আবার ধানের দাম কমেছে- কৃষকের মাথায় হাত

বিশেষ প্রতিনিধি
ধানের দাম আরেক দফা কমেছে। এ কারণে বিপাকে পড়েছেন সুনামগঞ্জের হাওরাঞ্চলের প্রায় সাড়ে তিন লাখ কৃষক। বেশি বিপদে পড়েছেন বড় কৃষকরা। সরকারি খাদ্য গোদামে ধান দিতে পারেননি, আবার বাজারেও দাম কম থাকায় মৌসুমের সময় ধান বিক্রি করেননি তারা। বেশি দাম পাবার আশায় গোলায় রেখেছিলেন ধান, এরাই বেশি ক্ষতির মধ্যে পড়েছেন। সুনামগঞ্জে এবার ধানের উৎপাদন হয়েছিল কৃষি বিভাগের হিসাবে ৯ লাখ মে.টন। এর মধ্যে সরকারি খাদ্য গোদামে ১০৪০ টাকা মণ হিসাবে মাত্র সাড়ে ৭ হাজার মে.টন ধান এবং আতব চাল ১৪৮০ টাকা এবং সিদ্ধ চাল ১৫২০ টাকা মণে ২০৯৮৯ মে.টন কেনার লক্ষ্যমাত্রা ছিল।
সুনামগঞ্জ খাদ্য অফিস সূত্রে জানা গেছে, ১৫ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত (ধান চাল কেনার সর্বশেষ দিন) চাল কেনা হয়েছে ২০ হাজার ৬৩৫ মে.টন (এর মধ্যে সিদ্ধ ৪৮৫২ মে.টন) এবং ধান কেনা হয়েছে ৬ হাজার ৮০০ মে.টন।
এবার সরকারি ক্রয় কেন্দ্রে একজন কৃষকের কাছ থেকে ১ মে.টন ধান ক্রয় করার সিদ্ধান্ত নেওয়ায় বড় কৃষকরা বাধ্য হয়ে ফড়িয়াদের কাছে কম দামে ধান বিক্রি করতে হয়েছে। বড় কৃষকদের কেউ কেউ আশ্বিন-কার্তিক মাসে (সেপ্টেম্বর- অক্টোবর মাস) বেশি দামে ধান বিক্রির আশায় গোলায় রেখে দেন ধান। কিন্তু সেপ্টেম্বর মাসে ধানের দাম আরো কমে যাওয়ায় সংকটে পড়েছেন তাঁরা। মণ প্রতি ৫০ থেকে ৭৫ টাকা ধানের দাম কমায় পুরো হাওরাঞ্চলের কৃষকদের মধ্যে উৎকণ্ঠা দেখা দিয়েছে।
দিরাই শহরতলির রাজাপুর গ্রামের বড় কৃষক আব্দুস ছত্তার বললেন,‘৭১০ টাকা মণ দর সাব্যস্ত করে ২০০ মণ হীরা ধান এক ধান ব্যাপারীর কাছে বিক্রি করেছিলাম। ২০ হাজার টাকা অগ্রিম হিসাবেও নিয়েছিলাম। আমার কাছ থেকে ধান নেবার কথা ছিল আশ্বিন মাসের প্রথম সপ্তাহে, এখন ঐ ব্যাপারী কোন যোগাযোগই করছেন না। ধানের দাম কমায় লজ্জায় আমার সঙ্গে কথাই বলছেন না। হীরা ধান এখন শুনেছি বাজারেই ৬৮০ টাকা বিক্রি হয়।’ তিনি জানালেন, এই অবস্থা কেবল তাঁর নয়, পুরো হাওরাঞ্চলেই বিরাজ করছে।
বিশ্বম্ভরপুরের কৃষক সুকেশ বর্মণ বলেন,‘অনেক আর্থিক কষ্টে কয়েক মাস কাটিয়েছি। বেশি দাম পাবার আশায় প্রায় ১০০ মণ ধান গোলায় ছিল, কিন্তু বিক্রি করিনি। এই মাসে দাম বাড়লে বিক্রি করার চিন্তা ছিল, এখন দাম আরো পড়ে গেছে। আর ওঠবে বলেও আশা নেই। এই অবস্থা চলতে থাকলে ধান ফলানোর চিন্তা বাদ দিয়ে দিতে হবে।’
সুনামগঞ্জের সবচেয়ে বড় ধানের আড়ৎ মধ্যনগরের আড়ৎদার সমিতির সভাপতি জ্যোতির্ময় রায় বলেন,‘আগস্ট মাসেও আমরা ৮২৫ থেকে ৮৩০ টাকা মণে ধান কিনেছি। সোমবার এই ধান ৭৫০ থেকে ৭৬০ টাকায় কেনা হচ্ছে।’
তিনি জানান, সরকার ধান চাল কম কেনায় এবং পহেলা সেপ্টেম্বর থেকে সরকার ডিলারদের মাধ্যমে ১০ টাকা কেজিতে চাল দেওয়ায় (নির্দিষ্ট কার্ডধারীদের) বাজারে ধানের দাম পড়ে গেছে।
জেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক জাকারিয়া মোস্তফা বললেন,‘আমরা টার্গেটের প্রায় ৯৫ শতাংশ ধান চাল গত ১৫ সেপ্টেম্বর কেনা শেষ করেছি। এখন কেনার সময় শেষ। সরকারের টার্গেটের বেশি কেনার ক্ষমতা নেই আমাদের। এছাড়া গোদামে স্থান সংকুলানও হচ্ছে না।’
জেলা খাদ্য অফিসের আরেক কর্মকর্তা নিজের পরিচয় প্রকাশ না করার অনুরোধ জানিয়ে বললেন,‘আরো ১৫ দিন কেনার সময় বাড়ালেই টার্গেটের পুরো ধান- চালই কেনা সম্ভব হতো।’