আফালের তাণ্ডব এবার জ্যৈষ্ঠের শুরুতেই

বিশেষ প্রতিনিধি
‘বাতাস দিলেই ডর (ভয়) শুরু অয়, পাগলা ও জলসি থাইক্কা ঢেউ ওঠে, ১০ মাইল দূর আইয়া আমার বাড়িত লাগে, আর আর বছরতো কুকরা বন, ছাইল্লা বন, দেওবন পাওয়া যাইতো, ইবার পানি হঠাৎ আওয়ায় বন পাওয়া গেছে না, কোন লাখান বাঁশের আড় বাইন্দা, জার্মুনি (কচুরিপানা) দিয়া আটকানির চেষ্টা কররাম, এরপরেও ঘরের ভিতরে ভাইঙ্গা হামাইজার।’
সুনামগঞ্জ সদর উপজেলার মোল্লাপাড়া ইউনিয়নের দেখার হাওরপাড়ের ফতেহপুর গ্রামের হাবিজুল ইসলাম ঢেউয়ের আঘাতে বাড়ি ভেঙে যাবার কষ্টের কথা এভাবেই জানাচ্ছিলেন। হাওরে ঢেউকে ভাটির মানুষ ‘আফাল’ হিসাবেই চিনেন। হাওরে পানি বেশি হলে আফালে বসতঘর পর্যন্ত আঘাত করে। পানি কমলে বাড়ির ভিটেমাটি ভাঙে। এবার আফালের তা-বে বসতঘর পর্যন্ত ভাঙা শুরু হয়েছে। আফালের তা-ব সাধারণত জ্যৈষ্ঠের ২০ তারিখ থেকে হাওর এলাকায় শুরু হয় এবং আষাঢ়-শ্রাবণ মাস পর্যন্ত থাকে। এবার পানি জ্যৈষ্ঠের শুরুতে ছাতক, দোয়ারা এবং সুনামগঞ্জ সদর উপজেলায় বেশি হওয়ায় আফালের তা-বও এসব এলাকার হাওরে জ্যৈষ্ঠের প্রথম থেকেই শুরু হয়েছে।
ফতেহপুর গ্রামের নজরুল ইসলাম বললেন, ‘আমার টিনের বেড়া, টিনের চালের ঘর, নীচ পাকা, ঘরের এক কোঠার মাটি আফালে তলে তলে খুইদ্দা নিছেগি, ই-ঘরের সবতা সরাইয়া রাখছি, ই-কোঠার দরজাঔ খুলরাম না। আমার হাইরের (পাশের) বাড়ির অর্ধেক উঠান ঢেউয়ে ভাইঙ্গা নিছেগি।’
হাওরে পানি বেশি হলে এমন কষ্ট কেবল নজরুল কিংবা হাবিজুলের বাড়িতে নয়। হাওরপাড়ের অনেক গ্রামের মানুষকেই দুর্ভোগে পড়তে হয়। এবার বন্যার পানি দ্রুত এসেছে, দেরিতে নামছে, এজন্য কষ্ট আরও বেশি হচ্ছে।
দেখার হাওরপাড়ের নজরুল ইসলাম জানালেন, ফতেহপুরের ৫০ টি বাড়ি আফালের তা-বে এবার ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। অথচ পাশের মোল্লাপাড়া মাদ্রাসার সেতু থেকে রিফাত মিয়ার বাড়ি এবং রিফাতের বাড়ি থেকে আজাদুল ইসলামের বাড়ি পর্যন্ত ১০০০ ফুট সড়ক করলেই এই কষ্ট থেকে রক্ষা পাওয়া যাবে।
এই হাওরপাড়ের রহমানপুর গ্রামের আব্দুল হান্নান জানালেন, এবার পাহাড়ী ঢলের পানি দোয়ারাবাজারের আজবপুর বেরীবাঁধ ভেঙে নোয়াগাঁও খাল দিয়ে ঢুকেছে। এই ঢলের কারণে হাওরের বনবাদালিও ভাসিয়ে নিয়ে গেছে। তিনি জানান, এবার ঢেউয়ের বা আফালের তা-বে রহমানপুর ও রতনপুরের ৭০ টি বাড়ি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এখন ঢেউয়ে রহমানপুর রতনপুর মসজিদও ভেঙে যাচ্ছে। এছাড়া গ্রামের বাসিন্দা ইউপি সদস্য আবুল হোসেন, আব্দুর রহিম, জাহাঙ্গীর আলম, মনফর মাস্টার ও ইদ্রিছ মাস্টারের বাড়িও বেশি ভেঙেছে।
স্থানীয় ইউনিয়ন পরিষদ সদস্য আবুল হোসেন জানালেন, মোল্লাপাড়া ইউনিয়নের ফতেহপুর ছাড়াও রতনপুর, রহমানপুর, ভবানীপুর, জালালপুর, গুয়াছুড়া, রৌয়ারপাড়, দরিয়াবাজ, আব্দুল্লাপুর গ্রাম আফালের তা-বে ক্ষতিগ্রস্ত হয় বেশি।
তিনি জানালেন, হাওরে পানি বেশি হলে ঘরে থাকতে ভয় হয়, কারণ ঢেউয়ে তখন বসতঘর ভাঙে। এবার কয়েক বছরের মধ্যে বসতঘর ভাঙার পানি হয়েছে।
সুনামগঞ্জ শহরতলির হাছনবসত এলাকার বাসিন্দা রফিক মিয়া বললেন, ‘বাতাস দিলে ডর লাগে, পানির হাম হাম শব্দ অয়, ঘর থাকন দায় অয়।’
রফিক মিয়া জানালেন, হাছনবসত, কালীপুরের যাদের ঘরবাড়ি হাওরের পাড়ে তারা সকলেই এই কষ্টে আছে।
সুনামগঞ্জের শাল্লা ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান প্রবীণ কৃষক আব্দুছ ছাত্তার বললেন, হাওরে আফাল যন্ত্রণা শুরু হয় জ্যৈষ্ঠের ২০ তারিখ থেকে। এই যন্ত্রণা আষাঢ-শ্রাবণ মাস পর্যন্ত থাকে। হাওরপাড়ের বাসিন্দাগণ ওই সময় আফালের তা-ব থেকে বাড়ি রক্ষার যুদ্ধ করেন। এবার কিছু এলাকায় আগে ভাগে বেশি পানি হওয়ায় এসব এলাকার মানুষ আগে আফালের সঙ্গে যুদ্ধ করতে হচ্ছে।
সুনামগঞ্জ এলজিইডি’র নির্বাহী প্রকৌশলী মাহবুব রহমান বললেন, হাওরের ঢেউ থেকে গ্রাম সুরক্ষায় কাজ করে থাকে এলজিইডি। ভবিষ্যতে গ্রাম সুরক্ষায় নতুন প্রকল্প যখন হবে। এবারের বন্যার অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে হাওরপাড়ের বড় গ্রামগুলোর সুরক্ষার বিষয়টি প্রকল্প প্রস্তবানায় রাখা হবে।