আজীবন সংগ্রামী এক বীর মুক্তিযোদ্ধার প্রস্থান

মোহাম্মদ ইসমাইল হোসেন
চলে গেলেন আজীবন সংগ্রামী দেশপ্রেমিক বীর মুক্তিযোদ্ধা হাজী মো. নজরুল ইসলাম (৭৩)। ২৭ অক্টোবর ২০২২ খ্রিস্টাব্দ বৃহস্পতিবার বেলা ৯:৪০ ঘটিকায় নিজ বাড়িতে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন তিনি (ইন্নালিল্লাহি ওয়াইন্নাইলাইহি রাজিউন)। তাঁর জন্ম সুনামগঞ্জ মহুকুমার জিনারপুর গ্রামে এক সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবারে ১৫ জুন ১৯৪৯ সালে। পিতা মরহুম সুনামিয়া মোড়ল ও মাতা মরহুমা নূরবানু খাতুন। ১৯৭১ সালে দেশ মাতৃকার টানে পাকিস্তানি হানাদারদের বিরুদ্ধে জীবন বাজী রেখে মুক্তি সংগ্রামে ঝাঁপিয়ে পড়েন দুই ভাই মোঃ নজরুল ইসলাম ও আব্দুল মন্নান কমান্ডার। বীর মুক্তিযোদ্ধা নজরুল ইসলাম তখন ২২ বছরের টগবগে যুবক। একাত্তরের রণাঙ্গণে জাহাঙ্গীরনগরে এক সন্মুখ সমরে পাকিস্তানী মিলিটারির বুলেট বিদ্ধ হন মুক্তিযোদ্ধা নজরুল ইসলাম। সেদিন শত্রুর একটি বুলেট আঘাত করে নজরুল ইসলামের ডান পায়ে। দেশপ্রেমে উদ্ভুদ্ধ যুবক ঘাবড়ে না গিয়ে নিজেকে সামলে নিয়ে বন্ধুর সহযোগিতায় ক্যাম্পে চিকিৎসা নিয়ে আবার ফিরে আসেন যুদ্ধে। নজরুল ইসলাম কেবল একাত্তরেই যুদ্ধ করেছেন এমন নয়। বরং তিনি ছিলেন আজীবন সংগ্রামী, মানবপ্রেমী আর দেশপ্রেমিক। চিরকাল বঞ্চিত উত্তর সুরমার এক নিভৃত জনপদ জিনারপুর গ্রাম। বৈরী প্রকৃতির সাথে আজন্ম সংগ্রামের জনপদ। প্রতি বছর পাহাড়ি ঢলে ভেসে যেতো কৃষকের ফসল, জমি, বসতবাড়ি- সর্বশান্ত করে যেতো। এ অঞ্চলের দুঃখ ছিলো জিনারপুরের ঢালা। যা খুব পীড়া দেয় এই মানবপ্রেমীকে। একাডেমিক উচ্চ ডিগ্রি না থাকলেও নজরুল চাচার বুকে ছিলো নেতৃত্বদানের আর অসংকোচ প্রকাশের দূরন্ত সৎ সাহস। পাহাড়ি ঢল তথা চলতি নদীর করাল গ্রাস থেকে জিনারপুর ও এর আশপাশের গ্রাম সহ খরচার হাওর বাঁচানোর জন্য তিনি স্বভাব সুলভ নেতৃত্ব গুণে কখনো গ্রামের মানুষকে সাথে নিয়ে স্বেচ্চাশ্রমে, কখনো মন্ত্রী আমলাদের সাথে দেন-দরবার করে বাঁধের ব্যবস্থা করেছিলেন। মন্ত্রী মরহুম মেজর (অব.) ইকবাল হোসেন চৌধুরীর সাথে সুসম্পর্ক ছিলো উনার। তাঁর হস্তক্ষেপে জিনারপুরের বাঁধ ও বোলডারের ব্যবস্থা করেন। যা অত্রাঞ্চলের মানুষকে নতুন করে বাঁচার স্বপ্ন দেখায়। পরবর্তীতে বাঁধটি আবার ঝুঁকিপূর্ণ হলে পররাষ্ট্রমন্ত্রী জননেতা মরহুম আব্দুস সামাদ আজাদ এর সাহায্য নিয়ে বাঁধে ব্লক স্থাপনের মাধ্যমে গ্রামটি নিরাপদ করতে বহুবার মন্ত্রণালয় সচিবালয়ে দৌঁড়ঝাঁপ করেন তিনি। এসব কাজে তিনি যুক্ত করেন গ্রামের আরেক প্রতিশ্রুতিশীল তরুণ এখলাছুর রহমানকে। আজ জানাজায় জনতার ঢল নেমে ছিলো। জানাজার পূর্বক্ষণে আবেগঘন কথা বলছিলেন তার ছেলেবেলার বন্ধু হাজী ইব্রাহিম খলিল, মহরম আলী, এখলাছুর রহমান, চেয়ারম্যান নূরে আলম সিদ্দিকী তপন প্রমুখ। উপস্থিত হাজারো জনতা তার বিভিন্ন মহৎ কর্মের কথাই বারবার স্মরণ করছিলেন, নিরবে চোখের পানি ফেলছিলেন। জনাব নজরুল ইসলাম ব্যক্তি জীবনে অত্যন্ত ধার্মিক, সদালাপী, পরোপকারী, দানবীর, বিদ্যুৎসাহী, স্বজ্জন ব্যক্তিত্বের অধিকারী ছিলেন। নিজ ভূমিতে ‘আল-হক দারুল জান্নাত হাফিজিয়া নূরানীয়া মাদ্রাসা, জিনারপুর’ নামে একটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলেছেন। যা পরিচালবার ব্যয় তিনি নিজেই বহন করেন। গ্রামবাসিদের সাথে নিয়ে আর সরকারি পৃষ্ঠপোষকতায় নির্মাণ করেছেন সুদর্শন সুপ্রশস্ত মসজিদ। সৎ শিক্ষিত জনদের তিনি খুব ভালবাসতেন। গ্রামের কোন ছেলে মেয়ে শহরে পড়তে যেয়ে আবাসন সহ যে কোনো সমস্যায় পড়লে পরিচিত জনদের ধরে যথাসাধ্য চেষ্টা করতেন সমাধানের। পড়াশোনায় উৎসাহ দিতেন। যুদ্ধাহত বীর মুক্তিযোদ্ধা হিসাবে যে ভাতা ও রেশন পেতেন তাও অনেক সময় তার প্রিয়জনদের বিলিয়ে দিতেন। দেশ ও জাতির এতো অবদানের পরও আমরা তাঁকে এ নিয়ে অহংকার করতে দেখিনি কোনোদিন, বরং বিনয় দেখেছি। উত্তম আখলাকের সবটুকুই যেন ছিলো তাঁর চরিত্রে। রাজনীতি করতেন। উপজেলা পরিষদ ও ইউনিয়ন পরিষদে একাধিকবার নির্বাচনও করেছেন। তবে কোন মোসাহেবি করেননি। যে কারণে কখনো কখনো নিগৃহিত হতে হয়েছে। মানিয়ে নিতে চেষ্টা করেছেন। কেননা আতœমর্যাদার চেয়ে দেশ ও মানুষের জন্য ভালোবাসা আর এর জন্য কাজ করার আকাঙ্খা ছিলো তীব্রতর। দুর্ভাগ্য নাকি ঈমানি পরীক্ষা জানিনা, দুই বছর আগে একটা সড়ক দুর্ঘটনায় মারাত্মক ভাবে আহত হয়ে ঘর বন্দী হতে বাধ্য হন। নজরুল চাচারা ক্ষণজন্মা। একজন সফল পিতা। তার দুই মেয়ে ও ৬ ছেলে। সবাই স্ব স্ব ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠিত। পিতার মতো তাদের মধ্যেও সমাজসেবা, দেশপ্রেম আর মানবসেবার দুর্বার আকাঙ্খা লক্ষণীয়। নজরুল চাচাদের মতো সদালাপী, সমাজসেবী, বন্ধুবৎসল, ভালবাসার লোক চলে গেলে পরিবারে ও সমাজে যে শূন্যতা সৃষ্টি হয় তা অপূরণীয়। তাঁর পরিবার পরিজনদের সাথে আমরাও গভীর ভাবে সমব্যাথী, শোকাহত। পরমকরুণাময় আল্লাহর নিকট প্রার্থনা তিনি যেন তাঁর প্রিয় বান্দাকে জান্নাতুল ফেরদৌসের সুউচ্চ মা কা ম দান করেন। পরিবার পরিজনদের শোক কাটিয়ে উঠার ও ধৈর্য ধারণ করার তৌফিক দান করেন। আমিন।
লেখক : সিনিয়র শিক্ষক (ইংরেজি), সরকারি জুবিলী উচ্চ বিদ্যালয়, সুনামগঞ্জ।