আইলো নতুন বছর

মনোরঞ্জন তালুকদার
‘লইয়া নব সাজ
কুঞ্জে ডাকে কোকিল- কেকা
বনে গন্ধরাজ’
-ময়মনসিংহ গীতিকা
বাঙালির অসাম্প্রদায়িক চেতনার অন্যতম প্রধান উৎসব হচ্ছে ১লা বৈশাখ। বাঙালি প্রজন্মের স্বকীয়তা, স্বাজত্যবোধ ও স্বাধীন সত্তা প্রতিষ্ঠার আন্দোলনে ১লা বৈশাখের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ। পাকিস্তানি শাসক গোষ্ঠী থেকে শুরু করে আজও অনেক সাম্প্রদায়িক গোষ্ঠী পহেলা বৈশাখকে “হিন্দুয়ানী সংস্কৃতি” বলে অপপ্রচার করে এর অসাম্প্রদায়িক চেতনা কে রুখে দেবার এক নিরন্তর প্রচেষ্টায় লিপ্ত। অথচ ইতিহাস স্বাক্ষী, এই বাংলা নববর্ষের গোড়া পত্তন হয়েছে মোগল সম্রাট জালালুদ্দিন মুহাম্মদ আকবরের হাতে। বঙ্গাব্দ প্রচলনের পূর্বে আমাদের এখানে শকাব্দ প্রচলিত ছিল। শক বর্ষপঞ্জির প্রথম মাস ছিল চৈত্র। কিন্তু ৯৬৩ হিজরী সালের মোহরম মাস ছিল বাংলা বৈশাখ মাস। আর এ জন্যই স¤্রাট আকবর বৈশাখ মাসকেই বঙ্গাব্দ বা বাংলা বর্ষপঞ্জির প্রথম মাস এবং ১লা বৈশাখ কে বাংলা নববর্ষের প্রথম দিন নির্ধারণ করেন। ১৫৮৪ খ্রিষ্টাব্দে স¤্রাট আকবর সৌর বর্ষপঞ্জী প্রচলন করেন। তার পূর্বে ভারত বর্ষে মুসলিম শাসনামলে হিজরী পঞ্জিকা অনুসরণ করেই সকল কাজ কর্ম পরিচালিত হতো। চান্দ্র বছর ৩৫৪ দিনে ফলে ঋতুগুলি ঠিক থাকতো না। অন্যদিকে চাষাবাদ ও এ জাতীয় অনেক কাজ ছিল ঋতু নির্ভর। এই সমস্যা সমাধানের জন্য স¤্রাট আকবর চান্দ্র পঞ্জিকাকে সৌর পঞ্জিকায় রূপান্তরিত করেন। কাজেই এটা কোন অবস্থাতের “হিন্দুয়ানী সংস্কৃতি” নয় বরঞ্চ এটা হচ্ছে আপামর বাঙ্গালির সংস্কৃতি।
বাংলা সাহিত্য, বাঙ্গলা ভাষা কিংবা বাংলা সংস্কৃতির উপর যখনই আঘাত এসেছে তখন সে আঘাতকে প্রতিরোধ করে বাংলা সাহিত্য, বাংলা ভাষা ও বাংলা সংস্কৃতি চর্চ্চাকে বেগবান করেছেন বাঙালি মুসলমানরাই। সেটা আরাকান রাজ সভাতেই হোক, কিংবা বাংলাকে রাষ্ট্র ভাষা না করার চক্রান্ত কালেই হোক অথবা রবীন্দ্র চর্চ্চা বিরোধিতার নামে বাঙালি সংস্কৃতিকে ধ্বংস করার চেষ্টার সময়ই হোক।
ভাষা আন্দোলনকে কেন্দ্র করে যদি বাঙালি জাতীয়তাবাদের উদ্বোধন হয়ে থাকে তবে রমনার বটমূলে বাংলা নববর্ষ উদযাপন বাঙালি জাতীয়তাবাদী চেতনার বিকাশের ধারাকে বেগবান করেছে। “ছায়ানট” ১৯৬৫ সালের ১৪ এপ্রিল (১লা বৈশাখ ১৩৭২) রমনার বটমূলে বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের “এসো হে বৈশাখ এসো এসো” গানটি দিয়ে আনুষ্ঠানিক ভাবে বাংলা নববর্ষ উদযাপন শুরু করে। বস্তুত এই দিনটি থেকেই “পহেলা বৈশাখ” বাঙালি সংস্কৃতির এক পরিচায়ক রূপ ধারণ করে। ১৯৭২ সালে (বাংলা ১৩৭৯) “পহেলা বৈশাখ বাংলাদেশের জাতীয় পার্বন হিসেবে অন্তর্ভুক্ত হয়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদের উদ্যোগে মঙ্গল শোভাযাত্রা ও বর্তমান সরকার সরকারি কর্মচারীদের জন্য বৈশাখি উৎসব ভাতা চালু করলে পহেলা বৈশাখ উদযাপনে নতুন মাত্রা যুক্ত হয়।
যদিও ১লা বৈশাখকে বাংলা নববর্ষ হিসেবে পালনের সাথে অর্থনৈতিক উদ্দেশ্যটাই অতীতে মূখ্য ছিল কিন্তু বর্তমানে তা বাঙালি সংস্কৃতির অন্যতম অনুষঙ্গ হিসেবে বিবেচিত হয়। প্রসংগক্রমে একটা কথা উল্লেখ করতে চাই, পহেলা বৈশাখ কখনই বাঙালি সংস্কৃতির হাজার বছরের ঐতিহ্য নয়। যদিও অনেকেই আবেগ তাড়িত হয়ে এমনটিই ভাবেন। যেখানে ৯৬৩ হিজরী সাল থেকে বঙ্গাব্দ গণনা শুরু সেখানে (১৪২৫-৯৬৩ = ৪৬২ বছর) অর্থাৎ ৪৬২ বছরের ঐতিহ্য। যাহোক কত বছরের ঐতিহ্য সেটার চেয়েও চরম সত্য পহেলা বৈশাখ বাঙালি ঐতিহ্যের অবিচ্ছেদ্য অংশ।
আজ বাংলা নববর্ষের শুরুতেই প্রার্থনা করছি, নববর্ষের প্রতিটি দিন সবার স্বপ্নের পাশাপাশি কাজ করুক।
মুছে যাক গ্লানি ঘুচে যাক জরা
অগ্নিস্নানে শুচি হোক ধরা।
সবাইকে নববর্ষের শুভেচ্ছা।
লেখক : সহকারি অধ্যাপক, জগন্নাথপুর ডিগ্রি কলেজ।