আবারও বিদ্যুতের মূল্য বৃদ্ধির চাপ

আকস্মিকভাবে পাইকারি পর্যায়ে বিদ্যুতের দাম ১৯.২২ শতাংশ বৃদ্ধি করার ঘোষণা এসেছে। বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন প্রতি কিলোওয়াট বিদ্যুতের দাম ৫ টাকা ১৭ পয়সা থেকে বাড়িয়ে ৬ টাকা ২০ পয়সা নির্ধারণ করেছে যা ডিসেম্বর মাস থেকেই কার্যকর করা হবে। প্রতি কিলোওয়াট বিদ্যুতে এখন ১ টাকা ৩ পয়সা বাড়ানো হলো। পাইকারি পর্যায়ে বিদ্যুতের এমন দাম বাড়ানোর প্রেক্ষিতে বিদ্যুৎ প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদ বলেছেন, গ্রাহক পর্যায়ে এখনই দাম বাড়ছে না। সোমবার সচিবালয়ে সাংবাদিকদের সাথে আলাপকালে তিনি আরও বলেছেন, উৎপাদন খরচ বেড়ে যাওয়ায় প্রাইজ এডজাস্ট করতে হচ্ছে। গ্রাহক পর্যায়ে দাম বাড়ানোর বিষয়ে মন্ত্রীর বক্তব্্য হলোÑ মাঠ পর্যায়ের তথ্যের ভিত্তিতে যাচাই বাছাই করে এই ব্যাপারে পরে সিদ্ধান্ত নেয়া হবে। অর্থাৎ মন্ত্রী গ্রাহক পর্যায়ে বিদ্যুতের দাম না বাড়ানোর নিশ্চয়তা দিতে পারেননি। অর্থনীতির সাধারণ সূত্র অনুসারে সরবরাহকরা বেশি দামে পণ্য কিনলে বাড়তি দামটুকু ভোক্তা পর্যায়েই আরোপিত হয়। অর্থাৎ যে পর্যায়েই দাম বাড়–ক না কেন শেষ পর্যন্ত বাড়তি দামের বোঝা অতিরিক্ত মুনাফা সমেত ভোক্তার ঘাড়েই এসে পড়ে। সুতরাং কৌশল হিসাবে পাইকারি পর্যায়ে দাম বাড়ানোর কথা যতই বলা হোক না কেন, বিদ্যুত গ্রাহকদের উপর যে আবারও বাড়তি দামের চাপ আসতে চলেছে তাতে কোনো সন্দেহ নেই। ক্রমাগত দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধির সাথে বিদ্যুতের এই বাড়তি দাম সাধারণ মানুষের জীবনকে আরও কঠিন করে তুলবে নিঃসন্দেহে। কারণ বিদ্যুতের মূল্য বৃদ্ধির সাথে আরেক দফা পণ্যমূল্য বাড়ার আশঙ্কাও যুক্ত হলো।
বারবার বিদ্যুৎ, গ্যাস ও অন্যান্য জ্বালানীর দাম বাড়ানো একটি নৈমিত্তিক বিষয় হয়ে উঠেছে আমাদের দেশে। সাধারণ মানুষ সর্বদা তটস্থ থাকেন এ কারণে যে, কখন কোন জিনিসের দাম বেড়ে যায়। মানুষের আয় না বাড়লেও বাজারের উর্দ্ধগতি মানুষকে আজ হতাশার অন্ধকারে নিমজ্জিত করে চলেছে। বিদ্যুতের দাম বাড়ানো ওই হতাশাকেই কেবল দীর্ঘায়িত করবে। বিদ্যুতের উৎপাদন খরচ নিয়ে বিশেষজ্ঞদের মধ্যে স্পষ্টটই দ্বিমত আছে। এই খাতের বিশেষজ্ঞদের একটি বড় অংশ মনে করেন, দুর্নীতি ও মাথামোটা প্রশাসনিক-পরিচালনা ব্যয়ের কারণে বিদ্যুতের মোট উৎপাদন ব্যয় অনেক বেশি বেড়ে যায়। ব্যবস্থাপনাগত উন্নয়ন ঘটিয়ে দুর্নীতি হ্রাস এবং অপ্রয়োজনীয় খরচ সংকুচন করতে পারলে বিদ্যুতের দাম বাড়ানোর কোনো প্রয়োজন হবে না বলে তাঁদের অভিমত। কিন্ত বিশেষজ্ঞদের এই বক্তব্য সরকারি পর্যায়ে মোটেই আমল পায় না। এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন নামের প্রতিষ্ঠানটি বিদ্যুত বা জ্বালানী খাতের বিশাল দুর্নীতি ও হাতি পোষার খরচের দিকে দৃষ্টি না দিয়ে সাধারণ মানুষের পকেট কাটার দিকে বেশি গুরুত্ব দিয়ে থাকেন। এই গণবিরোধী দৃষ্টিভঙ্গি পালটানোর জন্য অনবরত কথা বলা হতে থাকলেও তাতে কর্ণপাত করার কেউ নেই। ফলে অহেতুক দাম বাড়ানোর বিষয়টি নিরবে সহ্য করতে হয় সকলকে।
গণশুনানির নামে মাঝে-মধ্যে তামাশা হতে দেখি আমরা। সেখানে গিয়ে কিছু ব্যক্তি ভাল কথা বলেন। কিন্তু সেই কথা বাতাসে মিলানোর আগেই দাম বেড়ে যায়, যেন দাম বাড়ানোর বিষয়টি পূর্ব নির্ধারিতই থাকে। তাহলে গণশুনানির নামে এই তামাশা কেন? ব্যবস্থাপনা উন্নয়নের মাধ্যমে যেখানে প্রাইজ এডজাস্টের সুবর্ণ সুযোগ রয়েছে সেখানে সাধারণ মানুষের পকেট থেকে বাড়তি টাকা নিয়ে এই সমন্বয় গণবিরোধী মনোভাবের পরিচায়ক। এই ধরনের অবস্থার অবসানকল্পে সকলের আরও বেশি সোচ্চার হওয়ার সময় এসেছে। সীমিত আয়ের মানুষের মনের কষ্ট অনুভব করার মতো একটি সহনাভূতিশীল রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থাই আমাদের কাম্য। যেখানে প্রান্তিক মানুষের পকেট কেটে দুর্নীতির সমুদ্র তৈরির কোনো ব্যবস্থা থাকবে না।