আজ বোশেখের প্রথম দিন, আসুন একটু ভিন্নভাবে চিন্তা করি

গ্রামীণ বাঙালির প্রাত্যহিক জীবনের সাথে মিশে থাকা বাংলা বর্ষপঞ্জির নতুন বছর শুরু হয়েছে আজ থেকে। ১৪২৫ বাংলা সনটি বিদায় নিয়ে নতুন সূর্যের সাথে ১৪২৬ সনের অভ্যুদয় ঘটেছে আজ প্রাতে। বাংলা বর্ষপঞ্জি সংস্কারজনিত কারণে আমাদের দেশে ভিন্ন ভিন্ন দুইটি তারিখে বাংলা নববর্ষ পালিত হয়ে থাকে। ড. মোহাম্মদ শহীদুল্লাহ প্রবর্তিত বাংলা সন গণনা পদ্ধতি গ্রহণের মাধ্যমে সাবেক প্রেসিডেন্ট হোসেইন মোহাম্মদ এরশাদ একটি ভাল কাজ করেছিলেন, এর মধ্য দিয়ে বাংলা সন গণনার ক্ষেত্রে একটি সরলিকৃত সাধারণ সূত্রের প্রয়োগ ঘটানো হয়েছিল। কিন্তু আমাদের বিশেষ করে হিন্দু ধর্মাবলম্বীরা সরকারের এই বাংলা সন গণনার সংস্কারটিকে আজ পর্যন্ত গ্রহণ করেননি। বাঙালি হিন্দুরা নিজেদের প্রয়োজনে পশ্চিমবঙ্গের জ্যোতিষিগণের তৈরি করা বাংলা বর্ষপঞ্জিকে অনুসরণ করে থাকেন। এতে করে একই জাতির জীবনে ভিন্ন দুই দিনে নববর্ষ পালন করার মতো একটি বিড়ম্বনা তৈরি হয়েছে। এতে করে নববষর্ষের সার্বজনিন চরিত্রটিই ক্ষুণœ হচ্ছে। বিষয়টির আশু সুরাহা হওয়া প্রয়োজন। হিন্দু ধর্মীয় নেতৃবৃন্দ তথা বর্ষপঞ্জি প্রণয়নের সাথে জড়িত পন্ডিতম-লীর সাথে এ নিয়ে সরকারের কোন ধরনের যোগাযোগ হয়েছে কিনা আমরা জানি না। তবে না হয়ে থাকলে জরুরিভাবে দুই পক্ষের মধ্যে আলোচনার মাধ্যমে একটি সমাধানে পৌঁছানো প্রয়োজন বলে আমরা মনে করি। এক্ষেত্রে পশ্চিমবঙ্গের সহযোগিতারও প্রয়োজন। ড. মোহাম্মদ শহীদুল্লাহ বাংলা সন গণনার বিজ্ঞানসম্মত যে সূত্র তৈরি করেছেন তা শুধু বাংলাদেশ নামক ভৌগোলিক অঞ্চলের জন্য নয়, বরং পৃথিবীর যে প্রান্তেই বাংলা বর্ষ অনুসরণ করা হয় তার সর্বত্রই এই সূত্র প্রয়োগ হওয়ার কথা। বাংলাদেশ একটি স্বাধীন ও সার্বভৌম রাষ্ট্র হওয়ার কারণে এই সমন্বয় সাধনের দায়িত্বটি আপনাআপনিই আমাদের সরকারের হাতে চলে আসে।
বাংলা নববর্ষ উদযাপনে শহর ও গ্রামের মধ্যে এক ধরনের ভিন্নতা তৈরি হয়েছে। শহরে যে কায়দায় এখন বর্ষবরণ করা হয় বাংলাদেশের গ্রামগুলো সেই কায়দাকে এখনও রপ্ত করতে না পেরে সনাতনী ধারায়ই আটকে আছে। এখন প্রশ্ন হলো শহুরে নব প্রবর্তিত এই পান্তা-ইলিশ মার্কা বর্ষবরণ নাকি আটপৌঢ়ে গ্রামীণ বর্ষবরণ পদ্ধতি, কোনটি আমাদের ঐতিহ্যকে ধারণ করে? এ কথা ঠিক মধ্যবিত্ত মনন সর্বদাই শিকড় থেকে বিচ্ছিন্ন হযে আকাশে উড়তে চায়। আজ শহরে বর্ষবরণের যে প্রক্রিয়া সেটি বাঙালি মধ্যবিত্ত মানসের শিকড়বিচ্ছিন্ন আকাশচারী মনোবৃত্তির পরিচায়ক বলেই আমরা মনে করি। ঠিক এই জায়গায় আদি ও অকৃত্রিম ভালবাসা নিয়ে গ্রামে গ্রামে নতুন বছরকে আড়ম্বরহীনভাবে অথচ প্রাণের প্রচ- আবেগে বরণ করে নেয়ার যে চিরাচরিত ঐতিহ্য সেটিই মূলত শিকড়সংলগ্ন সংস্কৃতি। শিকড় বিচ্ছিন্ন সংস্কৃতি কখনও কোন জাতিকে সমৃদ্ধ করতে পারে না। তাই নতুন বছরের এই দিনে আমাদের আবেদন থাকবে আসুন আমরা নিজস্ব সংস্কৃতির মূলে ফিরে যাই। মেকি কিংবা রঙ সর্বস্ব আনন্দ বিনোদনের পরিবর্তে মূলানুগত যাত্রাই হোক আমাদের অভীষ্ট।
বৈশাখ হাওরের মানুষের জন্য উদ্বেগ ও আনন্দের উপলক্ষও বটে। প্রকৃতি সহায় হলে কৃষকের গোলা ভরে উঠবে নতুন ধানে। আর প্রকৃতি বিরূপ হলে সেই কৃষকের মুখে রাজ্যের হতাশা ভর করবে ঠিক কালবোশেখির কালো অন্ধকার আকাশের মতো। এই বৈশাখ রূদ্রমূর্তি ধারণ করে মানুষের ঘর বাড়ি উড়িয়ে নেয়। এই বৈশাখ সংহার রূপ ধারণ করে হাওরের ভরা মাঠ তলিয়ে দেয়। বৈশাখের মত এত ‘এই রোদ এই মেঘের’ পরষ্পর বিরোধী রূপের দেখা মেলা ভার অন্য কোন মাসে। তাই বৈশাখ যেমন আনন্দের তেমনি এই মাসটি বিষাদেরও বটে।
আনন্দ-বিষাদের বৈশাখের প্রথম দিনে সবাইকে নববর্ষের শুভেচ্ছা।