আবরার হত্যাকাণ্ডের প্রেক্ষিতে কিছু আত্মজিজ্ঞাসা

কোনো সমাজ বা রাষ্ট্রেরই শতভাগ অপরাধমুক্ত থাকার সম্ভাবনা নেই। মানবসভ্যতা শুরুর সাথে সাথেই অপরাধবৃত্তির জন্ম। সম্পদের উপর ব্যক্তির মালিকানা যখন প্রতিষ্ঠিত হলো তখন সেই সম্পদের মালিকানা ও দখলিকরণ কায়েম করতে যেয়ে কিছু মানুষ ব্যাপকভাবে অপরাধবৃত্তির সাথে জড়িত হয়ে পড়ে। এরা ক্রমে শক্তিশালী হয়ে উঠে। এই শক্তিমান দৃর্বৃত্তদের দ্বারা সাধারণ মানুষের নানাভাবে অত্যাচারিত হওয়ার বাস্তবতা আরেকটি সামাজিক উপসর্গ হিসাবে প্রতিষ্ঠা পেয়ে যায়। মানুষের সভ্যতা এগিয়েছে। এর সাথে অপরাধপ্রবণতারও বৈশিষ্ট্য, মাত্রা কিংবা প্রকারগত প্রভেদ ঘটেছে বহু। সভ্যতার অগ্রযাত্রায় মানুষ নিজেদের অনেক বেশি নিয়ম-শৃঙ্খলার মধ্যে আবদ্ধ করেছে। গড়ে তুলেছে সামাজিক প্রতিষ্ঠান, আইন-কানুন, রাষ্ট্র ইত্যাদি। সভ্য সমাজের একটি প্রধান লক্ষ থাকে অপরাধপ্রবণতা কমিয়ে আনা। যে রাষ্ট্র বা সমাজ এই অপরাধ প্রবণতাকে সর্বোচ্চ মাত্রায় নিয়ন্ত্রণে রাখতে সক্ষম হয় সেই রাষ্ট্র বা সমাজকেই আমরা সুসভ্য বলে আখ্যায়িত করি। কিন্তু অপরাধ প্রবণতার প্রধান কারণ সম্পদের উপর ব্যক্তি মালিকানার বিলোপ সাধন তথা সামাজিক মালিকানা প্রতিষ্ঠার দিকে কেউ তেমন মনোযোগী নন। তাই আইন-কানুন কিংবা আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী নানাবিধ প্রতিষ্ঠানের কমতি না থাকলেও অপরাধ নিয়ন্ত্রণে আনা যাচ্ছে না। চোখের সামনে বড় অপরাধীর করুণ পরিণতি দেখেও কেউ শিক্ষা গ্রহণ করে না। আমাদের দেশে অতীত থেকে এই পর্যন্ত বহু অপরাধীর সাজা হয়েছে, অনেকেই ক্রসফায়ারে মারা গেছেন, আইনি পন্থায় সাজাপ্রাপ্ত হয়েছেন বহুজন। কিন্তু এইসব দেখে অন্যরা কিছুই শিখেনি। শিখলে অপরাধপ্রবণতা নিশ্চিতভাবেই হ্রাসপ্রাপ্ত হত। চোরা না শুনে ধর্মের কাহিনির মতো অপরাধীরা একেবারেই নির্বিকার। এরা ভাবে, অন্যের সাজা হলেও তার কেশাগ্র স্পর্শ করতে পারবে না কেউ। কিন্তু তারও করুণ পরিণতি ঘটে। তার স্থলে গজিয়ে উঠে নতুন বেপরোয়া অপরাধী। এই পৌনঃপুনিকতার শেষ কোথায়? প্রশ্নটি ছোট বটে কিন্তু এর উত্তর বড়ই কঠিন। সম্ভবত বর্তমান দেশীয় বা বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে এর উত্তর মেলানোর সাধ্য কারও নেই।
রাজধানীর প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ে দেশের সর্বোচ্চ মানের মেধাবীরা ভর্তি হয়ে থাকেন। সর্বোচ্চ মানের এই মেধাবীরাও নিকৃষ্ট মানের অপরাধের সাথে জড়িত। অতীত থেকে আবরার ফাহাদ হত্যাকা- পর্যন্ত এই মেধাবীরা বহু অপরাধকর্মে জড়িত হয়েছেন। তাহলে এই মেধা বা শিক্ষার তাৎপর্য কোথায়? যে শিক্ষা মানুষকে মানবিকতা শিখায় না বরং দৃর্বৃত্ত ও অপরাধীতে পরিণত করে সেই শিক্ষার দর্শন নিয়েও তাই প্রশ্ন উঠা স্বাভাবিক। আবরার ফাহাদকে নির্মমভাবে পিটিয়ে হত্যা করা হয়েছে। হত্যাকারীদের সাংগঠনিক পরিচয় ক্ষমতাসীন দলের ছাত্র সংগঠন ছাত্রলীগের পদবীধারী। এখন ছাত্রলীগ, অতীতে এই অপরাধগুলোই হত ছাত্রদল কিংবা শিবিরের পরিচয়ে। যে যায় লঙ্কায় সেই হয় রাবণ।
আগেই বলা হয়েছে, সমাজ থেকে অপরাধ নির্মূল না করা গেলেও নিয়ন্ত্রণে রাখতে শাসকগোষ্ঠীর পদক্ষেপের উপর নির্ভর করে সভ্যতার মানদ-। এক্ষেত্রে আমরা দেখেছি সিসিটিভি ফুটেজ দেখে বেশ কয়েকজন অপরাধীকে ইতোমধ্যে ধরা হয়েছে। সরকারের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, ছাত্রলীগ বা যেই হোক অপরাধীর বিচার দ্রুত সময়েই হবে। এই তড়িৎ আইনি পদক্ষেপের ঘটনাগুলোই আপাতত আমাদের জন্য স্বস্তির। সরকার যখন নানা ক্ষেত্রে নিজ দলের প্রভাবশালীদের বিরুদ্ধে এ্যাকশনে নেমেছে সেই সময়ে বুয়েট ছাত্রলীগের কতিপয় নেতা বুঝিয়ে দিলেন সেই সারকথাই, চোরা না শোনে ধর্মের কথা।
মূলত আর্থ-সামাজিক-রাজনৈতিক অবস্থা অপরিবর্তিত রেখে এইসব অপরাধ বন্ধ করা অসম্ভবই বটে।