আদিবাসীদের স্বপ্নের ভোরবেলা

পলাশ পি. চিছাম
৯ই আগস্ট “আন্তর্জাতিক আদিবাসী দিবস”। এবছর ‘Indigenous Languages’ আদিবাসী ভাষা চর্চা ও সংরক্ষণে এগিয়ে আসুন’’ এই প্রতিপাদ্যকে সামনে রেখে সারা বিশ্বে যথাযোগ্য মর্যাদায় আন্তর্জাতিক আদিবাসী দিবস পালন করা হবে। জাতিসংঘ ১৯৯৪ সালের ২৩ ডিসেম্বর ৯ আগস্টকে ‘আন্তর্জাতিক আদিবাসী দিবস’ হিসেবে ঘোষণা করেন। এরপর থেকেই প্রতিবছর বাংলাদেশসহ সারা বিশে^ দিবসটি পালন করে আসছে। বাংলাদেশের আদিবাসীরাও এ দিন তাদের সাংবিধানিক স্বীকৃতি ও বিভিন্ন অধিকার আদায়ের লক্ষ্যে বিভিন্ন স্থানে দিবসটি পালন করে থাকে। বাংলাদেশ আদিবাসী ফোরামের তথ্য অনুযায়ী বাংলাদেশে ৪৫ টি সম্প্রদায়ের আদিবাসী শিক্ষা, স্বাস্থ্য, ভূমি, কর্মসংস্থান, বৃত্তিমূলক প্রশিক্ষণ, সামাজিক নিরাপত্তাসহ বিভিন্ন সমস্যার মধ্য দিয়ে জীবনের সাথে সংগ্রাম করে নিজেদের অস্তিত্ব টিকিয়ে রেখেছে। আদিবাসীদের রয়েছে নিজস্ব ভাষা, সংস্কৃতি ও আচার অনুষ্ঠান। কিন্তু দুঃখের বিষয় যে, স্বাধীনতার প্রায় ৫০ বছর পরেও আদিবাসীদের স্বীকৃতি দেয়া হয়নি। এমন কি আদিবাসীদের সংস্কৃতি রক্ষায় সরকারীভাবে কোন পদক্ষেপ গ্রহন করা হয়নি। অথচ স্বাধীনতা সংগ্রামসহ বিভিন্ন জাতীয় সংগ্রামে আদিবাসীরা বীরদর্পে সংগ্রামগুলোতে অংশগ্রহন করেছে। কিন্তু অত্যন্ত পরিতাপের বিষয় আমাদের বাংলাদেশে এখন পর্যন্তও আদিবাসী হিসেবে স্বীকৃতি মিলেনি। বরং পঞ্চদশ সংশোধনীর পরও আদিবাসীদের জাতি হিসেবে ‘বাঙালী’ বলে পরিচয় দেয়া হয়েছে। আবার বাংলাদেশের সরকার উপজাতি, ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েই নিজেদের পবিত্র দায়িত্ব মনে করেছেন পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে।
আদিবাসীদের স্বপ্ন
আদিবাসীদের স্বপ্ন সুজলা-সুফলা, শস্য-শ্যামলা, সবুজেঘেরা সুনিবিড় এই মাতৃভূমিতে নিজের আত্ম পরিচয়ে পরিচিত হওয়া। কারণ প্রতিটি নাগরিক আত্ম পরিচয়ে পরিচিতি লাভের অধিকার রাখে। বাংলাদেশ জাতিসংঘের সদস্য হিসেবে ১৯৫৭ সালে আইএলও (আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা) কনভেনশন ১০৭ (ইন্ডিজেনাস এন্ড ট্রাইবাল পপুলেশন কনভেনশন ১৯৫৭) গণতন্ত্র, অসাম্প্রদায়িকতা ও সাম্যতা নিশ্চিত করার জন্য ১৯৭২ সালের ২২ জুন আন্তর্জাতিক চুক্তি হিসেবে অনুস্বাক্ষর করেন। পরবর্তীতে আইএলও কনভেনশন ১০৭-এর আংশিক পরিবর্তন করে ১৯৮৯ সালে কনভেনশন ১৬৯ প্রনয়ণ করা হয়। সুতরাং বাংলাদেশ সরকারের উচিত আন্তর্জাতিক চুক্তি হিসেবে আইএলও কনভেনশন ১০৭ ও ১৬৯ বাস্তবায়নের মাধ্যমে আদিবাসীদের প্রতি সদয় দৃষ্টি দেয়া । আদিবাসীদের স্বপ্ন আইএলও কনভেনশন ১০৭ ও ১৬৯ বাস্তবায়নের মাধ্যমে গণতন্ত্র, অসাম্প্রদায়িকতা ও সাম্যতা নিশ্চিত করা। শিক্ষাই জাতির মেরুদন্ড। তাই সরাকারের উচিত পিছিয়ে পরা নির্জন পাহাড়ের পাদদেশে কিংবা যোগাযোগে পিছিয়ে পরা দুর্গম এলাকায় বসবাসরত আদিবাসীদের শিক্ষার ক্ষেত্রে সরকারীভাবে বিশেষ পৃষ্ঠপোষকতা করা এবং উচ্চ পর্যায়ে লেখাপড়ার জন্য বিশেষ সুযোগ সৃষ্টির করা। কারণ একজন মা যেমন শিশুকে আসতে আসতে হাত ধরে হাটতে সাহায্য করে; ঠিক তেমনি রাষ্ট্রের উচিত পিছিয়ে পরা আদিবাসীদের দিকে উচ্চ শিক্ষা গ্রহণে সাহায্যের হাত প্রসারিত করা। তাহলেই বাহারি রঙের আদিবাসী ফুলগুলো জাতীয় পর্যায়ে প্রস্ফুতিত হয়ে ছড়াবে সুবাস এবং দেশ গঠনে রাখবে অবদান। কারণ গ্রাম এলাকা থেকে পাশকরা কোন আদিবাসী ছাত্র/ছাত্রী কোনভাবেই শহরে পড়–য়া ছাত্র/ছাত্রীর সাথে ভর্তি পরীক্ষায় প্রতিযোগিতায় টিকতে পারবে না। এসব ক্ষেত্রে আদিবাসীদের বিশেষ বিবেচনায় সরকার দেখবেন এটাই আদিবাসীরা স্বপ্ন। আদিবাসীদের স্বপ্ন তাদের পূর্বপুরুষদের এক চিলতে ভিটামাটিতে শান্তিতে নিদ্রা যাওয়া। আদিবাসীরা যেমন বৈচিত্রপূর্ণ জাতি হিসেবে বিশ^ দরবারে পরিচিত। তাই তাদের জন্য আদিবাসী বান্ধব ভূমি কমিশন গঠন করা একান্ত প্রয়োজন। কেননা একমাত্র আদিবাসী বান্ধব ভূমি কমিশনই পারবে আদিবাসীদের ভূমি সমস্যা সমাধানে এগিয়ে আসতে। নতুবা এ জটিল সমস্যা দিন দিন জটিল থেকে জটিলতায় নিয়ে যাবে, যা আদিবাসীদের অস্তিত্ত্ব টিকিয়ে রাখা কঠিন হবে।
স্বপ্নের ভোরবেলা
একদিন দীর্ঘরাত সুখের স্মৃতি খোঁজতে খোঁজতে স্বপ্নের ভেলা ভূমিতে চড়ে আদিবাসীদের রাতের পরিসমাপ্তি ঘটবে। স্বপ্নের ভোরবেলা ঘুম থেকে উঠে আদিবাসীরা শুনবে গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার আদিবাসীদের উপর থেকে উপ-জাতি বা ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী নামের প্রলেপ মুছিয়ে আদিবাসীদের ইচ্ছা অনুযায়ী ‘আদিবাসী’ হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে আর আদিবাসীরা সারা বিশে^ নিজেদের ‘আদিবাসী’ হিসেবে পরিচয় দিচ্ছে বুক ফুলিয়ে। সকল আদিবাসী নারী-পুরুষ, ছেলে-মেয়ের ঢল নামবে রাস্তায় শান্তির অগ্রযাত্রায়। কেউ নাচবে, কেউ গাইবে নিজেদের ছন্দে আদিবাসী গান। আর মাঝে মাঝে আনন্দ ধ্বনিতে উচ্চারিত হবে ‘খা সাংমা’, “খা মারাক” (বিজয় ধ্বনি)। কারো হাতে ঢা’মা (ঢোল), আদুরু (বাঁশি), রাং (ঘন্টার মত আওয়াজ করে এমন), মিল্লাম-স্ফী (ঢাল-তলোয়ার), তীর-ধনুক, নাগ্রা (ঢোল বিশেষ) ও বিভিন্ন আদিবাসী বাদ্যযন্ত্র নিয়ে নেচে নেচে আনন্দ ফূর্তি করছে। সবাই আদিবাসী পোশাক পড়েছে। গায়ে পড়েছে আদিবাসীদের বিভিন্ন ধরনের অলংকার থাংখা’ছড়া (রৌপ্যের অলংকার), খক্কাসিল (কপাল বেষ্টনি) , রিকমিচিক (গলার মালা), ও আরোও কত কি। সকল মহিলা, ছেলে-মেয়েরা নতুন সাজে সাজবে সে এক অনাবিল শান্তি। আজ তারা দীর্ঘশ^াস নিতে পারছে অন্তরের অন্ত:স্থল থেকে। আজ নেই কোন বাধা; আজ তারা নিজের ইচ্ছানুযায়ী নিজেদের ‘আদিবাসী’ হিসেবে পরিচয় দিতে পারছে। আজ যে তারা আদিবাসী হিসেবে স্বীকৃতি পেয়েছে। তাদের আনন্দের আজ শেষ নেই। আকাশে, বাতাসে ধ্বনিত হচ্ছে আনন্দধারা। এ আনন্দধারা বর্ষিত হচ্ছে প্রতিটি আদিবাসী পল্লীতে, ছড়িয়ে যাবে শহরে, দেশে ও সারা বিশে^ সকল মানব জাতির উপর শান্তির ঝর্ণাধারা হয়ে। এ ছাড়াও তাদের জন্য হয়েছে আলাদা ভূমি কমিশন, অর্পিত সম্পত্তি আইন অবমুক্ত হয়ে আদিবাসীরা তাদের স্থাবর সম্পত্তি কোন শংকা ছাড়াই ফিরে পাচ্ছে, আদিবাসী অধ্যূষ্যিত এলাকার খাস জমি আদিবাসীদের নিকট বন্দোবস্ত হচ্ছে, আদিবাসীদের বংশপরম্পরায় বসবাস করা জমিতে ইকোপার্ক না হয়ে পতিত জমিতে ইকোপার্ক তৈরী হচ্ছে, আদিবাসীদের নিজস্ব সংস্কৃতি, ভাষা, ঐতিহ্য রক্ষায় প্রতিটি উপজেলায় বাংলাদেশ সরকারের মাধ্যমে স্থাপিত হয়েছে আদিবাসী কালচারাল একাডেমি ও যাদুঘর, আদিবাসীদের ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানগুলোতে সংস্কারের জন্য ও প্রধান ধর্মীয় উৎসব উদযাপনে রয়েছে পর্যাপ্ত পরিমান সরকারী অর্থের বরাদ্ধ, প্রতি মৌসুমে সহজেই হাতের কাছে পাবে সেই জীবন বাজি রাখা পাহাড়ের ঝোপ ঝাড় পরিস্কারের মধ্য দিয়ে মাথার ঘাম পায়ে ফেলে কঠোর পরিশ্রমের মাধ্যমে ঝুম চাষ বা সমতল ভুমিতে কৃষি কাজের জন্য আধুনিক কৃষি উপকরণ, সার ও উন্নতমানের বীজ। এসব কৃষি উপকরণ, সার ও বীজ সর্বোত্তম ব্যবহারের মাধ্যমে দেশের মানুষের খাদ্যের যোগান দিচ্ছে তারা এবং দারিদ্রমুক্ত দেশ গঠনে ভূমিকা রাখছে। আবার ফিরে আসছে সেই আনন্দঘন পরিবেশ ওয়ানগালা (নবান্ন উৎসব), রংচুগাল্লা প্রভৃতি অনুষ্ঠান। সরকারী চাকুরী নামক সোনার হরিণটি অধরা না থেকে কোন অনিয়ম/বাধা ছাড়াই বিভিন্ন পর্যায়ে সরকারী চাকুরীতে নিয়োগ প্রাপ্ত হয়ে আদিবাসীরা দেশের, জাতির ও সমাজের উন্নয়নে ভূমিকা রাখছে।
সেই স্বপ্নের ভোর বেলা কী আসবে! কখন আসবে? আদিবাসীদের স্বপ্ন কী বাস্তবরূপ লাভ করবে না? সেই স্বপ্নের ভোর বেলা যাতে শীঘ্রই ফিরে আসে আদিবাসীদের জীবনে; সেই প্রতীক্ষায় অনাগত ভবিষ্যতের দিকে তাকিয়ে আছে বাংলাদেশে বসবাসরত ৩৫ লক্ষাধিন আদিবাসী জনগোষ্ঠী।
প্রিন্সিপাল, স্যানক্রেড কমিউনিটি প্যারামেডিক ইনস্টিটিউট, সুনামগঞ্জ।