আওয়ামী লীগের সম্মেলনকে হতে হবে অনুকরণযোগ্য

ক্ষমতাসীন দল হিসেবে আওয়ামী লীগের যেকোনো ইউনিটের সম্মেলন তথা কমিটি গঠনের বিষয়টি সকলের উৎসাহের কেন্দ্রবিন্দুতে থাকবে সেটি খুবই স্বাভাবিক। দলের কেন্দ্রীয় সম্মেলনকে সামনে রেখে এখন তৃণমূলের ইউনিটগুলোর সম্মেলন হচ্ছে। জেলা আওয়ামী লীগ ইতোমধ্যে উপজেলা ও পৌর ইউনিটগুলোর সম্মেলনের তারিখ নির্ধারণ করেছে। অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব ও উপদলীয় কোন্দলে জর্জরিত ছাতক উপজেলা ও পৌরসভা এবং দোয়ারাবাজার উপজেলা ইউনিটের সম্মেলনের বিষয়ে জেলা নেতৃবৃন্দ কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের দ্বারস্থ হয়েছেন। জেলার সামান্য কয়েকটি ইউনিয়নে ইতোমধ্যে সম্মেলন আয়োজনের খবর পাওয়া গেছে। এক্ষেত্রে বিশ্বম্ভরপুর আ্ওয়ামী লীগ নিঃসন্দেহে অন্য উপজেলাগুলোর চাইতে অনেক এগিয়ে আছে। ওই উপজেলার ৩টি ইউনিয়নে এরই মাঝে সম্মেলন শেষ হয়েছে। এজন্য বিশ্বম্ভরপুর উপজেলা আ.লীগ নেতৃত্ব বিশেষ অভিনন্দন পেতে পারেন। কিন্তু বিশ্বম্ভরপুরের মতো জেলার অন্য উপজেলাগুলোর ইউনিয়ন বা ওয়ার্ড পর্যায়ে সম্মেলনের কোনো লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না। যেকোনো গণতান্ত্রিক সংগঠনের একেবারে প্রাথমিক ধাপ থেকে উচ্চতর ধাপ পর্যন্ত সাংগঠনিক পদ্ধতি অনুসারে কমিটি গঠিত হলে সেই সংগঠনের ভিত্তি দৃঢ় হয়। যে উপজেলাগুলোতে ইউনিয়ন সম্মেলনের আয়োজন এখনও দৃশ্যমান নয় সেখানে যদি শেষ মুহূর্তে তাড়াহুড়ো করে যেনতেন প্রকারে একটি কমিটি অনুমোদন করে দেয়া হয় তাহলে নিশ্চিতভাবেই তৃণমূলের সাধারণ কর্মী সমর্থকরা হতাশ হবেন। এই অগণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় সংগঠনের বিকাশ যেমন বাধাগ্রস্ত হয় তেমনি নেতৃত্বের বিকাশের পথও রুদ্ধ হয়ে যায়। দুর্ভাগ্যজনকভাবে সত্য যে, আমাদের প্রধান রাজনৈতিক দলগুলো গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে কমিটি গঠনের রীতি থেকে অনেক আগেই সরে এসেছে। এখানে কমিটির পদ-পদবি পেতে কাউন্সিলরদের আস্থার চাইতেও মূল্যবান হয়ে উঠে ঊর্ধ্বতন ইউনিটগুলোর নেতা বিশেষের আনুকূল্য ও আশীর্বাদ। এই প্রক্রিয়ায় দল যে জনবিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে সেই বিবেচনা করা হয় না। আমরা আশা করব, প্রতিটি উপজেলা সম্মেলনের আগেই যাতে ইউনিয়ন কমিটিগুলো কাউন্সিলের মাধ্যমে নির্বাচিত হয়ে আসে। ইউনিয়ন পর্যায়ের কাউন্সিলরদেরই উপজেলার নেতৃত্ব বাছাইয়ের সুযোগ করে দিতে হবে।
আওয়ামী লীগের এবারের সম্মেলন সবিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। এই সম্মেলন এমন এক সময়ে অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে যখন দলের ভিতর থেকেই জোরালো শুদ্ধি অভিযান শুরু হয়েছে। ইতোমধ্যে সহযোগী সংগঠনের অনেক প্রভাবশালী নেতা-কর্মী দুর্নীতির অভিযোগে অভিযুক্ত হয়েছেন। কয়েকজন সংসদ সদস্যের ব্যাংক একাউন্ট জব্দ করে তাঁদের বিদেশ যাত্রার উপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়েছে। সম্মেলনের আগে এই শুদ্ধি অভিযানের বিশেষ বার্তাটি হলো, আওয়ামী লীগ এবার নেতৃত্বে এমন লোক আনতে চাইছে যাঁদের গ্রহণযোগ্যতা সর্বাপেক্ষা বেশি এবং যাঁরা সৎ, নির্লোভ ও দলের আদর্শের প্রতি অনুরক্ত। এই যখন আওয়ামী লীগের মূল অভীপ্সা তখন তৃণমূলেও এর প্রতিফলন থাকা বাঞ্ছনীয়। বিভিন্ন ইউনিটের মাধ্যমে যেসব কমিটি বেরিয়ে আসবে তাদের চেহারা দেখেই বুঝা যাবে দলের কেন্দ্রীয় অভিলাষ মাঠ পর্যায়ের নেতারা কতটা অনুধাবন করলেন। যদি এর ব্যত্যয় দেখা যায়, যদি বিতর্কিতদেরই পদ-পদবির অধিকারী হতে দেখা যায়; তাহলে সেটি যেমন আওয়ামী লীগের জন্য দুর্ভাগ্যজনক হবে তেমনি জাতীয় রাজনীতির জন্যও এটি হবে নৈরাশ্যজনক।
মাঠে প্রকৃত অর্থে এখন আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক কোনো প্রতিপক্ষ নেই। বিরোধী দল অকার্যকর অবস্থায় বিবৃতি নির্ভর দল হয়ে পড়েছে। এই শূন্যতার কারণে আওয়ামী লীগের ভিতর অন্তর্কোন্দল, কলহ, বিভেদ ও মতভেদ বিশাল আকার ধারণ করেছে। আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক প্রতিপক্ষও দলের ভিতর এমন অরাজকতায় খুশি। বিরোধী পক্ষ মনে করছে দল হিসাবে আওয়ামী লীগ যত খোলশের ভিতর ঢুকে পড়বে তাদের জন্য তত বেশি সুবিধা। আওয়ামী লীগকে এই বাস্তবতা উপলব্ধি করতে হবে।
দলটির প্রতিটি ইউনিটের সম্মেলন কার্যকর ও সফল হোক।