আদিল শাহ ও তাঁর গান

মুহাম্মদ শাহজাহান
বাউল গান বাংলার ঐতিহ্যবাহী লোকসংগীতের একটি অনন্য ধারা যা কিনা বাউল সম্প্রদায়ের নিজস্ব প্রকাশ মাধ্যম। লালন সাঁইয়ের গানের মাধ্যমে উনিশ শতক থেকে বাংলায় এই গান ব্যাপক জনপ্রিয়তা পেতে শুরু করে। আবহমান বাংলার প্রকৃতি, মাটি আর মানুষের জীবন জিজ্ঞাসা যেমন ফুটে ওঠে এই বাউল গানে, তেমনি সেই গানে আমরা শুনতে পাই সাম্য ও মানবতার বাণী। আর সন্দেহ নেই এই ধারাটি পুষ্ট হয়েছে মূলত বৌদ্ধ সহজিয়া, বৈষ্ণব সহজিয়া ও ইসলামের সুফি দর্শনের প্রভাবে।
নিজেকে জানার ইচ্ছে থেকেই মানব হৃদয়ে জন্ম নেয় আত্মজিজ্ঞাসা; এবং খুঁজে ফিরে কাঙ্খিত পথ। হয়তো বা একদিন তার আত্মপোলব্ধি ঘটে, দিব্যদৃষ্টিতে উন্মোচিত হয় নিজ স্বত্তা কিংবা তার চেতনার জগত। সে নিজ স্বত্তার মধ্যেই খুঁজে ফিরে সেই পরমাত্মা তথা অধরা বা অদেখাকে। এই পরমাত্মা বা পরমেশ^রকে পাওয়ার তীব্র ব্যাকুলতা থেকেই বাউল সেই বিশেষ ধারা বা সম্প্রদায়ের সৃষ্টি। বাউল সাধকদের সাধনার মাধ্যম হচ্ছে গান। সাধকের কাছে সাধন-ভজনের গূঢ়তত্ত্ব প্রকাশ পায় তাঁর এই গানের মাধ্যমেই। প্রত্যেক মানুষের অন্তরে যে পরমাত্মার উপস্থিতি সেই অদেখাকে আর অধরাকে ধরাই বাউল ও তাঁর সাধন-ভজনের উদ্দেশ্য। বাউল সাধকের পথপ্রদর্শক তাঁর গুরু কিংবা মুর্শিদ; আর সাধনপথের সঙ্গী বলতে তাঁর এই গান ও তাঁর একতারা।
বৃহত্তর সিলেট তথা ময়মনসিংহসহ বিস্তৃত ভাটি অঞ্চলের লোকগানের অন্যতম স্রষ্টা উকিল মুন্সী, সৈয়দ শাহনুর, আরকুম শাহ, ফকির শীতালং শাহ, জালাল উদ্দিন খাঁ, ফকির আদিল শাহ, কালা শাহ যেমন বাউল-গীতিকবি ছিলেন তেমনি এঁদের নিয়ে তৈরি হয় বিভিন্ন লোকবিশ্বাস তথা মিথ বা আখ্যান। এতে প্রতীয়মান হয় যে, এ সকল গীতিকবির গান মানুষ শুধু শোনতই না, তাঁদেরকে অলৌকিক ক্ষমতাসম্পন্ন বলেও বিশ^াস করত। কিন্তু জীবন চলার পথে এসব কবিরা যেসব গান রচনা করেছেন, অনেক সময় তাঁরা সেগুলোর লিখিত রূপ দিয়ে যেতে পারেননি এবং সেদিন সে চেষ্টাও তাঁরা করেননি। গীতিকবিদের কারো কারো আবার অক্ষর জ্ঞানও ছিল না। তাঁদের রচিত গান সময়ের ব্যবধানে এক অঞ্চল থেকে অন্য অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়েছে। ভালোলাগার এই গানগুলো গ্রামবাংলার মেঠোপথ ধরে আউল-বাউলের একতারার সুরে, সোনালী স্বপ্নে ভরা কাঁদামাখা ফসলের জমিতে পরিশ্রান্ত কৃষকের মুখে, বিস্তৃত হাওর-বাওর আর নদী-নালায় ছুটে চলা নৌকার মাঝি-মাল্লার সুললিত কণ্ঠে, মাঠে মাঠে রাখালের উদাস করা বাঁশির সুরে ছড়িয়ে পড়েছে বাংলার আনাচে-কানাচে। অঞ্চলভেদে যেমন পরিবর্তন আসে গানের কথায় এবং সুরে, তেমনি অনেক ক্ষেত্রে বদলে যায় তার স্রষ্টার নামও। একটা সময় সে গানের ¯্রষ্টার নাম আর খুঁজেই পাওয়া যায় না। ভাগ্যগুণে গানের শেষ কলিতে গীতিকবির নামটা কোন রকম ঝুলে থাকলেও তাঁর শেকড়ের সন্ধান মেলে কমই; আর বলতে গেলে লোক গানের ভাগ্য বা পরিচয়ই যেন এমন।
এখানে তেমনি এক অখ্যাত মরমী কবির নাম ফকির আদিল শাহ। লোকসংগীত গবেষকরাও তাঁর তেমন কোনো তথ্য বা হদিস আমাদের দিতে পারেননি। কিন্তু অনেকই জানেন তাঁর জন্ম সুনামগঞ্জে- ব্যাস এই পর্যন্তই হলো তাঁর পরিচিতি! বলতে গেলে প্রখ্যাত বৈষ্ণব কবি রাধারমণ দত্তের সমসাময়িক ও মরমী কবি হাছন রাজার বয়োজ্যেষ্ঠ ফকির আদিল শাহ সম্বন্ধে আমাদের জানা-শুনার পরিধিটা এতটুকুই!
এখানে অপ্রাসঙ্গিক হবে না ভাটিবাংলার সুরের যাদুকর অমর লোকসংগীত শিল্পী পণ্ডিত রামকানাই দাসের উল্লেখ- যাঁর কণ্ঠে যেমন গীত হয়েছে বৈষ্ণব কবি রাধারমণ দত্তের জনপ্রিয় গান, তেমনি তাঁর সুরে সুরমার নদীর জলে ঢেউ তুলেছে মরমী কবি হাছন রাজাসহ আরো অনেকের গান। আজীবন চেষ্টা করেছেন অবহেলা আর অযতেœ কালেরগর্ভে হারিয়ে যেতে বসা লোককবিদের তাঁর কণ্ঠে তুলে আনতে। তাই বলা চলে পণ্ডিত রামকানাই দাস ছিলেন একজন আন্তরিক এবং সফল লোকসংগীত সংগ্রাহক। এভাবে তাঁর কণ্ঠে গাওয়া দুটি গানের সাথে আমাদের পরিচিয় ঘটে যার গীতিকার হলেন আদিল শাহ; আর এই গান দুটির ভনিতায়ও আমরা সেই সাক্ষ্যটুকু খুঁজে পাই।
এবার চলুন সেইসব দিনগুলোকে নিয়ে একটু ভাব-রোমন্থন করা যাক। সেদিন ফাগুনের পাতা ঝরা এক মধ্যাহ্ন; বাংলাঘরের বারিন্দায় বসে রেকর্ডপ্লেয়ারে শুনছিলাম পণ্ডিত রামকানাই দাসের কণ্ঠে গাওয়া কিছু লোকসংগীত; উল্লেখ্য যে, এর মধ্যে মরমী কবি ফকির আদিল শাহর দুটি গানও রয়েছে। শিল্পীর যাদুকরি সুরে ধীরে ধীরে হারিয়ে যাই কল্পনার জগতে; আমার মানসপটে ভেসে ওঠে শতাধিক বছর পূর্বেকার আমাদের গ্রাম- ডুংরিয়া। ওখানে দেখতে পাই- গ্রামের মধ্য দিয়ে প্রবাহিত বাউরি নদীর তীর সংলগ্ন এক কুঁড়েঘর থেকে বেরিয়ে উঠোনে এসে দাঁড়ালেন এক বৃদ্ধ। মাথায় উসখু-খুসকু চুল, কাঁধে ফকিরী ঝুলা, পড়নে মলিন কাপড়। চোখ তাঁর শান্ত-স্নিগ্ধ, গভীর তাঁর দৃষ্টি। এদিক-ওদিক একটুখানি নজর বুলিয়ে তিনি নদী পেরুলেন; আমন ক্ষেতের আলপথ ধরে ঋজু ভঙ্গিতে হাঁটতে শুরু করলেন তিনি। সংসার বিবাগী ফকিরের গন্তব্য কোথায় কেউ জানে না; এভাবে প্রায়শই নাকি তিনি বাড়ি থেকে নিরুদ্দেশ হয়ে যেতেন!
এবার লক্ষ্য করলাম যে, কিছু দূর এগিয়ে ফকির তাঁর ঝুলা থেকে কাঠের তৈরি দু’টুকরো চটি হাতে তুলে নেন। একটি চটির মধ্যবর্তী ছিদ্রে ডান হাতের মধ্যমা আরেকটির ছিদ্রে স্থান পায় বৃদ্ধাঙ্গুল। মধ্যমা আঙ্গুলে আটকে থাকা চটি নির্দিষ্ট ছন্দে ঠুকর খেয়ে চলে বৃদ্ধাঙ্গুলে আটকে থাকা অপর চটির সাথে; চট-চট, চট-চট, তীক্ষ্ন অথচ এক ধরনের মোহনীয় ধ্বনি তৈরি হয়। ধীরে ধীরে সেই ছন্দোবদ্ধ ধ্বনি যেন মিশে যেতে থাকে হৃৎপিন্ডের ভিতরে; যেখানে অনবরত ছন্দ আর তালে বেজে চলছে ধুক-পুক আর ধুক-পুক। হাতের চটি আর হৃৎপিন্ড থেকে উৎসারিত ছন্দোবদ্ধ ধ্বনি মিলে-মিশে আলোড়ন তুলে আমার অন্তরাত্মায়ও।
আমি শুনতে থাকি আদিল শাহর গান-
আমার মন মজরে, ওরে রঙ্গিয়ার চরনে মন মজ।।
মন মজ, দিল মজ, মন মজরে। ঐ
মন চোর, মন পাঁজি, মনবেত ঋৎ
কনে মনা উল্টা গতি ঘটায় বিপরীত।।
কনে মনা সাধুভক্ত, কনে মনা চোর
চৌদ্দ ভুবনের রাজা বচনের ঠাকুর। ঐ
নাভি হইতে উঠে দম নাসিকায় চলে
জ্ঞান কইরা চাইয়া দেখ দুই নয়নের তলে।।
নিত্যি আসে নিত্যি যায় করে গৃহবাস
ধরতে গেলে দেয়না ধরা শেখেফুল বাতাস। ঐ
হায়রে পাগলও মন বিচার কইরা খাও
যতনও করিয়া ধর মুর্শিদেরও পাও।।
ফকিরও আদিল শাহ বলে ঈমান রাইখ ধর
এক নামে তরিয়া যাইবায় কি বা ছোট-বড়। ঐ
এভাবে পাঠক লক্ষ্য করবেন, ফকিরের কণ্ঠ থেকে বাউলের কণ্ঠে, দূর থেকে দূরান্তে, বাংলার পথে-প্রান্তরে, সেই সুর বেজে চলে লোক থেকে লোকান্তরে। আর এভাবেই লোকজ গানের এই সুর ছড়িয়ে পড়ে গাঁও-গেরামের আকাশে-বাতাসে। ক্লান্ত-শ্রান্ত ফকির এবার একটুখানি বিশ্রামের তাগিদ বোধ করেন। হাতের লাঠিখানি মাটিতে গেঁড়ে ফকির বসে পড়েন পথের ধারের বট গাছের ছায়ার নীচে। গভীর আয়েশে দু’চোখের পাতা তাঁর আপনা থেকেই বুজে আসে। মনে হলো- তিনি ধ্যানমগ্ন হলেন কিংবা গভীর ভাবনায় ডুব দিলেন। হয়তো বা ভাবছেন, জন্ম আর মৃত্যুর রহস্য, অতীত-বর্তমান-ভবিষ্যত তথা মানব জীবনের তিনটি পর্যায় ও অপার সৃষ্টির রহস্য নিয়ে। ভাবুক ফকিরের ভাবনা কখনো বা কেন্দ্রীভূত হয় নিজেকে নিয়ে, আরশিনগরের সেই পড়শি কিংবা অধরা মনের মানুষকে নিয়ে। ভাবনা তার আপন মনে নিজের মতো করে ডাল-পালা বিস্তার করে চলে; ফকিরের শ্বাস-প্রশ্বাস ধীরে ধীরে শ্লথ হতে থাকে। এক সময় আর বুঝাই যায় না তাঁর শ্বাস-প্রশ্বাসের স্বাভাবিক ক্রিয়া চলছে কি না; তিনি জেগে আছেন, না- আসলে ঘুমিয়ে পড়েছেন।
পড়ন্ত বিকেলে তন্দ্রাচ্ছন্নভাব কাটিয়ে ফকির চোখ মেলে থাকান। দৃষ্টি তাঁর প্রসারিত হয় সামনের আদিগন্ত বিস্তৃত দেখার হাওরের শ্যামলীমায়। স্বচ্ছ সুনীল আকাশ, ওদিকে উড়া-উড়ি করছে গুটি কতেক চিল; বিল-বাদারে হয়তো বা মাছ ধরা চলছে। খাদ্যের সন্ধানেই ওদের এদিকে আসা। আড়মোড়া ভেঙ্গে শরীরের আলস্য ঝেড়ে ফকির এবার ওঠে দাঁড়ান। লাঠিখানি হাতে নেন, তাঁর সাধের ফকিরী ঝুলাটা কাঁধে তুলে নিতে ভুলেন না। আপন মনেই তিনি হাঁটতে শুরু করেন- এবার যাত্রাটা যে তাঁর উত্তর দিকে! দেখতে পাই আবারও তিনি ঝুলা থেকে হাতে তুলে নিলেন তাঁর নিত্যসঙ্গী কাঠের তৈরি সেই চটি যুগল। ছন্দে-তালে সুর ওঠে আর ফকিরের হৃদয়বীনা থেকে ঝংকৃত হয় নশ^র মানব জীবনের না-পাওয়ার হাহাকার আর বেদনা ভারাক্রান্ত কথাগুলো। তাঁর অসহায়ত্ব, সীমাবদ্ধতা, রাগ-অনুরাগ, তাপ-অনুতাপ; সবকিছু একীভূত হয়ে সমর্পিত হয় সেই স্বত্তার প্রতি। আশা-আকাংখার দুলাচলে ফকির তাঁর নির্দিষ্ট গন্তব্যের দিকে এগিয়ে চলেন।
এবার আত্মমগ্ন হয়ে শুনি ফকির আদিল শাহ’র আরো একটি গান-
আল্লাহ ছবুর করলাম সার
বুঝিতে না পারি আল্লাহ কুদরতও তোমার।।
দিনের ভিক্ষায় দিন চলেনা ক্ষুদায় অঙ্গ জ¦লে
বস্ত্র নাই শীতে কাতর ধরমু কার গলে।
ঘর ভাঙ্গা, দুয়ার ভাঙ্গা, আরও ভাঙ্গা বেড়া
আঁখি মেইলা চাইয়া দেখি আসমানেরও তারা।। ঐ
ইষ্টি-কুটুম, ভাই-বেরাদ্দর সবই হইলো বৈরী
এই দু:খে আর প্রাণ বাঁচেনা যাইমু কার বাড়ি।
কি কলম মারিলায় আল্লাহ কপালে আমার
বৃদ্ধকালে ফিরাইলায় সকলের দুয়ার।। ঐ
আমার মত দিনদুঃখী আর এই জগতে নাই
মনের দুঃখ রইলো মনে বলবো কার ঠাঁই।
ফকিরও আদিল শাহ কয় হইয়া লাছাড়
না জানি কি হইবে আমার কয়বরের মাজার।। ঐ
কিন্তু অবস্থা এখন এমনই বিস্মৃত এক নাম যেন আদিল শাহ; অনেকটা উত্তরসূরীদের উদাসীনতা আর সংরক্ষণের অভাবে তাঁর অনেক গানই আজ কালেরগর্বে হারিয়ে গেছে। তবুও সংখ্যায় অধিক না হলেও তাঁর কালউত্তীর্ণ কিছু গান এখনো ঠিকে আছে। এখানে ফকির আদিল শাহ’র জন্ম-মৃত্যুর তারিখ আমরা জানি না; তবে এটা নিশ্চিত যে তিনি ছিলেন আমাদের ডুংরিয়া গ্রামেরই সন্তান। এই মানুষটি শুয়ে আছেন মরমী আরেক কবি হাছন রাজার পাশাপাশি এবং একই কবরস্থানে। মরমী এই দুই কবির স্মৃতির প্রতি জানাই গভীর শ্রদ্ধা।
০৫.০৯.২০১৯খ্রি: