আজ পৌষ সংক্রান্তি

স্টাফ রিপোর্টার
প্রাচীন কাল থেকেই দেবতার পূজায় পিঠের অর্ঘ্য প্রদানের রীতি রয়েছে। মধ্যযুগে ধর্মপূজায় পিঠে নৈবেদ্যও দেওয়া হত। তবে দেবতার পূজায় নিবেদনের জন্য বছরের বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন প্রকার পিঠে প্রস্তুত করার বিধান রয়েছে। তবে গ্রীষ্মকালে পিঠেপুলি রুচিকর নয় বলে শীতকালেই এই জাতীয় অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। বছরের বিভিন্ন সময়ে অনুষ্ঠিত পিঠেপর্বের মধ্যে পৌষ সংক্রান্তির পৌষপার্বণই সর্বাপেক্ষা প্রসিদ্ধ। এই দিনটি পঞ্জিকায় ‘মকর সংক্রান্তি’ বা ‘উত্তরায়ণ সংক্রান্তি’ নামেও পরিচিত। এই দিনটিতে পিতৃপুরুষ অথবা বাস্তুদেবতার উদ্দেশ্যে তিল কিংবা খেজুড় গুড় দিয়ে তৈরি তিলুয়া এবং নতুন ধান থেকে উৎপন্ন চাল থেকে তৈরি পিঠের অর্ঘ্য প্রদান করা হয়। এই কারণে পৌষ সংক্রান্তির অপর নাম তিলুয়া সংক্রান্তি বা পিঠে সংক্রান্তি।

মকর সংক্রান্তির দিন দূর যাত্রা করা শুভ নয় বলে মনে করা হয়। কথিত আছে প্রাচীনকালে এক মুনি নিজের বাড়ি থেকে ওই দিন যাত্রা শুরু করেন এবং তিনি আর কোনও দিন ফিরে আসেননি। তারপর থেকেই এই যাত্রা না করার প্রচলন। এই দিনটিতে কাউকে খালি হাতে ফেরানো হয় না। মকর সংক্রান্তি আনন্দ ও উৎসবের সঙ্গে পালন করা হয়। তাই ওই দিন কোনো গরীব, দুঃখী বা ভিক্ষার্থী এলে তাঁকে খালি হাতে ফেরাতে নেই। বিশেষ করে তাঁকে না খাইয়ে ফেরানো উচিত নয়। কীর্তন, পালা গানেরও আয়োজন করা হয়ে থাকে এই দিনে।

পৌষ সংক্রান্তি দিন থেকে সূর্যদেব উত্তর মেরুতে ক্রমাগত সরতে থাকে। যার ফলে দিনের সময় বাড়তে থাকে আর রাতের পরিমান কমতে থাকে। পৌষ সংক্রান্তি অতি পবিত্র দিন হিসাবে মান্য হয়। পুরাণ অনুযায়ী এই দিনই দেবতাদের সঙ্গে অসুরদের যুদ্ধ শেষ হয়েছিল। শ্রী বিষ্ণুদেব অসুরদের বধ করে তাঁদের কাটা মুন্ডু মন্দিরা পর্বতে পুঁতে দিয়েছিলেন। তাই মকরসংক্রান্তির দিনই সমস্ত অশুভ শক্তির বিনাস হয়ে শুভ শক্তি প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল বলে আজও মানা হয়ে থাকে।
অন্যদিকে, মহাভারতের কুরুক্ষেত্র যুদ্ধের বিশ্ববিখ্যাত বীর, মহাপ্রাজ্ঞ, সর্বত্যাগী ও জিতেন্দ্রিয় মহাপুরুষ ভীষ্মের মহাপ্রয়াণের স্মৃতির জন্য উত্তরায়ণ সংক্রান্তি আরও মর্যাদাপূর্ণ হয়েছে। কুরুক্ষেত্র যুদ্ধে কৌরবপক্ষের চারজন সেনাপতির মধ্যে তিনিই প্রথম সেনাপতি। উভয় পক্ষের আঠারদিন যুদ্ধের দশম দিবসে সূর্যাস্তের কিছুক্ষণ পূর্বে পা-ব পক্ষের সেনাপতি অর্জুনের শরাঘাতে ক্ষতবিক্ষত হয়ে ভীষ্মদেব রথ থেকে মাটিতে পড়ে যান। কিন্তু তিনি মাটি স্পর্শ না করে আটান্ন দিন তীক্ষ শরশয্যায় শুয়ে উত্তরায়ণের অপেক্ষা করে পৌষ সংক্রান্তির দিনে যোগবলে দেহত্যাগ করেছেন। শাস্ত্রমতে ভীষ্মদেব মৃত্যুর পরে ভগবদ্ ধামে যাননি। তিনি ছিলেন ‘দৌ’ মতান্তরে দ্যু নামক অষ্টবসু, যিনি মহর্ষি বশিষ্ঠের অভিশাপগ্রস্ত হয়ে ইহলোকে মনুষ্য হিসাবে কৃতকর্ম ভোগের জন্য জন্ম নিয়েছিলেন। তাই তাঁর পুনরায় দেবলোকেই যাবার কথা। কারণ তিনি সেখানকার স্থায়ী বাসিন্দা। দক্ষিণায়নের সময় দেবলোকে রাত্রি, সেই সময় সেখানকার সবকিছু বন্ধ থাকে। ভীষ্ম যদি দক্ষিণায়নে দেহত্যাগ করতেন, তবে তাঁকে তাঁর লোকে প্রবেশ করার জন্য বাইরে প্রতীক্ষা করতে হত। তিনি ইচ্ছামৃত্যু বরণ করেছিলেন বলে ভেবে দেখলেন, দক্ষিণায়নে মহাপ্রয়াণ করলে দেবলোকে গিয়ে বাইরে প্রতীক্ষা করার চেয়ে এখানে থেকে উত্তরায়ণের প্রতীক্ষা করাই ভালো। কারণ এখানে ভগবান শ্রীকৃষ্ণের দর্শন লাভ হবে এবং সৎসঙ্গ হতে থাকবে। এই ভেবে তিনি দক্ষিণায়নে শরীর ত্যাগ না করে উত্তরায়ণে শরীর ত্যাগ করেছিলেন। ভীষ্মদেবের এই মহাপ্রয়াণের স্মৃতির জন্য সনাতণ ধর্মাবলম্বীদের নিকট উত্তরায়ণ সংক্রান্তি বেশী গুরুত্ব পেয়েছে।
কথিত আছে, মহারাজ সাগর তার আশ্বমেদের ঘোড়ার জন্য কপিল মুনির আশ্রমে গিয়ে তার সঙ্গে বিবাদে জড়িয়ে পরে। কপিল মনির অভিসাপে রাজার ৬০ হাজার পুত্র ভষ্ম হয়ে যান। রাজা কান্যায় ভেঙ্গে পরে তখন কপিল মুনি তাকে জানায় তার কোন বংশধর যদি গঙ্গাকে নিয়ে আসে তা হলে তাদের সাপ মুক্তি হয়ে যাবে। পরে ভগীরত গঙ্গা নিয়ে এসেছিলেন এই যায়গায়। তারপর থেকেই এই দিনটি বিশেষ মাহাত্ম্য পেয়ে আসছে গঙ্গা সাগরে। সারা ভারত থেকে ভক্তপ্রান মানুষরা পুন্য স্নান করেন।

সংক্রান্তি অর্থ সঞ্চার বা গমন। সূর্যের এক রাশি থেকে অন্য রাশিতে সঞ্চার বা গমন করাকেও সংক্রান্তি বলা হয়। সংক্রান্তি শব্দটি বিশ্লেষণ করলেও একই অর্থ পাওয়া যায়; সং+ক্রান্তি, সং অর্থ সঙ সাজা এবং ক্রান্তি অর্থ সংক্রমণ। অর্থাৎ ভিন্ন রূপে সেজে অন্যত্র সংক্রমিত হওয়া বা নুতন সাজে, নুতন রূপে অন্যত্র সঞ্চার হওয়া বা গমন করা
জড় বিজ্ঞান অনুযায়ী, সূর্যের গতি দুই প্রকার, উত্তরায়ণ এবং দক্ষিণায়ণ। ২১ ডিসেম্বর সূর্য উত্তরায়ন থেকে দক্ষিণায়নে প্রবেশ করে। এ দিন রাত সব থেকে বড় হয় আর দিন সবথেকে ছোট হয়। এর পর থেকে দিন বড় আর রাত ছোট হতে শুরু করে। মাঘ থেকে আষাঢ় পর্যন্ত ছয় মাস উত্তরায়ণ। আবার শ্রাবণ থেকে পৌষ মাস পর্যন্ত ছয় মাস দক্ষিণায়ণ। পৌষ মাসের সংক্রান্তিকেই বলা হয় উত্তর সংক্রান্তি বা মকর সংক্রান্তি। শাস্ত্র মতে উত্তরায়ণে মৃত্যু হলে মুক্তি প্রাপ্তি হয় এবং দক্ষিণায়ণে মৃত্যু হলে ঘটে পুনরাবৃত্তি অর্থাৎ তাঁকে আবার সংসারে ফিরে আসতে হয়। সূর্য এ দিনই ধনু রাশি থেকে মকর রাশিতে প্রবেশ করে। এর থেকেই মকর সংক্রান্তির উৎপত্তি।