আধুনিক সড়ক ব্যবস্থাপনাই দুর্ঘটনা রোধের উপায়

অবশেষে সড়ক পরিবহন সেক্টরের কর্তা ব্যক্তিরা তাদের অযৌক্তিক ধর্মঘট প্রত্যাহার করে সাধারণ মানুষকে অবর্ণনীয় দুর্ভোগ যন্ত্রণা থেকে রেহাই দিয়েছেন। গত তিন দিন আক্ষরিক অর্থেই সারা বাংলাদেশের মানুষের নাভিশ্বাস উঠে গিয়েছিল। জরুরি প্রয়োজনে কেউ বাইরে যেতে পারছিলেন না। এই তিন দিনের পরিবহন ধর্মঘটের কারণে অর্থনীতির ক্ষতির অংকটা বিশাল। কত কোটি শ্রমঘণ্টা নষ্ট হয়েছে এই ধর্মঘটে তার হিসাব মিলানোর কোন সংস্কৃতি নেই আমাদের দেশে। হিসাব করলেই অপচয়ের টাকার অংকটা জানা যেত। তবে অবশেষে যে পরিবহন নেতৃবৃন্দ সদয় হয়েছেন তাতে আমরা খুশি। তাদেরকে অশেষ ধন্যবাদ। পরিবহন ধর্মঘটের কারণে যাত্রীদের অশেষ দুঃখ যন্ত্রণার কিছু চিত্র উঠে এসেছে সোমবারের দৈনিক সুনামগঞ্জের খবরে। বিভিন্ন শ্রেণি পেশার মানুষ সংকটে পরেছিলেন এই ধর্মঘটে। অথচ হঠাৎ করে এরকম একটি ধর্মঘট ডাক দেয়ার কোন যুক্তিসংগত কারণ ছিল না। নিরাপদ সড়কের দাবিতে গড়ে উঠা শিক্ষার্থী আন্দোলনকে নিজেদের নিরাপত্তার জন্য হুমকি বিবেচনা করে তারা গাড়ি চালানো বন্ধ রেখেছিলেন। কিন্তু এই আন্দোলনে শিক্ষার্থীরা কোন ধরনের সহিংসতার আশ্রয় নেয়নি। বিচ্ছিন্ন যে কয়েকটি ঘটনা ঘটেছে তা অতি মামুলী, যা জাতীয়ভাবে সকল ধরনের পরিবহন বন্ধ করে দেয়ার পক্ষে কোন যুক্তিই হতে পারে না। জনগণ যখন-তখন পরিবহন ধর্মঘট আহ্বানের মাধ্যমে জনসাধারণকে ভোগান্তিতে ফেলে দেয়ার এই সংগঠিত নৈরাজ্যের স্থায়ী প্রতিকার কামনা করেন। কিন্তু চাইলেই কী সব হয়ে যাবে?
সোমবার মন্ত্রী পরিষদে জাতীয় পরিবহন আইন ২০১৮ এর খসড়া অনুমোদন করা হয়েছে। এই আইনটি শীঘ্রই জাতীয় সংসদের মাধ্যমে আইনে পরিণত হতে যাচ্ছে। যতটুকু জানা যায়, এই আইনে ইচ্ছাকৃত দুর্ঘটনার মাধ্যমে কাউকে খুন করা হলে দ-বিধির ৩০২ ধারায় সর্বোচ্চ মৃত্যুদ- দানের বিধান থাকছে। অন্যান্য ক্ষেত্রেও অনুরূপ শাস্তির বিধান রাখা হয়েছে। এই রকম আইনের দাবি ছিল বেশ কয়েক বছর ধরে। কিন্তু পরিবহন সেক্টরের সংঘবদ্ধ শক্তিমত্তার কারণে সরকার এরকম কঠোর আইন প্রণয়ন করতে পারছিলেন না। কিশোর শিক্ষার্থীরা সরকারকে এই আইন তৈরির একটি সুযোগ এনে দিলেন, এজন্য নিশ্চয়ই তারা অনাগত কাল ব্যাপী অভিনন্দিত হবেন। কিন্তু আমাদের প্রশ্ন হলো, শুধুই একটি আইন কি দীর্ঘদিন যাবৎ সড়কে গড়ে উঠা অনিয়ম, উশৃঙ্খলতা বন্ধ করে দিতে সক্ষম হবে? আইনের সাথে আইন প্রয়োগের বিষয়টি গভীরভাবে সম্পর্কিত। বাংলাদেশে বহু ভাল ভাল আইন আছে যার কোন প্রয়োগ নেই। ফিটনেসবিহীন গাড়ি, লাইসেন্সবিহীন চালক, অপ্রাপ্তবয়স্ক চালক; ইত্যাদি বিষয়ে বর্তমান আইনে অনেক সুন্দর বিধি বিধান রয়েছে। কিন্তু এই আইন থাকার পরেও দেশের অর্ধেক যানবাহনের কোন রেজিস্ট্রেশন সনদপত্র নেই। অনুরূপ অবস্থা চালকের ক্ষেত্রেও। সুতরাং নির্দ্ধিধায় যে কথাটা বলা যায় আইন প্রণয়নের সাথে সাথে আইনটি যাতে যথাযথভাবে প্রয়োগ হয় সেটিও সমান গুরুত্ব দিয়ে নিশ্চিত করতে হবে।
গাড়ি ও চালকের বাইরেও নিরাপদ সড়কের জন্য আরও বহু বিষয় নিশ্চিত করতে হবে। রাস্তাকে যেমন আধুনিক করতে হবে তেমনি রাস্তায় মাত্রাতিরিক্ত যানবাহনের চাপও কমাতে হবে। জনসাধারণকে ট্রাফিক আইন মেনে পথ চলার ব্যাপারে বাধ্য করতে হবে। সড়ক দুর্ঘটনার জন্য সবক্ষেত্রে শুধু চালকই দায়ী এমন নয়। পথচারীরাও বেপরোয়া পথ চলতে যেয়ে দুর্ঘটনার শিকার হন। যানবাহন নিয়ন্ত্রণের সাথে জড়িত সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো থেকে দুর্নীতিকে ঝেটিয়ে বিদায় এবং এই খাতকে রাজনৈতিক প্রভাব মুক্ত করাটাও অত্যাবশকীয় আরেক কাজ বটে। অর্থাৎ আধুনিক সড়ক ব্যবস্থাপনাই হতে পারে দুর্ঘটনা রোধের প্রকৃত উপায়।