‘আব্বু আমারে একটা শার্ট কিইন্না দেও’

বিশেষ প্রতিনিধি
চার বছর বয়সি শিশু নাজমুস সাকিব। বন্যায় ভেঙে যাওয়া ঘরের সামনে বাবা সবুজ মিয়ার হাত ধরে টানাটানি করে বলছিল, ‘আব্বু চল না, আমারে একটা প্যান্ট আর শার্ট কিইন্না দেও’। বাবা সবুজ মিয়া ছেলের মুখের দিকে থাকিয়ে বলছিলেন, ‘ইবার পুরান শার্ট ধুইয়া পরিলাইবায়নে বাবা, পরেরবার সুন্দর শার্ট কিইন্না দিমুনে।’
ছেলের আকুতির বিষয়টি জানতে চাইলে- দিনমজুর সবুজ মিয়া উত্তর, তিন ছেলে, তিন মেয়ে তার, বন্যার সময় ঘরের ছাল সমান পানি ছিল, সামান্য ধান ঘরে ছিল, পচে নষ্ট হয়ে গেছে, পরনের কাপড় ছাড়া কিছুই ঘর থেকে নিয়ে বের হতে পারেন নি, এখন শুনেছেন বাড়ি বাড়ি এসে প্রধানমন্ত্রীর সহায়তার ১০ হাজার টাকা দেওয়া হবে, এজন্য আশ্রয় কেন্দ্র ছেড়ে বাড়ি এসেছেন। ঘরে ত্রাণের কিছু চাল ছাড়া কিছুই নেই, গ্রামে বা আশপাশে কেউ কাজের জন্যও ডাকছে না। হাতে কোন টাকাও নেই। ৬ ছেলে মেয়ের ৪ টাই ছোট, গত দুইতিন দিন তাদের আবদারের জবাবে বুঝানোর জন্য বলেছেন নতুন জামা কিনে দেবেন, আজ বৃহস্পতিবার আর বুঝানোর চেষ্টা না করে বলছেন, এবার সবুর করতে, পরের বার নতুন জামা কিনে দেবেন।
নাজমুস সাকিবের পাশে দাঁড়ানো একই গ্রামের তাহের আলী ও জারিয়া বেগমের শিশু কন্যা সিমলাও বলছিল, ‘আব্বুয়ে কইছইন নতুন জামা দিতানায় আমারে’।
বৃহস্পতিবার সুনামগঞ্জ শহরতলির হাছনবসত গ্রামের সড়কে দাঁড়িয়ে সবুজ মিয়া ও তার ছোট্ট শিশু সন্তান নাজমুস সাকিব এভাবেই কষ্ট জানান দিচ্ছিলেন।
গ্রামের বাসিন্দা সাহেরা বেগম ঈদ কোন দিন সেটিও বলতে পারলেন না ভালো করে, প্রথমে সোমবার, পরে অন্যরা রোববার বলায় বললেন, রোববারই বোধ হয় ঈদ। সাহেরা বললেন,‘জাইন্না কিতা অইতো ভাই, খাইতামঔ পাররাম না, আর ঈদ’।
কয়েক কিলোমিটার দূরের সুনামগঞ্জ সদর উপজেলার লক্ষণশ্রী ইউনিয়নের ইসলামপুরে গিয়ে দেখা গেলো, আরও খারাপ অবস্থা। ইসলামপুর গ্রামের তাজুল ইসলাম, সালাম উদ্দিন, জমির হোসেন, আব্দুল হামিদ, ফিরোজ আলী, জব্বার মিয়া, হুরেনা বেগম ও ছালেহাসহ কমপক্ষে ৬০ পরিবার প্রধানমন্ত্রীর দেওয়া বিপন্ন পরিবারের সহায়তা ১০ হাজার টাকা নেবার জন্য ঘরে ফিরতে পারছেন না। ঘরে এখনো পানি। সুনামগঞ্জ-সিলেট মহাসড়কসহ আশ্রয় কেন্দ্রে এখনো আছেন তারা।
তাজুল ইসলাম বললেন, ‘ঈদের কথা বাইচ্চানতের সামনে বেশি মাতি না, বাইচ্চানতের মারেও কইছি, ঈদ লইয়া ইবার বেশি মাতিছ না, পরে কান্নাকাটি সামাল দিতে পারতে নায়।
হাছনবত বা ইসলামপুর গ্রামেই কেবল এমন মর্মস্পর্শি দৃশ্য নয়। জেলার দুই হাজার ৮৮৭ গ্রামের কমপক্ষে দুই হাজার গ্রামের দৃশ্যপট একই ধরণের।
ভয়াবহ বন্যার কষ্ট কেবল দরিদ্র পরিবারেই নয়। জেলাজুড়ে উচ্চবিত্ত, মধ্যবিত্ত, নি¤œবিত্ত সকলেরই কষ্ট আছে।
শাল্লা উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান আলামিন চৌধুরী বললেন, এলাকায় বিত্তশালী হিসাবে আমাদের পরিচিতি থাকলেও, আমার ৮০০ মণ ধান ডুবে পচে নষ্ট হয়েছে। এর চেয়ে বেশি ক্ষতি হয়েছে এলাকার মধ্যবিত্ত, নি¤œবিত্তদের। গরিব মানুষ হাত পাততে পারছে, মধ্যবিত্তরা দিলেও লজ্জায় নিচ্ছে না। এবারের ঈদ এলাকার ধনী-গরিব সকলের জন্য কষ্ট নিয়ে এসেছে।
দোয়ারাবাজার উপজেলা আওয়ামী লীগের যুগ্ম আহ্বায়ক আব্দুল খালেক বললেন, ‘বড় গৃহস্তরাও এবার অন্য বছরের মতো কোরবানি দিতো পারতো নায়, আমরা পাঁচ ভাই, অন্য বছর পাঁচ গরু কোরবানি দিছি, ইবার তিনটা দিমু, এলাকার অন্যরাও এইভাবে যে পাঁচটা দিতো, ইবার দুইটা তিনটা দিব।’
সুনামগঞ্জ শহরতলির মল্লিকপুর আশ্রয় কেন্দ্রে গিয়ে বৃহস্পতিবার দেখা গেলো ১৫ টি পরিবার এখনো ওখানে আছে।
আশ্রয়কেন্দ্রে থাকা রাবেয়া বেগম জানালেন, ঘর থেকে পানি নেমেছে, কিন্তু যাবার মতো পরিবেশ নেই। এজন্য ঈদের দিনও ওখানেই কাটাতে হবে তাদের।
খোঁজ নিয়ে জানা গেল, জেলার ১০৮ টি আশ্রয় কেন্দ্রে বৃহস্পতিবার পর্যন্ত ১২ হাজার ৭৭৫ জন বানভাসি মানবেতর দিন যাপন করছে। ঈদের দিনেও আশ্রয় কেন্দ্রেই থাকবে তারা।
জেলা স্থানীয় সরকার বিভাগের উপ-পরিচালক জাকির হোসেন জানালেন, বানভাসি মানুষের পাশে দফায় দফায় সরকারি-বেসরকারি ত্রাণ যাচ্ছে। বিধ্বস্ত ৫ হাজার বাড়ী বাড়ী গিয়ে প্রধানমন্ত্রীর ১০ হাজার টাকার সহায়তা দেওয়া হচ্ছে। ঈদ উপলক্ষে এক লাখ ২০ হাজার পরিবারকে ১০ কেজি করে ভিজিএফ’র চাল দেওয়া হচ্ছে।