অহংকারের শহিদ মিনার কারা দখল করতে চায়?

বিশেষ প্রতিনিধি
সুনামগঞ্জ কেন্দ্রীয় শহিদ মিনারকে দৃষ্টিনন্দন করে তৈরি করতে অর্থ বরাদ্দ পাবার পরও শহিদ মিনারের আশপাশে জমি না পাওয়ায় তা করা যাচ্ছে না। অথচ. এর আশপাশের জমি দখল করে কারা দোকান তৈরি করছে? এর উত্তর খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। বুধবার রাতে শহিদ মিনারের পূর্বদিকে তড়িঘড়ি করে গড়ে ওঠা ৮ টি নির্মিতব্য দোকানকোঠা ভাঙা হয়েছে।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, কেন্দ্রীয় শহিদ মিনারের পশ্চিম দিকে মধ্য শহরের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিচারালয়ের জমিতে সম্প্রতি টিনশেড কয়েকটি দোকানকোঠা নির্মাণ করে ভাড়া দেওয়া হয়েছে। গত কয়েকদিন ধরে পূর্বদিকের জমিতে চারদিকে উঁচু করে টিনের বেড়া দিয়ে ভেতরে ৮ টি টিনশেড দোকানকোঠা তৈরি করা হচ্ছিল।
এভাবে শহিদ মিনারের পাশে দোকানকোঠা নির্মাণ হচ্ছে দেখে স্থানীয় মুক্তিযোদ্ধা-জনতা ক্ষুব্ধ হন। তারা জেলা প্রশাসককে বিষয়টি অবহিত করেন।
মুক্তিযোদ্ধারা জেলা প্রশাসককে জানান, জমি না পাওয়ায় পুরাতন শহিদ মিনারের স্থানে বৃহৎ আকারে দৃষ্টিনন্দন শহীদ মিনার নির্মাণ করা যাচ্ছে না। অথচ. দিনে রাতে তড়িঘড়ি করে এখানে দোকানকোঠা নির্মাণ করে সরকারি জমি দখল করে নেয়া হচ্ছে।
মুক্তিযোদ্ধা আবু সুফিয়ান বলেন, এই নিয়ে পরে জেলা প্রশাসক সভা আহ্বান করেন। সভায় উপস্থিত মুক্তিযোদ্ধাসহ বিশিষ্টজনেরা জানিয়ে দেন, শহীদ মিনারের পাশের স্থাপনা ভাঙা না হলে, বর্তমান শহীদ মিনার পরিত্যক্ত ঘোষণা করে, এর পাশে প্রতীকী শহীদ মিনার নির্মাণ করে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসে ফুল দেওয়া হবে। একারণে যারা দায়ী, তাঁদের বিষয়টিও সকলকে জানিয়ে দেওয়া হবে। এরপরই বুধবার রাতে অবৈধভাবে নির্মিতব্য ৮ দোকানকোঠা বিপুল সংখ্যক পুলিশের উপস্থিতিতে ভাঙা হয়।
বৃহস্পতিবার সকালে এই দোকানকোঠা কারা নির্মাণ করেছে, সরেজমিনে গিয়ে জানতে চাইলেÑ হকার হেলাল মিয়া বলেন,‘হকার সমিতির ৮ জন মিলে আমরা এই দোকানকোঠা নির্মাণ করছিলাম। এজন্য আমরা কাউকে কোনো টাকা দেই নি। তবে জেলা জজ সাহেবের নাজির সাহেবের মৌখিক অনুমতি নেওয়া হয়েছিল। আমরা শহীদ মিনারের পশ্চিমাংশের জমিতে হকারদের জন্য দোকানকোঠা নির্মাণের চেষ্টা করেছিলাম। ওখানে বিচারালয়ের উদ্যোগে টিনশেড মিনি মার্কেট হওয়ায় পূর্বদিকে আমরা ৮ টি দোকানকোঠা তৈরি করেছিলাম। এগুলো বুধবার রাতে ভেঙে দেওয়া হয়েছে।’
নির্মিতব্য এই ৮ দোকানকোঠার মালিক কারা কারা? জানতে চাইলে হেলাল মিয়া জানালেন, হকার সমিতির সভাপতি খোকন মিয়া, উপদেষ্টা হাসানুজ্জামান ইস্পাহানী, তাজুল ইসলাম, সজীব মিয়া, মকব্বির মিয়া, আমার নিজের একটা এবং আরেকজনের আরেকটি দোকানকোঠা রয়েছে। তার নাম জানা নেই।’
তিনি বলেন, ‘আমরা ফুটপাতে বসে দোকান চালাই, আমরা শহীদ মিনারের পূর্বদিকে জোর করে দোকান বানাতে চাইনি, অনেকদিন ধরেই আমরা এখানে দোকানকোঠা করার চেষ্টা করেছি। এজন্য রাজনৈতিক নেতা ও জনপ্রতিনিধিদের কাছে গিয়েছি। সম্প্রতি মৌখিক অনুমতি পেয়েছি বলেই দোকান বানানো শুরু করেছিলাম।
হকার সমিতির উপদেষ্টা হাসানুজ্জামান ইস্পাহানী বলেন, আমি কীভাবে বিচারালয়ের জমিতে দোকানকোঠা করবো? আমার নাম কেন আসছে? আমি দোকানকোঠা বানাতে গিয়েছি, এমন প্রমাণ কেউ দিতে পারবেন না। আমার জানামতে হকারদের নেতারা আলোচনা সাপেক্ষেই দোকানকোঠা তৈরি করছিল।
জেলা ও দায়রা জজ কার্যালয়ের নায়েবে নাজির সিফাত শাহ্রিয়ার বলেন,‘আমরা কাউকে দোকান বানানোর অনুমতি দেইনি। আমাদের এই ক্ষমতাও নেই। যারা আমাদের নাম প্রচার করছে তারা মিথ্যাচার করছে।’
সুনামগঞ্জ সদর উপজেলা মুক্তিযোদ্ধা সংসদের সাবেক উপজেলা কমান্ডার মুক্তিযোদ্ধা আব্দুল মজিদ বলেন, শহীদ মিনারের জন্য পাশের সরকারি জমির এক ইঞ্চিও চেষ্টা করে পাওয়া যাচ্ছে না। আর অবৈধভাবে দোকানকোঠা নির্মাণ করা হচ্ছিল, কেউ বাধাও দিচ্ছে না দেখে আমরা ক্ষুব্ধ হয়ে জেলা প্রশাসককে জানাই। এই সাহস কোথা থেকে পেয়েছে দখলকারীরা, এটি প্রশাসনের বা বিচার বিভাগের দায়িত্বশীলদের খুঁজে বের করা প্রয়োজন।
সুনামগঞ্জের জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ আব্দুল আহাদ বলেন,‘শহীদ মিনারের লাগোয়া ভূমি দখল করে দোকানকোঠা নির্মাণের খবর জানানোর পর জেলা জজ সাহেব নিজ উদ্যোগেই অবৈধভাবে নির্মিত স্থাপনা ভেঙে ফেলার নির্দেশ দেন।