আত্মসমর্পিত চিকিৎসা ব্যবস্থা ও রোগীদের অসহায়ত্ব

কামরুল জাহাঙ্গীর
বর্তমান করোনা পরিস্থিতিতে বাংলাদেশের চিকিৎসা ব্যবস্থার গণবিরোধী চরিত্রটি দিবালোকের মতো পরিষ্কার হয়ে উঠেছে। সকল ডাক্তারের প্রাইভেট চেম্বার বন্ধ করে দেয়া হয়েছে। বন্ধ ডায়াগনস্টিক সেন্টার। সরকারি বেসরকারি হাসপাতালগুলোতে চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মীরা সেবাদানে অনিচ্ছুক। সর্দি জ্বর নিয়ে কেউ হাসপাতালে গেলে স্বাস্থ্যকর্মীরা পালিয়ে যাচ্ছেন। স্বাস্থ্য পরিসেবা কেন্দ্র থেকে অনবরত প্রচার করা হচ্ছে, কেউ যাতে পারতপক্ষে হাসপাতালে না যান। ফলত, করোনা নয়, অন্যান্য রোগে বিনা চিকিৎসায় মানুষ মারা যাচ্ছে। বর্তমান বিশ্ব পরিস্থিতিতে চিকিৎসাকর্মীদের অগ্রভাগে থেকে সংকট উত্তরণে যেখানে বীরবিক্রমে যুদ্ধ করার কথা সেখানে বাংলাদেশের চিকিৎসাকর্মীরা পলায়নপর মনোভাব প্রদর্শন করে নিজেদের সেবাবিমুখ ও দায়বদ্ধতার অভাব দেখিয়ে চলেছেন।
একাত্তরে যাঁরা যুদ্ধে গিয়েছিলেন তাঁরা জীবন বাজি রেখেই গিয়েছিলেন। যুদ্ধে গিয়ে অক্ষত অবস্থায় মায়ের কোলে কিংবা প্রেয়শীর আঁচল তলে ফিরে আসার কল্পনাও কেউ করেননি। বীর জনতার এই মরণপণ প্রতিজ্ঞা ও লড়াকু মনোবৃত্তিই আমাদের স্বাধীনতা পাইয়ে দিয়েছে। করোনা পরিস্থিতি একধরনের যুদ্ধ পরিস্থিতিই। এই যুদ্ধের ফ্রন্টলাইন ফাইটার চিকিৎসাকর্মীরা যে রকম আত্মসমর্পন করে বসে আছেন তাতে এই সংকট মোকাবিলা কঠিনতর হয়ে উঠেছে।
এই অবস্থা কেন? চিকিৎসক তৈরি হন জনগণের করের টাকায়। চাকুরি পাওয়ার পর তাদের দক্ষতা বাড়ানোর জন্য গণতহবিল থেকে খরচ করে প্রচুর প্রশিক্ষণ দেয়া হয়। চিকিৎসকদের পেশাগত নীতি নৈতিকতা রয়েছে। তারা কখনও চিকিৎসাসেবা প্রত্যাশীদের বঞ্চিত করার অধিকার রাখেন না। স্বাভাবিক পরিস্থিতিতে একজন চিকিৎসক ১২/১৪ ঘণ্টা রোগী দেখেন। অনেক চেম্বার দেখেছি গভীর রাত পর্যন্ত রোগীতে ঠাসা থাকে। চিকিৎসকরা দুই হাতে টাকা রোজগার করেন। তারা তখন ব্যক্তিগত সময়কেও অর্থ উপার্জনের জন্য ব্যয় করতেন। অর্থাৎ চিকিৎসকরা ব্যবসায়ীসুলভ মনোবৃত্তিকে প্রাধান্য দিয়ে চলেছেন। চিকিৎসকদের এই ব্যবসায়ীসুলভ মনোভাব তাদের সেবাদানের পেশাগত নৈতিকতাকে একেবারেই গৌণ করে ফেলেছে। এখন যে সংকট তার পিছনে এই মনোভাবই মূল কার্ষকারণ। চিকিৎসকরা ভয় পেয়ে গেছেন। তারা চিকিৎসা যোদ্ধার পরিবর্তে চিকিৎসা বেনিয়ার ভূমিকায় অবতীর্ণ হওয়ার কারণে তাদের এই ভয়। তারা ভাবছেন করোনায় সংক্রমিত হয়ে নিজেকে বিপন্ন করার কোনো মানে নেই। বরং বেঁচে থাকলে ভবিষ্যতে চিকিৎসা বাণিজ্য করার সুযোগ থাকবে।
কিছু চিকিৎসক যারা পরিমাণে খুব কম, তাঁরা সেবাব্রতী মনোভাব অব্যাহত রেখেছেন, তাঁদের প্রতি অশেষ শ্রদ্ধা। কিন্তু তাঁরা মূল ধারা নন। বরং উল্টোটাই মূল ধারা। এবারের এই সংকট আমাদের গণস্বাস্থ্য ব্যবস্থার যে ভয়াবহ দিক উন্মোচিত করল তাতে ভবিষ্যতে এ নিয়ে অনেক কাজ করতে হবে। এখনই কিছু কাজ করতে হবে যাতে চিকিৎসকরা ভয়কে জয় করে ফ্রন্টলাইনে চলে আসেন নতুবা তাঁদের ইমেজ ভুলুণ্ঠিত হয়ে যাবে।

এবার অন্য একটি প্রসঙ্গ। আমি নিজে একজন রোগী হিসাবে এর ভুক্তভোগী। বাংলাদেশে সমন্বিত বা সার্বিক চিকিৎসা পদ্ধতি বলে কোনো কিছুর বালাই নেই। বয়স্ক লোক হিসাবে আমি সিওপিডি, গ্যাসট্রিক, ডায়াবেটিস, থাইরয়েড কমপ্লেক্স, উচ্চ রক্তচাপ, চোখের দৃষ্টিশক্তির সমস্যা, কানে ইনফেকশন প্রভৃতি জটিলতায় আক্রান্ত। অধিকাংশ বয়স্ক ব্যক্তিই এমন বহুবিধ স্বাস্থ্য সমস্যায় ভোগেন। কিন্তু আমাদের চিকিৎসা ব্যবস্থায় বয়স্কদের এই নানাবিধ জটিলতার চিকিৎসায় ওয়ান স্টপ ব্যবস্থা নেই। এক এক রোগের জন্য এক এক জন বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের শরণাপন্ন হতে হয়। বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকরা নিজেদের মত করে সংশ্লিষ্ট রোগের চিকিৎসা দেন। রোগীর সবগুলো উপসর্গ তাঁরা জানতে চান না। কয়েকজন বিশেষজ্ঞ দেখানোয় প্রদত্ত ঔষধগুলো একসাথে ব্যবহার কতটুকু নিরাপদ, একটি ঔষধ অন্যটির সাথে বৈসাদৃশ্যপূর্ণ কিনা তাও জানার উপায় নেই।
এখানে যদি এরকম বয়স্ক রোগীদের বিবিধ জটিলতার জন্য একটি ডেস্কের ব্যবস্থা থাকত তাহলে ভাল হত। ওই ডেস্ক প্রয়োজন মত অন্য বিশেষজ্ঞের নিকট রোগীকে পাঠিয়ে দিত, সাথে পুরো হিস্ট্রিও ফরোয়ার্ড করত। এতে ঔষধের পারস্পরিক বিক্রিয়া রোধ করা সম্ভব হত। রোগীরাও স্বস্তি পেতেন।

বাংলাদেশের চিকিৎসা ব্যবস্থাকে ঢেলে সাজিয়ে গণমুখী করার জন্য এখন থেকেই চিন্তা করতে হবে। যারা গণ-করে সরকারি মেডিক্যালে পড়াশোনা করে চিকিৎসক হয়ে সরকারি চাকুরি পাবেন তাঁদের প্রাইভেট প্র্যাকটিস বন্ধ করে দিতে হবে। তাঁদের বেতন ভাতা ও অন্যান্য সুবিধাদি বর্ধিত হারে প্রদান করতে হবে। বেসরকারি মেডিক্যাল থেকে নিজস্ব অর্থায়নে পাস করা চিকিৎসকদের বেসরকারি স্বাস্থ্য সেক্টরে নিয়োজিত করা যেতে পারে। বেসরকারি সেক্টর থেকে সরকারি সেক্টরের স্বাস্থ্য সুবিধার পরিধি ও ক্ষমতা ব্যাপকভাবে বাড়াতে হবে। একটি স্বাধীন দেশের চিকিৎসা ব্যবস্থাকে অর্থ ও বিত্তের কাছে বন্দী রাখা কোনো কাজের কথা নয়।