আনন্দবাজারের ‘খয়রাতি’ ও আমাদের কতিপয়ের পুরনো রোগের আবির্ভাব

কলকাতার আনন্দবাজারের একটি সংবাদ নিয়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম এমনকি গণমাধ্যম খুব সরব হয়ে উঠেছে। করোনা পরিস্থিতির মধ্যে একই ধরনের খবর, বিশ্লেষণ শুনতে শুনতে তিতিবিরক্ত মানুষ যেন আনন্দবাজারের এই সংবাদে স্বাদ বদলের সুযোগ পেলেন। কী ছিল আনন্দবাজারের এই সংবাদে? সংক্ষিপ্ত ভাবে বলতে গেলে আনন্দবাজার ওই সংবাদে বাংলাদেশের মর্যাদা হানিকর কিছু শব্দ ব্যবহার করেছে যা একই সাথে সুশীল সাংবাদিকতা ধর্মের প্রেক্ষিতেও চরম অশোভনীয়। ভারতীয় ইউনিয়নের অন্তর্গত লাদাখে চীন-ভারত সংঘাতের পর ভারতের অভ্যন্তরে চীন বিরোধী মনোভাব তুঙ্গে উঠেছে। চীন বহুদিন ধরে উপমহাদেশের ভারত ছাড়া অপরাপর দেশকে কাছে টানতে চাইছে। পাকিস্তান তো আগেই ছিল চীনের। এখন নেপাল শ্রীলঙ্কাও ঝুঁকে পড়েছে চীনের দিকে। বাংলাদেশ যদি চীনাভিমুখী যাত্রা শুরু করে তাহলে তা চীনের জন্য হবে সোনায় সোহাগা। ভারতকে চারদিক দিয়ে ঘেরাও করে কাবু করা সহজ হবে।
করোনা ভাইরাসের কারণে চীন এখন বিশ্বব্যাপী আলোচিত সমালোচিত। বিশ্বব্যাপী করোনার বিস্তারে চীনের অবহেলাকে দায়ী করা হচ্ছে আমেরিকাসহ আমেরিকান ব্লক থেকে। বিশ্বব্যাপী চীনের বাণিজ্য আধিপত্য এ কারণে হুমকির সম্মুখীন হয়েছে। করোনা ভাইরাসের উৎপত্তি সম্পর্কে জানতে চীনে আন্তর্জাতিক তদন্ত পরিচালনার দাবি উঠেছে। সেই চাপ সামাল দিতে তথা ভাইরাস সংযোগ থেকে নিজের দায়দায়িত্ব এড়াতে চীন এখন নানান কৌশল অবলম্বন করবে। লাদাখে ভারতীয় সেনাদের উপর স্পাইকযুক্ত লোহার রড দিয়ে বর্বর আক্রমণ ওই কৌশলের অংশই হতে পারে। অন্যদিকে আপাতদৃষ্টিতে ভারতের প্রতি হেলে থাকা বাংলাদেশ সরকারকে নিজের পক্ষে টানার কূটনৈতিক প্রচেষ্টাও শুরু করেছে চীন। সম্প্রতি চীন তার বাজারে কিছু বাংলাদেশি পণ্যের শুল্কমুক্ত প্রবেশাধিকার দেয়ার ঘোষণা দেয়। আমরা জানি না চীন বাংলাদেশ থেকে ঠিক কোন জিনিস কত পরিমাণে আমদানি করে। এদিকে সোমবারই চীনা রাষ্ট্রদূত ঘোষণা দিলেন করোনার টিকা আবিষ্কৃত হলে তারা অগ্রাধিকার ভিত্তিতে বাংলাদেশকে সরবরাহ করবে। এ যেন গাছে কাঁঠাল আর গোফে তেল অবস্থা। অন্যদিকে বেশ কিছুদিন অবস্থান করে চৈনিক করোনা বিশেষজ্ঞরা অনেক নসিহত করে রবিবার বাংলাদেশ ছেড়েছেন। এই সবকিছুই বাংলাদেশকে কাছে টানার কূটনৈতিক তৎপরতা। আর এই বিষয়গুলোই আনন্দবাজারের গাত্রদাহের কারণ হয়েছে। তারা তাদের কথিত রিপোর্টে বলে বসল, !বাণিজ্যিক লগ্নি আর খয়রাতির টাকা ছড়িয়ে বাংলাদেশকে পাশে পাওয়ার চেষ্টা নতুন নয় চিনের।” এই বাক্যের “খয়রাতি” শব্দটিই বাংলাদেশে ব্যাপক প্রতিক্রিয়া তৈরি করেছে। এই রিপোর্টটি চরম নিন্দনীয়। যেকোনো বাংলাদেশি মাত্রই আহত হবেন এমন শব্দবাণে। কিন্তু বাংলাদেশে প্রতিবাদের ধারাটি লক্ষণীয়ভাবে আনন্দবাজারের সংবাদ ও সংবাদে শব্দের অপপ্রয়োগ প্রসঙ্গ ছাড়িয়ে চলে গেছে সস্তা ভারত বিরোধিতায়। বাংলাদেশে ভারত বিরোধী জিকির নতুন কিছু নয়। এই জিকির তুলে নির্বাচনে জিতে আসার কুশেশও দেখেছি আমরা। সেই সহজাত ভারত বিরোধীরাই বেশি সরব। তারা গঠনমূলক সমালোচনা ভুলে আগের মতই অন্ধ ভারত বিরোধিতায় নেমেছেন। তারা আনন্দবাজার ও ভারত রাষ্ট্রকে একই কাতারে নামিয়ে এনেছেন। যেন আনন্দবাজারের কথাই ভারতের কথা। এই জায়গায় আনন্দবাজারের উদ্দেশ্যও প্রশ্নবিদ্ধ হয়। ভারত-বাংলাদেশ ঐতিহাসিক সুসম্পর্কের এই সময়ে এবং চীনের করোনা বিপাক কালে তারা কেন এমন একটি সংবাদ ছেপে বাংলাদেশে অন্ধ ভারত বিরোধিতার সুযোগ করে দিল? যদিও আনন্দবাজার সম্পাদক এই সংবাদের জন্য বাংলাদেশি সাংবাদিক নেতৃত্বের নিকট মৌখিক দুঃখ প্রকাশ করেছেন, তবুও ক্ষতি যা করার তারা করে দিয়েছেন। এখন গরু মেরে জুতা দানের কোনো অর্থই হয় না। আনন্দবাজারের উদ্দেশ্য নিয়েও কথাবার্তা চালাচালি তাই প্রয়োজন।
তবে বাংলাদেশের মানুষ এখন আগের মতো হুজুগপ্রবণ নয়। চিলে কান নিল বলে চিলের পিছনে কেউ দৌঁড়ায় না, হাত দিয়ে দেখে কানটা জায়গা মতো আছে কিনা। মানুষ বুঝে ভারত যেমন কারণ ছাড়া কোন সুবিধা দেয় না চীনও তেমনি দাতা হাতেমতাই হয়ে কিছু দিবে না। এবং বাংলাদেশও এই কূটনৈতিক কৌশলের বাইরে থাকে না। জাতীয় স্বার্থে সিদ্ধান্ত গ্রহণের যথেষ্ট সামর্থ রাখে আমাদের প্রিয় দেশটি। এখানে ভারতের কোনো একটি আঞ্চলিক পত্রিকার নিম্নমানের সংবাদ প্রতিবেদন কোনো প্রভাব ফেলতে সক্ষম নয়। বাংলাদেশেও বহু পত্রিকার অভব্য ভারত বিরোধিতার প্রতিযোগিতা আমরা প্রত্যক্ষ করেছি অতীতে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে এখন যেমন দেখছি।