আনন্দমুখর পরীক্ষা

গোলাম সরোয়ার লিটন
তাহিরপুর উপজেলার দুর্গম হাওরাঞ্চলে প্রাথমিক শিক্ষা সমাপনী পরীক্ষার জন্য এ বছর নতুন ৫টি কেন্দ্র ও ২টি ভেন্যু স্থাপন করা হয়েছে। পিইসি পরীক্ষার পুরাতন কেন্দ্র ছিল ১১ টি। নতুন কেন্দ্র নিয়ে মোট কেন্দ্র হয়েছে ১৬টি আর ভেন্যু ২টি। দুর্গম হাওরাঞ্চলে নতুন কেন্দ্র স্থাপন করায় হাওরপাড়ের গ্রামে অবস্থিত বিদ্যালয়গুলো থেকে ছাত্রছাত্রীদের প্রাথমিক শিক্ষা সমাপনী পরীক্ষায় অংশগ্রহণ সহজ ও আনন্দময় হয়েছে। ২০০৯ সাল থেকে এ দাবি থাকলেও দীর্ঘদিনেও বাস্তবায়ন না হওয়ায় দুর্ভোগে ছিলেন উপজেলার হাওরপাড়ের বিপুল সংখ্যক পরীক্ষার্থী। এ বছর তাহিরপুর উপজেলায় মোট ৩৬৪২ জন পরীক্ষার্থী প্রাথমিক শিক্ষা সমাপনী পরীক্ষায় অংশ নিচ্ছে।
জানা যায়, প্রতি বছর প্রাথমিক শিক্ষা সমাপনী পরীক্ষা শুরু হয় নভেম্বর মাসের মাঝামাঝি সময়ে । ওই সময় হাওরের পানি শুকাতে শুরু করায় সুনামগঞ্জে হাওরাঞ্চলে যাতায়াত ব্যবস্থা দুর্গম হয়ে ওঠে। যোগাযোগ ব্যবস্থা হয়ে ওঠে ‘না নাও, না পাও’। এমন অবস্থায় দুর্ভোগে ছিলেন প্রাথমিক শিক্ষা সমাপনী পরীক্ষায় অংশগ্রহণকারী হাওরপাড়ের ৫০টি বিদ্যালয়ের ছাত্রছাত্রী, শিক্ষক ও অভিভাবকরা।
উপজেলার দক্ষিণ শ্রীপুর ইউনিয়নের শনির হাওরপাড়ে অবস্থিত রামজীবনপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়। বিদ্যালয়টি থেকে প্রাথমিক শিক্ষা সমাপনী পরীক্ষা কেন্দ্র টাঙ্গুয়ার হাওরপাড়ে অবস্থিত মোয়াজ্জেমপুর উচ্চ বিদ্যালয়ের দূরত্ব ২০ কিলোমিটার। এইটুকু পথের ১৫ কিলোমিটার যেতে হয় নৌকায় আর বাকীটুকু পাঁেয় হেঁটে। এজন্য শিক্ষক ও অভিভাবকদের ভোরে ছাত্রছাত্রীদের নিয়ে কেন্দ্রের উদ্দেশ্যে যাত্রা করতে হয়। এ সকল পরীক্ষার্থী পরীক্ষা শেষে করে বাড়ি আসতে সন্ধ্যা ঘনিয়ে আসে। ২০০৯ সাল থেকেই এভাবেই যাতায়াত করে প্রাথমিক শিক্ষা সমাপনী পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করে থাকে রামজীবনপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ছাত্রছাত্রীরা । একইভাবে ইউনিয়নের শাহাগঞ্জ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, পৈন্ডুব সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, নোয়ানগর ইক্রামপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, গোপীনাথ- নোয়াগাঁও সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, শ্রীপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, আনন্দনগর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, সুলেমানপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, পাঠাবুকা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, সুলেমানপুর মাদ্রাসার ছাত্রছাত্রীদেরও মোয়াজ্জেমপুর উচ্চ বিদ্যালয় পরীক্ষা কেন্দ্রে যাতায়াতে এমন দুর্ভোগে ছিলেন। ছাত্রছাত্রীদের দুর্ভোগ লাঘবে নতুন কেন্দ্র স্থাপনের দাবি ছিল ২০০৯ সালে সমাপনী পরীক্ষা চালু হওয়ার পর থেকেই। ছাত্রছাত্রী ও অভিভাবকদের মধ্যে এ নিয়ে ক্ষোভ থাকলেও নতুন কেন্দ্র স্থাপনের দাবি বাস্তবায়ন হয়নি ১০ বছরেও। চলতি বছর মার্চ মাসে উপজেলা শিক্ষা অফিস নতুন ৫টি কেন্দ্র স্থাপনের উদ্যোগ নেয়। আর শিক্ষা অফিসের এই উদ্যোগে সাড়া দিয়ে উপজেলা পরিষদ, উপজেলা প্রশাসন, উপজেলা শিক্ষা কমিটির সভায় তা সর্বসম্মতিক্রমে পাশ করে। এবং জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসের কার্যকর উদ্যোগে জেলা প্রশাসন তা অনুমোদন করে। আর জেলা প্রশাসনের অনুমোদনের পর প্রস্তাবটি প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তর বাস্তবায়ন করেছে।
রামজীবনপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক অজয় কুমার সরকার বলেন, দীর্ঘদিন পর এ বছর বিদ্যালয়টির শিশুরা খুশি মনে পরীক্ষার জন্য ঘর থেকে বের হয়েছে। দুর্গম ২০ কিলোমিটার দূরত্ব অতিক্রম করে প্রতিদিন পরীক্ষায় অংশ নেওয়া ছিল সত্যিই কষ্টকর।
উপজেলার দক্ষিণ বড়দল ইউনিয়নের টাকাটুকিয়া গ্রামের বাসিন্দা টাকাটুকিয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ছাত্র অভিভাবক সন্জু চৌধুরী বলেন, গত বছরও পিইসি পরীক্ষা কেন্দ্র ছিল ২০ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত কাউকান্দি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে। এ বছর বড়দল কেন্দ্র হওয়ায় আমি স্বস্থিতে আছি আমার ছেলেও আনন্দিত মনে পরীক্ষা দিচ্ছে।
উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষক সমিতির সভাপতি ও পাঠাবুকা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক অজয় কুমার দে বলেন, নভেম্বর মাসে হাওরাঞ্চলে যাতায়াত আরো দুর্গম হয়ে ওঠে। দীর্ঘদিন পর নতুন কেন্দ্র স্থাপন করে শিশুদের শারীরিক কষ্ট লাঘব হওয়ায় মানসিক আনন্দ বেড়েছে। এজন্য কর্তপক্ষকে আন্তরিক ধন্যবাদ জানাচ্ছি।
দক্ষিণ শ্রীপুর ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান বিশ^জিত সরকার বলেন, নতুর কেন্দ্র স্থাপনের মধ্য দিয়ে দীর্ঘদিন ধরে চলা পিইসি পরীক্ষায় অংশগ্রহণকারী কোমলমতি ছাত্রছাত্রীদের দুর্ভোগ কমেছে। এজন্য আমি বিশেষভাবে ধন্যবাদ জানাই উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তাকে।
উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তা আকিকুর রেজা খান বলেন, দুর্গম যাতায়াতের কারণে নতুন কেন্দ্র স্থাপন করা প্রয়োজন ছিল। কর্তৃপক্ষের সার্বিক সহযোগিতায় নতুন ৫টি কেন্দ্র স্থাপনের কারণে ছাত্রছাত্রীদের সমাপনী পরীক্ষায় অংশগ্রহণ আরো সহজ ও আনন্দময় হয়েছে।
তাহিরপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) বিজেন ব্যানার্জী বলেন, প্রাথমিক শিক্ষা সমাপনী পরীক্ষার্থী ছাত্রছাত্রীরা যাতে সহজে, নির্ভয়ে আর আনন্দময় পরিবেশে পরীক্ষা দিতে পারে সেজন্য করণীয় সব ধরণের চেষ্টাই উপজেলা প্রশাসন করেছে। হাওরবেষ্টিত এ উপজেলায় নতুন পরীক্ষা কেন্দ্র ছাত্রছাত্রীদের যাতায়াতের দুর্ভোগ কমিয়ে দিয়েছে।
তাহিরপুর উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান করুণা সিন্ধু চৌধুরী বাবুল বলেন, সমাপনী পরীক্ষার নতুন কেন্দ্র স্থাপন হাওরপাড়ে অবস্থিত বিদ্যালয়গুলোর দীর্ঘদিনের দাবি। নতুন কেন্দ্র স্থাপনের মধ্যে দিয়ে তাদের দাবির বাস্তবায়ন হয়েছে।