‘অ্যাপিডেমিক সানফ্লাওয়ার ম্যানিয়া ইন সুনামগঞ্জ’

ভাদেরটেকের সালামপুরের একখন্ড সূর্যমুখী ফুলের জমিতে হঠাৎ করে ব্যাপক দর্শনার্থী সমাগমকে জনৈক ব্যক্তি ফেসবুকে ‘অ্যাপিডেমিক সানফ্লাওয়ার ম্যানিয়া ইন সুনামগঞ্জ’ বলে মন্তব্য করেছেন। অর্থাৎ তিনি বলতে চাইছেন এটি ‘বদভ্যাসের মহামারি’ তে পরিণত হয়েছে। আসলেই কি তাই? জনৈক আব্দুর রহমান নামের কৃষক বিশ্বম্ভরপুর কৃষি অধিদপ্তরের সহযোগিতায় সুনামগঞ্জ-বিশ্বম্ভরপুর সড়কের লাগোয়া এই জমিতে সূর্যমুখীর আবাদ করেছেন। সূর্যমুখীর বীজ থেকে উৎকৃষ্ট ভোজ্য তৈল তৈরি হয়। বাংলাদেশ ভোজ্য তৈলের ক্ষেত্রে এখনও বিদেশনির্ভর। সরকার তাই ভোজ্য তৈল হয় এমন কৃষিভিত্তিক উৎপাদনে বিশেষ প্রণোদনা জুগিয়ে যাচ্ছেন। স্বল্পসুদে ব্যাংক ঋণ থেকে শুরু করে উপকরণ সরবরাহ থেকে প্রযুক্তিগত পরামর্শ- সবই প্রদান করা হয়। এই সহযোগিতা ও উদ্বুদ্ধকরণের ফলেই আব্দুর রহমান সূর্যমুখী বাগানটি গড়ে তুলেছেন। এটি প্রশংসনীয় উদ্যোগ। কিন্তু বাগানটি শুধু এ কারণে প্রসিদ্ধ হয়ে উঠতে পারেনি। বরং সম্পূর্ণ ভিন্ন এক কারণে বাগানটি অনেকের নিকট একটি দর্শনীয় স্থানে পরিণত হয়েছে সাময়িকভাবে। সেটি কোনো বাণিজ্যিক সংশ্রব থেকে নয় বরং মানুষের চিরন্তন সৌন্দর্য পিপাসার কারণে। এখন বিতর্ক হতে পারে মানুষের এই সৌন্দর্য বিলাস কি আসলেই বদভ্যাসের মহামারি?
সৌন্দর্যবোধ কখনও মহামারি কিংবা বদভ্যাসের মতো একটি নেতিবাচক প্রবণতা হতে পারে না। বরং সৌন্দর্যবিমুখতাকে এমনটি বলা চলে। মানুষের মস্তিস্ক যখন সুগঠিত হতে শুরু করল তখন থেকেই সুন্দরের প্রতি তার ভালোবাসা জন্ম নেয়। সভ্যতার অতি প্রাচীনকালেও মানুষের এই চিরন্তন সৌন্দর্যাকাক্সক্ষার প্রকাশ দেখা যায় বিভিন্নভাবে। পাথরে খোদাই করে, পাহাড়ের গায়ে এঁকে কিংবা বস্তুর রূপান্তর ঘটিয়ে মানুষ এই প্রীতিবোধের পরিচয় দিয়েছে। এই অন্তর্গত সৌন্দর্যবোধের কারণেই মানুষের সভ্যতা ক্রমাগত এগিয়েছে, সমৃদ্ধ হয়েছে, মানবিকতায় উদ্ভাসিত হয়েছে। এমন একটি সদ্গুণকে কখনও বদভ্যাসের মহামারি আখ্যায়িত করার সুযোগ রয়েছে বলে অন্তত আমরা মনে করি না।
এ কথা ঠিক, কৃষিজমিতে হঠাৎ করে অতিরিক্ত লোক সমাগমের কারণে সূর্যমুখী বাগানটি কিছুটা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। খামারের মালিক অভিযোগ করেছেন অনেকে বাগানের ভিতর ঢুকে গাছগুলোকে দুমড়িয়ে মুচড়িয়ে দিচ্ছেন। অনেকে ফুল ছিঁড়ে নিচ্ছেন। এ কারণে তিনি উৎপাদন হ্রাসের আশঙ্কায় আছেন। বাগান মালিকের এই আশঙ্কা কৃষি উৎপাদনের নিরিখে আংশিক সত্য। তবে যে মানুষ সৌন্দর্য ভালোবাসে তারা সাময়িকভাবে অতিউৎসাহী হয়ে কিছু ক্ষতিকর কাজ করে ফেললেও একটু বুঝিয়ে বললেই তারা অনিষ্টকর কর্মকা- থেকে বিরত থাকেন। আলোচ্য সূর্যমুখীর বাগানেও সৌন্দর্যপিপাসুদের এমন সচেতনতা ব্যাপকভাবে লক্ষ্য করা গেছে। নতুবা দিনে যত মানুষের সমাগম ঘটে তাতে বাগানের একটি গাছ কিংবা ফুলও অক্ষত থাকার কথা ছিল না এই ক’দিনে। গিয়ে দেখুন বাগানটির অসংখ্য প্রস্ফূটিত সূর্যমুখী ফুল এখনও হলুদ আলোয় উদ্ভাসিত করে রেখেছে পুরো এলাকা।
ব্যক্তি বিশেষের বিচ্যুতি কিংবা অতি উৎসাহকে কখনও সমষ্টির অভ্যাসের সাথে তুলনীয় নয়। কিন্তু ফেসবুক মন্তব্যকারী এই ভুলটিই করেছেন। এখন নানাভাবে মানুষের সভ্যতা বিপর্যস্থ। মানুষে মানুষে বিচ্ছিন্নতা প্রবলভাবে বাড়ছে। স্বার্থ, ক্ষমতা, কুরুচি, হীনমন্যতা প্রভৃতির কারণে চারিদিকে অশান্তির আগুন। মানুষ আরেক মানুষকে হত্যা করতে বিন্দুমাত্র কম্পিত হয় না। একজনের সর্বস্ব হরণে আরেকজনের হৃদয় একটুও টলে উঠে না। প্রতিনিয়ত মিথ্যা আর প্রবঞ্চনায় আচ্ছন্ন থাকতে অনেকেই দ্বিতীয়বার চিন্তা করে না। মানুষের ভিতরকার এই কুপ্রবৃত্তিগুলোকেই বরং অ্যাপিডেমিক ম্যানিয়া বলা যতে পারে। একখন্ড সূর্যমুখী বাগানের হলুদ আলো যদি বিভ্রান্ত মানুষের অন্তর্গত সুপ্রবৃত্তিগুলোকে একটুখানি জাগিয়ে তুলতে পারে তাতে ক্ষতি কি? আর ক’দিন পরই কৃষক ফুল থেকে বীজ সংগ্রহ করবেন। তখন আর ফুল থাকবে না। মানুষও আসবে না। তাই যে কয়েকদিন ফুল রয়েছে সেই দিনগুলো মানুষ একটু নির্মল আনন্দে মেতে থাকুক চাষির ক্ষতি না করে।