আব্দুল দয়াছ নষ্ট প্রশাসনিক সংস্কৃতি থেকে উৎপন্ন বিষাক্ত উপজাত বিশেষ

আব্দুল দয়াছ একজন লন্ডন প্রবাসী ভদ্রলোক। বৃহত্তর সিলেটে এমন অজ¯্র প্রবাসী রয়েছেন। কিন্তু অজ¯্র প্রবাসীর মধ্যে আব্দুল দয়াছ হয়ে উঠেছেন অনন্য একজন। তিনি আর সকলের চাইতে আলাদা। প্রবাসীরা দেশে আসলে তাদের নিকট থেকে দান-খয়রাত কিংবা অন্য উপায়ে অর্থ খসানোর বাইরে আলাদা গুরুত্ব তেমন একটা দেয়া হয় না। বরং নানাভাবে হেনস্তা ও নাজেহালেরই শিকার হন তারা। কিন্তু আব্দুল দয়াছ দেশে আসলে তার বাড়ি অভ্যাগত অমাত্যবর্গের পদভারে মুখরিত হয়ে উঠে। তিনি রাজধানীর যে হোটেলে অবস্থান করেন সেখানে রাষ্ট্রের পদস্তদের ভিড় জমে উঠে। সকলেই আসেন আব্দুল দয়াছের আনুকূল্য পাওয়ার জন্য। তিনি নাকি বেশ ক্ষমতাশালী। ক্ষমতায় না থেকেও ক্ষমতাবান। কারণ তাঁর রয়েছে বেশ কিছু উঁচু কানেকশন। ওই কানেকশন কাজে লাগিয়ে তিনি অনেকের ‘উপকার’ করতে সক্ষম। এমনি এমনি উপকার করেন না তিনি। রীতিমতো বড় অংকের টাকার বিনিময়ে এমন উপকার লাভ করতে হয় ‘বিপদগ্রস্ত’দের। নির্ঝঞ্ঝাটে তিনি এতদিন এই রমরমা তদবির বাণিজ্য করে আসছিলেন। কিন্তু সম্প্রতি তার কিছু ফোনালাপ গণমাধ্যমে প্রকাশিত হয়। আর তাতেই নিভৃতে কোটি টাকার কারবারি আব্দুল দয়াছ এখন হয়ে উঠেছেন দেশব্যাপী আলোচিত চরিত্র। অনলাইন সংবাদপত্র বাংলা ট্রিবিউন তার এমন কিছু ফোনালাপ প্রকাশ করে যা গতকাল দৈনিক সুনামগঞ্জের খবরে রিপ্রিন্ট করা হয়েছে। ওখানে শোনা যায় তিনি দুদকের কিছু প্রভাবশালী কর্মকর্তার পক্ষে দুদকের মামলায় জড়িত এক পদস্ত পুলিশ কর্মকর্তার পক্ষে ঘুষের লেনদেনে সহযোগিতা করেছেন। দুদকের উচ্চপদস্তদের সাথে দহরম-মহরমের জোরে তিনি এই সহযোগিতা করার সুযোগ পেয়েছেন। অন্যদিকে একই দিন দৈনিক সুনামগঞ্জের খবরের নিজস্ব আরেকটি প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, আব্দুল দয়াছের গ্রামের বাড়ি ছাতকের প্রত্যন্ত ছাতারপাই গ্রামে বিভিন্ন সময়ে দুর্নীতি দমন কমিশনের উচ্চপদস্থসহ পুলিশের উচ্চপদস্ত কয়েকজন দাওয়াত কবুল করেছেন। স্থানীয়রা বলেছেন, আব্দুল দয়াছ প্রভাবশালীদের সাথে তার সুসম্পর্কের ভয় দেখিয়ে এলাকায় নিজের একটি প্রতিপত্তি গড়ে তুলেছেন। এলাকার কেউই ভয়ে তার বিরুদ্ধে মুখ খুলতে চায় না।
আমাদের প্রশাসনিক সংস্কৃতিতে তদবির শিল্পের মতো মর্যাদাবান একটি প্রপঞ্চ। কিছু ব্যক্তি সুকৌশলে উচ্চপদস্তদের সাথে সম্পর্ক তৈরি করে সেই সম্পর্ককে অনৈতিক কাজে ব্যবহারে সিদ্ধহস্ত। বহু উচ্চপদস্ত কর্মকর্তা এরকম তদবিরবাজকে নিজের স্বার্থে পোষেন। সরাসরি অর্থকড়ির লেনদেন করা বিপদজনক বলে তারা সেই পথে না যেয়ে মধ্যস্ততাকারী তদবিরবাজদের মাধ্যমেই লেনদেন কর্মটি সেরে থাকেন। প্রশাসনযন্ত্রে প্রতিবছর কী পরিমাণ অনৈতিক লেনদেন সংঘটিত হয়ে থাকে তা রীতিমত গবেষণার বিষয়। আর কড়িৎকর্মা তদবিরবাজদের নিয়ে তো রীতিমত অভিসন্ধর্বপত্র তৈরি করা যেতে পারে। কিছু কিছু সরকারি কর্মকর্তার সম্পদের পাহাড় দেখলে ওইসব গোপনীয় লেনদেনের বিষয়টি দিবালোকের মত স্পষ্ট হয়। আব্দুল দয়াছ ওই নষ্ট প্রশাসনিক সংস্কৃতি থেকে উৎপন্ন বিষাক্ত উপজাত বিশেষ। প্রশাসনযন্ত্র পরিশুদ্ধ না হওয়া পর্যন্ত এই উপজাত বর্জ্য বিশেষের উৎপাত কমানো কোন অবস্থাতেই সম্ভব নয়। তাই আমরা যখন আব্দুল দয়াছ সম্পর্কে আলোচনা করব তখন অবশ্যই তাকে লালন-পালনকারী শীর্ষ কর্মকর্তাদের বিষয়টিও আরও বেশি করে পরিষ্কার করা উচিত। নতুবা মনে হবে শুধুমাত্র আব্দুল দয়াছদের মত লোকদের কারণেই এই অধঃপতন।
আমরা স্বাধীন দেশে একটি কার্যকর রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থা দেখতে আগ্রহী। ওই ব্যবস্থায় অনৈতিক বা অবৈধ কোন কিছু থাকবে না। এই বিষয়টি প্রতিষ্ঠা করলে আব্দুল দয়াছরা এমনিতেই কর্পূরের মত বাতাসে মিলিয়ে যাবেন। পৃথক কোন ব্যবস্থা গ্রহণের দরকার পড়বে না তখন। কিন্তু সেটি না হওয়া পর্যন্ত আব্দুল দয়াছের মতো তদবিরবাজদের আইনি পন্থায়ই লাগাম পড়িয়ে রাখতে হবে।