্যে অধিকার বৈষম্যের তিনি বিরোধী। মানবধর্মকেই তিনি সবার উপরে স্থান দিয়েছেন। মানুষের মধ্যে দিয়ে প্রত্যক্ষ করেছেন ভগবানকে।
‘হেথা ¯্রষ্টার ভজনা আলয় এই দেহ এই মন,
হেথা মানুষের বেদনায় তাঁর দুখের সিংহাসন
সাড়া দিন তিনি এখানে তাঁহারে যে-নামে যে কেহ ডাকে
যেমন ডাকিয়া সাড়া পায় শিশু যে নামে ডাকে সে মা’কে’
তিনি বলেছেন,
‘গাহি সাম্যের গান
যেখানে আসিয়া এক হয়ে গেছে সব ব্যবধান
যেখানে মিশিছে হিন্দু, বৌদ্ধ, মুসলিম, খ্রিস্টান’
তিনি কল্পনা করেছেন এক সাম্যবাদী সমাজের, যেখানে নেই শোষণ, বৈষম্য আর সাম্প্রদায়িক বিভেদ, নেই জনগোষ্ঠীর প্রতি কোন তুচ্ছতাবোধ। নজরুলের দৃষ্টিতে ভগবানের সৃষ্টির মধ্যে সাম্য, আনন্দ ও ভালোবাসার বাণী উচ্চারিত। একদল লোভী, স্বার্থপর, ও হিং¯্র মানুষ ভগবানের সৃষ্টিকে কলুষিত করেছে। রুদ্র-মঙ্গল গ্রন্থে তিনি লিখেছেন,
‘অবতার-পয়গম্বরা, কেউ বলেননি, আমি হিন্দুর জন্য এসেছি, আমি মুসলমানের জন্য এসেছি, আমি খ্রিস্টানের জন্য এসেছি। তাঁরা বলেছেন, আমরা মানুষের জন্য এসেছি। আলোর মত, সকলের জন্য। কিন্তু কৃষ্ণের ভক্তেরা বললে, কৃষ্ণ হিন্দুর; মুহম্মদের ভক্তেরা বললে, মুহম্মদ মুসলমানদের; খ্রিস্টের শিষ্যেরা বললে, খ্রিস্ট খ্রিস্টানদের। কৃষ্ণ-মুহম্মদ-খ্রিস্ট হয়ে উঠলেন জাতীয় সম্পত্তি। আর এই সম্পত্তিত্ব নিয়েই যত বিপত্তি। আলো নিয়ে কখনো ঝগড়া করে না মানুষে…..’
নজরুল ধর্মের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করেননি, তিনি বিদ্রোহ করেছেন ধর্ম-ব্যবসায়ীর বিরুদ্ধে। একালে যেমন, সেকালেও তেমনি, ধর্মকে শোষণের প্রধান হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে। তিনি নিজেই নিজেকে প্রশ্ন করে উত্তর দিয়েছেন-
‘কে ভগবান?
আত্মজ্ঞান।’
নজরুল জাতি-ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে অসাম্প্রদায়িক চেতনায় সকল মানুষের কল্যাণ কামনা করেছেন। শোষণ ও অত্যাচারের বিচার ও দ-ের ভার ভগবানের হাতে তুলে না দিয়ে মানুষকে আত্মসচেতন হতে বলেছেন। আত্মচেতনা প্রজ্জ্বলিত হলেই মানুষ ভগবানের সৃষ্টিকে সুন্দর করতে পারবে। তিনি স্বাগত জনিয়েছেন আত্মশক্তিতে বলীয়ান বীরকে।
‘এস বিদ্রোহী মিথ্যা, সুদন আত্মশক্তি বুদ্ধ বীর
আনো উলঙ্গ সত্য-কৃপাণ, বিজলী-ঝলক ন্যায় অসির’
সামাজিক অসুরশক্তিকে ধ্বংস করার বাসনায় তিনি দেবী চ-ীর অসুরনাশিনী শক্তি আহ্বান করেছেন। ধ্বংসের শেষে কবি কামনা করেছেন সৃষ্টির উল্লাস-
‘দেখা মা আবার দনুজ-দলনী
অশিব-নাশিনী চ–রূপ;
দেখাও মা ঐ কল্যাণ-করই
আনিতে পারে কি বিনাশ-স্তুপ।
শ্বেত-শতদল-বাসিনী নয় আজ
রক্তাম্বরধারিণী মা,
ধ্বংসের বুকে হাসুক মা তোর
সৃষ্টির নব পূর্ণিমা।’
কাজী নজরুল ইসলামের আবির্ভাব ১৩০৬ সালের ১১ জ্যৈষ্ঠ (১৮৯৯ খ্রিস্টাব্দের ২৪ মে) মঙ্গলবার। ধুমকেতুর মতো আবির্ভূত হয়েছিলেন তিনি। নিপীড়িত ও পরাধীন জনসমাজের সঙ্গে একাত্ম হয়ে তিনি শাসন ও শোষণের বিরুদ্ধে সংগ্রামে অংশ নিয়েছিলেন। সংগ্রামে অংশ নিয়েছিলেন শুধু বিত্তের দারিদ্র্য নয়, চিত্তের দারিদ্র্যকেও উৎখাত করার জন্য। ১৯৪১ সালে বঙ্গীয় মুসলমান সাহিত্য সমিতির সম্মেলনে জীবনের শেষ বক্তব্যে নজরুল বলেন,‘……..দিনরাত হানাহানি, জাতিতে জাতিতে বিদ্বেষ, যুদ্ধ বিগ্রহ। মানুষের জীবনের একদিকে কঠোর দারিদ্র্যে, ঋণ, অভাব-অন্যদিকে লোভী অসুরের যক্ষের ব্যাংকে কোটি কোটি টাকার পাষাণ স্তুপের মতো জমা হয়ে আছে। এই অসাম্য, এই ভেদজ্ঞান দূর করতেই আমি এসেছিলাম। আমার কাব্যে, সংগীতে, কর্মজীবনে অভেদ্য সুন্দর সাম্যকে প্রতিষ্ঠিত করেছিলাম। অসুন্দরকে ক্ষমা করতে, অসুরকে সংহার করতে এসেছিলাম।……..’
কাজী নজরুল ইসলাম শোষিত ও লাঞ্ছিত জনগণের মুক্তির সংগ্রামে অদম্য প্রেরণা, শক্তি ও সাহস হয়ে বেঁচে থাকবেন অনন্তকাল। আজ বিদ্রোহী কবি, সাম্যর কবি কাজী নজরুল ইসলামের জন্মদিন। তাঁর প্রতি রইলো গভীর শ্রদ্ধাঞ্জলী।