আতঙ্কিত হবেন না, স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলুন

ডা: টি এম ইমরান আহমেদ
করোনায় সাধারণত জ্বর, শুকনা কাশি, ক্লান্তিভাব থাকলেও গলা ব্যথাও অন্যতম উপসর্গ হিসেবে দেখা যায়। প্রায়ই টেলিমেডিসিন সেবা নিতে গিয়ে রোগীরা গলাব্যথা নিয়ে তাদের উৎকন্ঠার কথা বলে থাকেন। গলায় তীব্র অস্বস্তিবোধ করা, খুসখুস করা, প্রচন্ড ব্যথা অনুভব, খাবার গিলতে না পারা কিংবা ঢোক গিলতে অসুবিধা হওয়া অথবা গলায় জ্বালা পোড়া করা এসব অভিযোগ প্রায়ই রোগীরা করে থাকেন। আমরা যারা চিকিৎসকরা সেবা দিচ্ছি যেহেতু আমরা রোগীকে সরাসরি দেখতে পাচ্ছি না তাই অনেকক্ষেত্রে ফোনে সঠিক রোগ নির্ণয় করা সম্ভব হচ্ছে না এবং যেহেতু মহামারী চলতেছে তাই করোনাকে মাথায় নিয়েই আমাদের পরামর্শ দেয়া লাগে। সেক্ষেত্রে রোগীকে প্রাথমিক চিকিৎসা দিয়ে সাথে সাথে কোভিড টেস্ট করে নেয়ার জন্যই পরামর্শ দিয়ে থাকি।
করোনা ভাইরাসের ক্ষেত্রে আশেপাশের কেউ হাঁচি-কাশি দিলে কিংবা ভাইরাস সংক্রমিত কোন জায়গায় হাত দেয়ার পর আপনার মুখে হাত দিলে মূলত এই সংক্রমণ হয়। শুরুতে এটা আপনার গলায় তারপর ধীরে ধীরে শ্বাসনালী ও ফুসফুসের কোষে আঘাত করে এবং সেসব জায়গায় করোনা ভাইরাসের কারখানা তৈরী করে। পরে শরীরের অন্যান্য জায়গায় তার আরও নতুন নতুন কোষকে আক্রমণ করে। এখন প্রশ্ন হচ্ছে গলা ব্যথা মানেই কি করোনা নাকি সেটা সাধারন ব্যথাও হতে পারে!!
গলায় ব্যথা হলেই যেভাবে মানুষজন ভয় পেয়ে যান এই বুঝি আমার করোনা হয়ে গেল এমনকি অনেকের ঠিক ওইরকম কোন লক্ষনই নেই কিন্তু মাথায় করোনা ভয় ঢুকিয়ে নিয়েছেন যে সবসময় গলাব্যথা মনে হচ্ছে যেটাকে আমরা সাইকোলজলিক্যাল পেইন বলি। আদৌ উনার ওইরকম কোন ব্যথাই নেই। নাক কান গলা রোগের একজন ছাত্র কিংবা একজন চিকিৎসক হিসেবে আমি প্রায়ই গলাব্যথার এই উপসর্গ নিয়ে রোগীদের মাঝে মিশ্র প্রতিক্রিয়া লক্ষ্য করি। সবার ভিতরেই একটা করোনা ভীতি দেখতে পাই। শুধু কি করোনার কারনেই গলাব্যথা হয় নাকি অন্যান্য কারণেও হতে পারে! তাই আসুন আজ আমরা জেনে নেই ঠিক আর কি কি কারনে গলাব্যথা হতে পারে…

১. সাধারন ফ্লু, ভাইরাস,ঠান্ডা লেগে গেলে কিংবা ঋতু পরিবর্তনের সাথে সাথে আপনার গলা ব্যথা হতে পারে।

২. আমরা অনেকেই হয়তো জানি আমাদের গলার ভিতরে দুই পাশে দুইটা মাংসপিন্ড আছে তাদেরকে টনসিল বলে। এই টনসিলে প্রদাহ হলে গলাব্যথা হতে পারে। এটি একটি ব্যাকটেরিয়াজনিত রোগ। এটি সাধারণত শিশুদের বেশী হয় তবে যে কোন বয়সীদেরও হতে পারে। মাত্রারিক্ত পরিশ্রম কিংবা অপুষ্টির কারণে এই প্রদাহ দেখা দিতে পারে।

৩. কারও আ্যলার্জির সমস্যা থাকলে যেমন নাক বন্ধ থাকা, নাক দিয়ে সর্দি লেগে থাকে, এতে করে অতিরিক্ত সর্দি কিংবা মিউকাস নাকের পিছন দিয়ে পড়তে থাকে যেটাকে মেডিকেলের ভাষায় পোস্টনজাল ড্রিপ বলে। এতে করে গলায় অস্বস্তিবোধ হতে পারে যেটা গলাব্যথার কারন হতে পারে।

৪. বাতাসের শুষ্কতার কারনে ময়েশ্চায়ারাইজিং একটা প্রভাব হয় যে কারণে অনেক সময় গলা, মুখ শুকিয়ে যায়। এতে গলায় খুসখুস কিংবা একটু একটু ব্যথা অনুভুত হতে পারে।

৫. অতিরিক্ত ধুমপান যারা করেন কিংবা বায়ুদূষণের কারণে গলায় খুসখুস বা অস্বস্তি বোধ করতে পারে।

৬. কোন কারনে গলায় বা ঘাড়ে আঘাত পেলে, অনেক সময় খাবারের টুকরো গলায় আটকে গেলে কিংবা অত্যধিক গরম পানি অথবা গরম তরল জাতীয় খাবার খেলে খাদ্যনালির টিস্যু ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে গলাব্যথা করতে পারে।
খুব জোরে কথা বললে কিংবা উচ্চস্বরে গান করলে গলার স্বর ভেঙ্গে গিয়েও গলাব্যথা করতে পারে।

৭. খাওয়ার পর যাদের সাথে সাথে শুয়ে পড়ার অভ্যাস কিংবা যাদের গ্যাস্ট্রিক সমস্যা খুব বেশী বা খাবার পর খুব বেশী ঢেঁকুর উঠে, খাবার উপরের দিকে উঠে আসে তাদের ক্ষেত্রে পাকস্থলীর এসিড খাদ্যনালিতে চলে আসে এতে করে খাদ্যনালির কোষ এসিডের মাধ্যমে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েও গলাব্যথা হতে পারে।

এই ধারনায় আপনার গলাব্যথা মানেই করোনা নয়। সাথে সাথে আতঙ্কিত হয়ে ঔষধ সেবনও নয়। ঔষধ ছাড়াই কিছু কিছু পদ্ধতি অবলম্বন করলে আপনি বাড়িতেই বসে গলাব্যথার উপশম করতে পারেন…

১. গলাব্যথা হলে প্রাথমিক চিকিৎসা হলো লবন গরম পানি দিয়ে গড়গডি করা। এক গ্লাস হাল্কা গরম পানি নিন। এতে ১ চা চামচ লবন যোগ করে ভালোভাবে মিশ্রিত করুন। এটি গলাব্যথা থেকে তাৎক্ষণিক মুক্তি পেতে সহায়তা করবে। তাছাড়া নিয়মিত দিনে ২ বার করে গরম পানির ভাপ নিবেন। কুসুম গরম পানি খাবেন।

২. আদা এন্টিব্যাকটেরিয়াল ও এন্টিইনফ্ল্যালামেটরী হিসেবে কাজ করে। পানি গরম করে কয়েকটুকরো ফ্রেশ আদা দিন। এরপর আরও ৫-১০ মিনিটের জন্য ফোঁটান। দিনে কমপক্ষে ২ বার এই পানি পান করুন। এছাড়া প্রতিদিন ২-৩ বার আদা মিশ্রিত রং চা খুবই কার্যকরী।

৩. নিয়মিত লেবুর রস পান করতে পারেন। বিশেষজ্ঞদের মতে লেবু শরীরের টক্সিন দূর করে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ায়। আরও ভালো হয় কুসুম গরম পানিতে লেবুর রসের সাথে ১-২ চামচ মধু মিশিয়ে পান করতে পারলে। মধু প্রাচীনকাল থেকেই গলাব্যথা নিরাময়ের জন্য ব্যবহার হয়ে আসছে। এর জীবানুনাশক ও জীবাণুবিরোধী দুটি গুণই বিদ্যমান।

৪. রসুনও গলাব্যথা নিরাময়ে কার্যকরী। রসুনের মধ্যে থাকা অ্যালিসিন গলার ব্যথার কারণ ব্যাকটেরিয়াকে ধ্বংস করতে সহায়তা করে।

পরিশেষে বলবো ঔষধ সেবনের আগে অবশ্যই চিকিৎসকের পরামর্শ নিবেন। নিজে থেকে আগ বাড়িয়ে কিছু করতে যাবেন না কিংবা ফার্মেসীর দোকানদারের কথায় অযথা এন্টিবায়োটিক খেয়ে নিজের দীর্ঘমেয়াদী ক্ষতি ডেকে আনবেন না। কোনভাবেই আতঙ্কিত হবেন না। স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলুন। সচেতন হোন।

লেখক : ডা: টি এম ইমরান আহমেদ, এমবিবিএস, সিসিডি (বারডেম), বিসিএস (স্বাস্থ্য)
ডিএলও-ইন কোর্স(নাক কান গলা রোগ), বিএসএমএমইউ, ঢাকা।
সহকারী সার্জন, ২৫০ শয্যাবিশিষ্ট সদর হাসপাতাল, সুনামগঞ্জ