আগে ভাগেই ক্ষতির মুখে হাওরবাসী

এনামুল হক এনি, ধর্মপাশা
কৃষক আবদুল বারেক এবার দুশ্চিন্তায় পড়েছেন। মাঘ মাসের প্রথম সপ্তাহে এসেও তিনি তাঁর জমিতে একটি ধানের চারা রোপন করতে পারেননি। শালদিঘা হাওরে তাঁর দুই একর জমি রয়েছে। পুরো জমি এখনো কয়েক ফুট পানির নিচে। পানি না থাকলে এতোদিনে চারা রোপন শেষে পরিচর্যা শুরু হয়ে যেতো। তিনি জানেন না আদৌ এই পানি কমবে কি না? যদি কয়েক দিনের মধ্যে পানি না কমে তাহলে অনাবাদি থাকবে তাঁর জমি। ধর্মপাশা উপজেলার মধ্যনগর থানার চামরদানি ইউনিয়নের বিচরাকান্দা গ্রামের কৃষক আবদুল বারেকের মতো ইটাউড়ি গ্রামের বাসিন্দা গিরোজান হাওরের কৃষক নেপাল মালাকারেরও একই অবস্থা। ছোট গোড়াডুবা হাওরের কৃষক হিমাংশু, বোয়ালা হাওরের কৃষক সুস্তীরসহ উপজেলার বিভিন্ন হাওরের হাজার হাজার কৃষক এবার বিপাকে পড়েছেন। হাওরের পানি না কমায় ধানের চারা রোপন করতে পারছেন না তাঁরা। ধারণা করা হচ্ছে জলাবদ্ধতার কারণে এবার ২০/২৫ শতাংশ অনাবাদি থাকতে পারে এ উপজেলায়। ফলে কোনো বিপর্যয় ছাড়া আগে ভাগেই সমপরিমাণ ক্ষতির সম্মুখীন হতে হচ্ছে হাওরবাসীকে।
গেল বছর হাওরে ভয়াবহ ফসলহানির পর ফসল রক্ষা  বাঁধ নির্মাণ/মেরামতের জন্য পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো) কাজের বিনিময়ে টাকা (কাবিটা) নীতিমালায় পরিবর্তন এনেছে। নতুন নীতিমালায় গত ১৫ ডিসেম্বরের মধ্যে কাজ শুরু করার কথা বলা হয়েছিল। কিন্তু ধর্মপাশা উপজেলায় নির্ধারিত সময়ের ২৫ দিন পর বাঁধ নির্মাণ কাজ শুরু হয়। আগামী ২৮ ফ্রেব্রুয়ারির মধ্যে কাজ শেষ করার তাগিদ রয়েছে নীতিমালায়। তবে নির্ধারিত সময়ে কাজ শেষ হবে কি না তা নিয়ে হাওরপাড়ের কৃষকদের মধ্যে উৎকণ্ঠা রয়েছে। একদিকে বাঁধ নির্মাণ কাজে ধীরগতি অন্যদিকে হাওরে জলাবদ্ধতা হাওরবাসীকে দুশ্চিন্তায় ফেলেছে। উপজেলার শালকুমড়া, কাইঞ্জা, টগা, ধারাম, ধানকুনিয়াসহ বিভিন্ন হাওরে জলাবদ্ধতার কারণে রোপন কাজ পিছিয়ে যাচ্ছে।
দেওলা গ্রামের বাসিন্দা তরিকুল ইসলাম পলাশ বলেন, ‘কাইঞ্জার হাওরে অন্য বছর মাঘ মাসের মাঝামাঝি বা শেষ দিকে এসে ধানের চারা রোপন শেষ হতো। কিন্তু এই হাওরে এখনও পাঁচ ফুটের ওপর পানি রয়েছে। এবার চৈত্র মাসেও এই হাওরে কৃষক চারা রোপন করতে পারবে কি না সন্দেহ আছে।’
মধ্যনগর বাজারের বাসিন্দা মো. আলাউদ্দিন বলেন, ‘হাওরপাড়ের মানুষের উৎকণ্ঠা কাটছে না। দিনের পর দিন হাওর বিপর্যয়ের দিকে যাচ্ছে। এইবার যদি ফসলহানির ঘটনা ঘটে তাহলে হাওরবাসী আর ঘুরে দাঁড়াতে পারবে না। হাওরের পানি আর নদীর পানি অনেক জায়গায় সমান থাকার কারণে হাওরের পানি নামছে না। ফলে হাওরকে চাষাবাদের উপযুক্ত করে গড়ে তুলতে সংশ্লিষ্ট নদীগুলো খননের যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে।
মধ্যনগর ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান প্রবীর বিজয় তালুকদার বলেন, ‘হাওরের পানি যে হারে নামছে তাতে মনে হচ্ছে এবার ২০/২৫ শতাংশ জমি অনাবাদী থাকবে। ফলে আগে ভাগেই আমরা ২০/২৫ শতাংশ ক্ষতির সম্মুখীন হবো। হাওরের মানুষের জন্য এখন থেকেই বিকল্প কর্মসংস্থান তৈরির জন্য নীতি নির্ধারকদের ভাবতে হবে।’
উপজেলা কাবিটা বাস্তবায়ন ও মনিটরিং কমিটির সভাপতি ইউএনও মো. মামুন খন্দকার জানান, ‘সার্ভে কাজে বিলম্ব হওয়ার কারণে প্রাক্কলন তৈরিতে সময় লেগেছে। পানিও নামছে ধীর গতিতে। প্রাকৃতিক কারণে সৃষ্ট জলাবদ্ধতা নিরসন সম্ভব নয়। তবে মানবসৃষ্ট কারণে যদি কোনো হাওরে জলাবদ্ধতা থাকে তাহলে তা কঠোর হস্তে দমন করা হবে।’



আরো খবর