আঙুলের ছাপ নিয়ে দেয়া হয় টাকা

আকরাম উদ্দিন
সদর উপজেলার গৌরারং ইউনিয়নের বিভিন্ন গ্রামে ইলেকট্রনিক ডিভাইসে আঙুলের ছাপ সংগ্রহ করা হচ্ছে। বিনিময়ে ছাপ প্রদানকারীদের নগদ টাকা দেয়া হচ্ছে। কিন্তু কী কারণে আঙুলের ছাপ নিয়ে টাকা প্রদান করা হচ্ছে তা স্পষ্ট করে কেউ বলতে পারছেন না।
আঙুলের ছাপ নিয়ে টাকা দিচ্ছে কারা, কেনই বা টাকা দিচ্ছে? এ বিষয়ে জানতে চান এলাকাবাসী। গৌরারং ইউনিয়নের একাধিক গ্রামের বেশ কিছু মানুষ আঙুলের ছাপ দিয়ে টাকা পাওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।
এভাবে অর্থের লোভ দেখিয়ে শত শত মানুষের কাছ থেকে আঙুলের ছাপ সংগ্রহ করে অপরাধমূলক কাজে ব্যবহার করা হতে পারে বলে আশংকা করছেন স্থানীয় সচেতন লোকজন। এলাকাবাসীর দাবি এই বিষয়টি দ্রুত তদন্ত করে দেখা প্রয়োজন।
বৃহস্পতিবার দুপুরে এই প্রতিবেদকের কাছে বিভিন্ন গ্রামের একাধিক ব্যক্তি আঙুলের ছাপ দিয়ে টাকা পাওয়ার বিষয়টি স্বীকার করেছেন।
গৌরারং ইউনিয়নের ঢুলপশী গ্রামের মজর আলীর বাড়ি থেকে আঙুলের ছাপ রেখে জনপ্রতি ৫০ থেকে ১০০ টাকা করে দেওয়া হচ্ছে বলে জানা গেছে। মোবাইল ফোনের সিম রেজিস্ট্রেশনের ইলেট্রানিক ডিভাইসের মত একটি যন্ত্রে বৃদ্ধাঙ্গুলী ও তর্জনীর ছাপ নেয়া হয়। ছাপ গ্রহণকারী ব্যক্তিদের এরপর টাকা দেয়া হয়ে থাকে।
স্থানীয় কয়েকজন ব্যক্তি জানান, মাস দেড়েক ধরে এভাবে আশপাশের গ্রামের লোকজনের কাছ থেকে আঙুলের ছাপ রেখে টাকা দিচ্ছেন মজর আলী। কিন্তু মজর আলী অভিযোগ সম্পূর্ণ অস্বীকার করেছেন। মজর আলী ঢুলপশি গ্রামের বাসিন্দা। তিনি সরকারি দলের রাজনীতির সাথে জড়িত বলে জানিয়েছেন। এলাকার লোকজনের সাথে আলাপ করে জানা যায়, মজর আলী নিজের গ্রাম ঢুলপশির কারও আঙুলের ছাপ নেন না। পার্শ্ববর্তী গ্রামগুলোর লোকজনকে নিয়ে এসে তাদের আঙুলের ছাপ সংগ্রহ করেন। নিজের অপকর্ম গোপন করতেই তার এরকম কৌশল বলে ধারণা করা হয়।
এলাকার নিধিরচর গ্রামে গিয়ে কথা হয় কয়েকজনের সঙ্গে। তারা জানান, ‘গ্রামের বাসিন্দা কুহিনুর বেগমের মাধ্যমে কয়েকদিন আগে তারা মজর আলীর বাড়িতে যান। মজর আলী, তার স্ত্রী ও ছেলে আমাদের আঙুলের ছাপ মেশিনে গ্রহণ করেন।’ প্রতিদিন সকালে এবং বিকালে ২ বেলা আঙ্গুলের ছাপ সংগ্রহ করা হয় বলে জানিয়েছেন তারা। এ কাজে মজর আলী প্রায় ৩ মাস ধরে যুক্ত রয়েছেন বলে নিধিরচর গ্রামের একাধিক ব্যক্তি জানান।
আলাপকালে নিধিরচর গ্রামের মনোয়ারা বেগম জানান, কয়েকদিন আগে ঢুলপশী গ্রামের মজর আলীর বাড়িতে গিয়ে প্রথম দিন সকালে আমি আঙুলের ছাপ দিয়ে ১শত টাকা পেয়েছি। মনোয়ারা বেগম আরও জানান, তার পরিবারের শ্বাশুড়ি ও স্বামী এভাবে টাকা পেয়েছেন।
ভাটি শাফেলা গ্রামের আব্দুল হানিফের ছেলে আপিল মিয়া জানান, আমার স্ত্রী বিলকিস বেগমও হাতের আঙুলের ছাপ নিয়ে মজর আলীর কাছ থেকে টাকা এনেছেন। বিষয়টি সর্ম্পকে এলাকার লোকজনকে অবগত করায় শুক্রবার দুপুরে তাকে মারধর করেছেন মজর আলী।
নিধিরচর গ্রামের কুহিনুর বেগম জানান, আমি ঢুলপশী মজর আলীর বাড়িতে বিষয়টি বুঝতে গিয়েছিলাম। কিন্তু টাকা আনি নি।
একই গ্রামের বাসিন্দা মনোয়ারা বেগম বলেন, ‘ কুহিনুর নিজে ও তার শ্বাশুড়ি হাতের আঙুলের ছাপ দিয়ে মজর আলীর কাছ থেকে টাকা এনেছেন।’
নিধিরচর গ্রামের ললিতা বেগম বলেন, ‘আমি মজর আলীর বাড়ি থেকে দুইবার টাকা এনেছি হাতের আঙুলের ছাপ ও ভোটার আইডি কার্ডের ফটোকপি দিয়ে।’
নিধিরচর গ্রামের কুহিনুরের স্বামী কুতুব উদ্দিন বলেন,‘একমাস আগে সকালে ১শত টাকা পরে আবার বিকালে ১শত টাকা আমাকে দিয়েছে ঢুলপশীর মজর আলী। এ সময় আমি হাতের আঙুলের ছাপ ও আইডি কার্ডের ফটোকপি দেই।’
নিধিরচর গ্রামের আলী জফুর বলেন,‘আমি এসব কান্ডের কথা শুনেছি। ঢুলপশীর মজর আলী মানুষের হাতের আঙ্গুলের ছাপ টাকা দিয়ে কিনে নিয়ে কি করে এটা জানা আমাদের উচিৎ।’
সাফেলা গ্রামের আজির উদ্দিনের স্ত্রী সালাতুন নেছা (৩৫) শুক্রবার বিকালে বলেন,‘আমি গত তিন দিন আগে একাধারে ৭ দিন যাবত ঢুলপশী গ্রামের আজির উদ্দিনের বাড়ি গিয়ে তার কাছে আঙুলের ছাপ দিয়ে টাকা এনেছি। প্রতিদিন ১০০ টাকা করে দিয়েছে আমাকে। ’
ভাটি সাফেলা গ্রামের বাসিন্দা আনোয়ার হোসেন বলেন,‘এলাকার মানুষের আঙুলের ছাপ নিচ্ছেন ঢুলপশী গ্রামের মজর আলী। ছাপ নেওয়ার বিনিময়ে টাকাও দিচ্ছেন। উমেদশ্রী, ধামপাড়া, রাঙামাটি নিধিরচর গ্রামের অনেক মানুষ তার কাছে আঙুলের ছাপ দিয়ে টাকা এনেছেন। কেন এই ছাপ নিচ্ছে তা কেউ জানে না, আমিও জানি না।’
গৌরারং ইউনিয়নের ৮ নং ওয়ার্ডের ইউপি সদস্য জমির হোসেন বলেন, ‘আঙুলের ছাপ নেওয়ার বিষয়ে আমি জেনেছি। এটা ৭ নম্বর ওয়ার্ডে পড়েছে। আমার ওয়ার্ডের অনেকেই আঙুলের ছাপ দিয়ে টাকা এনেছেন। অনেকেই জানিয়েছেন ঢুলপশীর মজর আলী হাতের আঙ্গুলের ছাপ রেখে ৫০ টাকা করে দিয়েছেন।’
৭ নং ওয়ার্ডের ইউপি সদস্য রবিউল আওয়াল ফকির বলেন,‘আঙুলের ছাপ নিয়ে টাকা দেওয়ার বিষয়টি আমাকে অনেকে ইসলামগঞ্জ বাজারে বলেছেন। পরে নোয়াগাঁওয়ের একজন মহিলাকেও জিজ্ঞেস করেছি। তিনিও বলেছে আঙুলের ছাপ দিয়ে ৫০ টাকা এনেছে ঢুলপশীর মজর আলীর বাড়ি থেকে। পরে আমি মজর আলীকে জিজ্ঞেস করেছিলাম। তিনি বলেছেন একটি কোম্পানী এসে ছাপ নেয় এবং টাকা দেয় মানুষকে।’
বৃহস্পতিবার দুপুরে গৌরারং ইউনিয়নের ঢুলপশী গ্রামের বাসিন্দা অভিযুক্ত মজর আলীর সাথে আলাপ করলে তিনি দাবি করেন, আঙ্গুলের ছাপ নেয়া, ছাপের বিনিময়ে টাকা দেওয়ার বিষয়ে তিনি কিছুই জানেন না। গ্রামের পয়েন্টে শহর থেকে সিম বিক্রেতারা আসে। তারা সিম ফ্রি দেন ও আঙ্গুলের ছাপও নেন। তার পরিবারের কেউ এসব বিষয়ে জড়িত নয়।
সুনামগঞ্জ সদর মডেল থানার অফিসার ইনচার্জ মো. শহীদুল্লাহ বলেন, ‘ আঙুলের ছাপ নিয়ে টাকা দেয়ার বিষয়টি তদন্ত করে দেখা হবে। ঘটনার সত্যতা পেলে জড়িতদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হবে।’