মৃৎশিল্পেও করোনার ধাক্কা, আদি পেশা থেকে ছিটকে পড়ছে জামালগঞ্জের পাল সম্প্রদায়

বিশ্বজিত রায়, জামালগঞ্জ
আর ক’দিন পরেই মনসা পূজা। হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের উল্লেখযোগ্য পুজোৎসবের মধ্যে মনসা পূজা অন্যতম। এ পুজো এলেই মৃৎশিল্পীদের ব্যস্ততা বেড়ে যায়। কিন্তু এবারকার দৃশ্যপট সম্পূর্ণ ব্যতিক্রম। কারণ প্রতিমা তৈরির কারিগরদের ওপর লেগেছে করোনার ধাক্কা। গোটা মৃৎশিল্পী সম্প্রদায়ের অল্পসংখ্যক মানুষ যখন নিজেদের আদি পেশা টিকিয়ে রাখতে হিমশিম খেয়ে যাচ্ছেন তখন করোনা ভাইরাসের প্রাদুর্ভাব নতুন করে সঙ্কটে ফেলে দিয়েছে তাদের। এবারকার মনসা পূজায় অনেকটা কমে গেছে মৃতশিল্পীদের প্রতিমা তৈরির ব্যস্ততা। বছরের কয়েকটা পুজোর মৌসম কোনো রকম তাদের রুটিরুজির পথ করে দিলেও এবার বৈশ্বিক সমস্যা করোনা প্রতিমা কারিগরদের উভয় সঙ্কটে ফেলে দিয়েছে।
এমনিতেই আবহমান বাংলার ঐতিহ্যের অংশ গ্রামীণ মেলা গ্রামগঞ্জ থেকে প্রায় বিলুপ্ত হওয়ায় মাটির তৈরি বিভিন্ন তৈজসপত্র ও খেলনা বিক্রির পথ রুদ্ধ হয়ে গেছে তাদের। তাই আদি পেশা পরিবর্তন করে অন্যভাবে জীবিকা নির্বাহ করার চেষ্টা করছেন পাল সম্প্রদায়ের অধিকাংশ মানুষ। যেও দু’একজন এ পেশায় টিকে থাকার সংগ্রাম চালিয়ে যাচ্ছেন তারাও করোনার প্রভাবে চিন্তিত হয়ে পড়েছেন। পেশা বিপন্ন পরিস্থিতিতে সরকারি প্রণোদনার আওতায় নিয়ে আসার জোর দাবি জানিয়েছেন তারা।
মৃৎশিল্পী কয়েকজনের সাথে কথা বলে জানা যায়, এটা তাদের আদি পেশা। বংশ পরম্পরায় অল্পসংখ্যক মানুষ এখনও কর্দম মাটিকে নান্দনিক রূপদান করে যাচ্ছেন তারা। গ্রামবাংলার ঐতিহ্যবাহী মেলা সংকুচিত হওয়াসহ বাজারে প্লাস্টিক বস্তুর কদর বেড়ে যাওয়ায় কমে গেছে তাদের তৈরি জিনিসপত্রের চাহিদা। এইতো দুই দশক আগেও বাংলার ঘরে ঘরে মাটির কারুকাজ সম্বলিত তৈজসপত্র বহুল ব্যবহৃত হলেও এখন তার পুরোটাই উল্টো। তাই পাল সম্প্রদায়ভুক্ত অধিকাংশ মানুষ পেশা পরিবর্তন করেতে বাধ্য হয়েছেন। তাদের মধ্যে দু’চারজন যারা আছেন তারাও নানাভাবে সমস্যার সম্মুখীন হচ্ছেন। এ অবস্থায় বাঙালির ঐতিহ্য ও কৃষ্টির অংশ পাল পেশাটি টিকে থাকার দৌড়ে পিছিয়ে পড়ছে। ঐতিহ্যের ধারক ও বাহক এ পেশাটিকে টিকিয়ে রাখতে হলে সরকারি সাহায্য সহযোগিতা অপরিহার্য বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টজন।
প্রতিমায় রঙতুলিতে ব্যস্ত জামালগঞ্জ উত্তর ইউনিয়নের সাচনা (পাল হাঁটি) গ্রামের ধনঞ্জয় পালের ছেলে তরুণ মৃৎশিল্পী দীপংকর পাল বলেন, ‘গতবার আমরা দুই জাগায় মিলিয়ে ২৫০’র বেশি মূর্তি বানিয়েছি। এবার মাত্র ১০০টি মূর্তি তৈরি করা হয়েছে। করোনার জন্য তাও বিক্রি করতে পারব কি না সন্দেহ আছে। আগে এই হাঁটির অন্ততঃ ২০ জনে মূর্তি তৈরি করত। এখন একমাত্র আমরাই আছি। অন্যরা এই পুরোনো পেশা ছাইড়া অন্য কাজে চইলা গেছে। কারণ এ পেশায় এখন টিকে থাকার মতো পরিবেশ নাই।’
ধনঞ্জয় পাল বলেন, ‘এই কাজ বাপ-দাদায় কইরা আইছে বিধায় এখনও লাইগা আছি এ কাজে। আমাদের পূর্বপুরুষরা মাটির মূর্তি, হাড়ি-পাতিল, খেলনা বানাইয়া জীবন চালাইয়া গেলেও আমরা আর পারতাছি না। অনেকেই অপারগ হইয়া এই পেশাডাই ছাইড়া দিছে। এর মাঝে এইবার করোনা দিছে আরও চিন্তার মধ্যে ফালাইয়া। করোনা ভাইরাসের লাগি কম কইরা মনসা মূর্তি বানাইছি, মনে হয় সবগুলো বেচন যাইতো না। এরপরে আইতাছে দুর্গা পূজা। এই পূজাতেও কতডা লাভ হইব তারও অনিশ্চিত। মোটকথা এই পেশাডাই এখন অনিশ্চিতের মধ্য দিয়া চলতাছে। আমরার টিইক্কা থাকতে সরকারি সহযোগিতা খবুই দরকার।’
একই গ্রামের ভিন্ন পেশায় চলে যাওয়া গিরীন্দ্র পালের ছেলে লোকেশ পাল জানিয়েছেন, এ পেশায় এখন টিকে থাকা দায়। নরম মাটিতে হাত লাগিয়ে প্রতিমা বানানো সম্ভব। কিন্তু এতে নির্ভর করে জীবিকা নির্বাহ করা অসম্ভব। তাই বাধ্য হয়ে বাজারে ছোটখাটো একটা দোকান দিয়ে ব্যবসার মধ্যে ঢুকে পড়েছি।’