আজ তাহিরপুরে জেলে কৃষক সম্মেলন

বিশেষ প্রতিনিধি
হাওরবাসীর সমস্যার শেষ নেই। বিশেষ করে হাওরের বড় জেলা সুনামগঞ্জের জেলে কৃষকরা নানা সমস্যায় জর্জরিত। জেলার ছোট-বড় নদীগুলো ভরাট হয়ে যাওয়া, ১১ উপজেলার ১৩৯ টি ক্লোজার প্রতি ফসল মৌসুমে অকাল বন্যায় ভেঙে ফসল তলিয়ে যাওয়ার শঙ্কা, যোগাযোগের অব্যবস্থা, ইজারাদার কর্তৃক জলমহালের সীমানার বাইরেও মাছ ধরতে বাধা দেওয়ায় জীবন-জীবিকার সংকটে রয়েছে জেলার প্রায় ৪ লাখ জেলে কৃষক পরিবার। এমন সংকট থেকে উত্তরণের জন্য সম্মিলিত উদ্যোগ প্রত্যাশা করে আজ বুধবার তাহিরপুরের টাঙ্গুয়ার হাওরপাড়ের মোয়াজ্জেমপুর উচ্চ বিদ্যালয় মাঠে প্রশাসনের সহযোগিতায় জেলে কৃষক সম্মেলন করবে পরিবেশ ও হাওর উন্নয়ন সংস্থা। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ভিডিও বার্তায় সম্মেলনের উদ্বোধন করবেন। সম্মেলনে প্রধান অতিথি থাকবেন অর্থ ও পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী এমএ মান্নান এমপি।
হাওরের জেলে কৃষকসহ একাধিক বাসিন্দার সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, জেলার ৩ লাখ ২৫ হাজার ৯৯০ টি কৃষক পরিবার এবং ৮৭ হাজার নিবন্ধিত জেলের জীবন নানা সমস্যায় সংকটাপন্ন। জেলার ছোট-বড় ১৫৪ টি হাওর কেন্দ্রীক এসব মানুষের জীবিকা। কিন্তু হাওর এবং হাওরের পানি প্রবাহের মাধ্যমে নদী, হাওর নদীর সংযোগ খাল ও হাওরের তলদেশ ভরাট হওয়ায় এক ফসলী বোরো ধান আবাদে যেমন সমস্যায় পড়েছেন কৃষকরা, তেমনি জলমহালে মাছও কমে যাচ্ছে। এছাড়াও রয়েছে ইজারাদারের যন্ত্রণা। বর্ষা মৌসুমে নির্ধারিত সীমানা পার হয়ে জেলে কৃষকদের বাড়ি পর্যন্ত গিয়ে শাসন করছে ইজারাদাররা।
জেলা প্রশাসকের রাজস্ব শাখার দায়িত্বশীলরা জানিয়েছেন, জেলায় ২০ একরের উপরের ৪২০ টি জলমহাল। ২০ একরের নীচের ৫২৫ টি জলমহাল রয়েছে।
কৃষক সংগ্রাম সমিতির কেন্দ্রীয় আইন বিষয়ক সম্পাদক খায়রুল বাশার ঠাকুর খান বলেছেন,‘হাওরের জলমহাল ইজারাদাররা যে পরিমাণ জায়গা ইজারা নেয় তার চেয়ে শত শত একর বাইরে গিয়ে জেলে কৃষকদের বাড়ি পর্যন্ত মাছ ধরতে বাধা দেয়। এই অত্যাচার বন্ধ না হলে হাওরে মাছের উৎপাদন বাড়ালেও জেলে কৃষকদের কোন লাভ হবে না। অন্যদিকে হাওরপাড়ের কৃষকদের কেবল প্রণোদনা দিলে হবে না। ফসল উৎপাদন নিশ্চিত করার জন্য ভরাট হওয়া নদী-খাল খনন করতে হবে এবং সঠিক সময়ে হাওরের ক্লোজার এবং বাঁধ নির্মাণ করতে হবে।’
বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি (সিপিবি’র)’র জেলা সভাপতি চিত্ত রঞ্জন তালুকদার বললেন,‘ফসল উৎপাদন করে ফসলের ন্যায্যমূল্য না পেলে কৃষকরা উৎপাদন ছেড়ে দেবে। গেল বছর হাওরে তুলনামূলক ফসল ভাল হয়েছে। কিন্তু ধানের দাম কমে যাওয়ায় ধান বিক্রি করতে পারছে না কৃষক। ধানের উৎপাদন খরচ এখন ৮০০ থেকে ১০০০ টাকা, অথচ বাজারে ধানের মূল্য মণপ্রতি ৭০০ টাকাও পাচ্ছে না তারা। ধান বিক্রি করতে না পারায় মহাজনের ভয়ে বাজারে যাওয়া আসা বন্ধ করে দিয়েছেন কৃষকরা। এ কারণে হাট-বাজারে বেচা কেনাও কমে গেছে। সুনামগঞ্জে প্রায় ৯ লাখ মেট্রিক টন ধান উৎপাদিত হয়েছে। সরকার ধান ক্রয় করেছে মাত্র ৭ হাজার মে.টন এবং চাল ১৮ হাজার মে.টন। সরকার ধান কম কেনায় সুযোগ বুঝে ধানের দাম কমিয়ে দিয়েছে আড়ৎদাররা। হাওরাঞ্চলের ২৫ টি গ্রাম ঘুরে দেখেছি ৩৫ পরিবারের গ্রামের কৃষকগণ ৪৫ লাখ টাকা মহাজনি ঋণ নিয়েছেন। এভাবে কোন কোন গ্রামের কৃষকরা দেড় থেকে ৩ কোটি টাকা মহাজনের ঋণে বন্দী। এই অবস্থা থেকে কৃষকদের রক্ষা করতে হলে উৎপাদিত পণ্যের সঠিক মূল্য দিতে হবে।’
বেসরকারি সংগঠন পরিবেশ ও হাওর উন্নয়ন সংস্থার সভাপতি কাশ্মির রেজা বললেন,‘টাঙ্গুয়ার হাওর পাড়ের আজকের (বৃহস্পতিবার) সম্মেলন থেকে হাওরবাসীর জীবন মান উন্নয়নের জন্য প্রয়োজনীয় দাবি জানানো হবে, আশা করি মাননীয় প্রধানমন্ত্রী এসব বাস্তবায়ন করবেন। আমাদের দাবির মধ্যে রয়েছে জলমহালের সীমানা নির্ধারণ করে উন্মুক্ত জলাশয়ে মৎস্যজীবীদের মাছ ধরতে দেওয়া, কৃষকদের বিনামূল্যে সার, বীজ ও কীটনাশক প্রদান, হাওরে মাছের উৎপাদন বৃদ্ধির জন্য পদ্মার পাড়ের জেলেদের মতো ৩ মাসের প্রণোদনা প্রদান করে মাছ ধরা বন্ধ রাখা।’
জেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক জাকারিয়া মোস্তফা হাওরে এবার ধান- চাল কম কেনা প্রসঙ্গে বললেন,‘সারাদেশেই এবার ধান- চাল কম কেনা হয়েছে। যে কটা জেলায় তুলনামুলক বেশি কেনা হয়েছে। এর মধ্যে সুনামগঞ্জ জেলা একটি।’
সুনামগঞ্জ পাউবো’র নির্বাহী প্রকৌশলী আবু বকর সিদ্দিক বললেন,‘সুনামগঞ্জের হাওরের ১৩৯ টি ক্লোজার বা ভাঙনসহ সুনামগঞ্জ, নেত্রকোণা, হবিগঞ্জ এবং কিশোরগঞ্জের হাওরাঞ্চলের ১৭৬ টি ক্লোজার বা ভাঙনে ক্লোজওয়ে এবং এর সঙ্গে ডুবন্ত বাঁধের স্লোপ প্রটেকশন করার জন্য ৯১৪ কোটি টাকার প্রকল্প প্রস্তাবনা পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে। এগুলো যাচাই-বাছাই হচ্ছে। হাওরাঞ্চলের ৪৩ ছোট বড় নদী খননেরও পরিকল্পনা করা হয়েছে। বিআইডব্লিউটিএ যে নদীগুলো খনন করবে, সেগুলো বাদ দিয়ে অন্যগুলো পাউবো খনন করবে।’
জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ আব্দুল আহাদ জানালেন, জলমহাল ইজারা দেবার সময় শর্ত দেওয়া হয়, নির্ধারিত সীমানার মধ্যে ইজারাদার শাসন করবেন। শুকনো মৌসুমে সীমানা নিয়ে কোন সমস্যা হয় না। কিন্তু বর্ষা মৌসুমে পুরো হাওরাঞ্চল যখন প্লাবিত হয়, অনেক সময় সেটি মান্য হয় না, ভবিষ্যতে আইন মান্য করে যাতে ইজারাদাররা মাছ ধরেন আমরা সেই চেষ্টা করবো।’
অর্থ ও পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী এমএ মান্নান এমপি বললেন,‘প্রচলিত ধারনায় উন্নয়নের নামে বা দেশীয় প্রজাতির মাছ বাড়ানোর জন্য যে নিয়মে জলমহাল ইজারা দেওয়া হচ্ছে তা অর্থনেতিকভাবে সঠিক হচ্ছে বলে মনে করি না আমি। খামারীদের সঙ্গে প্রতিযোগিতার বাজারে একসময় টিকবে না দেশী মাছ। খামারীদের মাছের গ্রাহক এখন অনেক বেড়েছে।’ তিনি হাওরাঞ্চলে ধানের উৎপাদন নিশ্চিত করার জন্য নদী খনন জরুরি উল্লেখ করে বলেন,‘হাওরের ফসল রক্ষার জন্য দীর্ঘ স্থায়ী বাঁধ প্রাকৃতিক কারণে দেওয়া সম্ভব নয়। প্রকৃতির সঙ্গে আপোস করে সাময়িক বাঁধ নির্মাণ করতে হবে। এসব বাঁধ নির্মাণে বিগত বছরের ন্যায় সুবিধা ভোগীদের দিয়ে প্রকল্প কমিটি করে দেবার পক্ষে আমি। এই পদ্ধতি মন্দের ভাল।