আমরা দুই মাইল দূর থাকি পানি আইন্যা খাই

ইয়াকুব শাহরিয়ার, দ. সুনামগঞ্জ
‘ডিগারকান্দি গাঁও থাকি নয়া বাড়ি বান্দিয়া ইখানো আইছি সাড়ে ৪ বছর। খেউ জিকা খরলে আমরা ই জায়গার নাম কই ডিগারকান্দি। আমরা আইয়া তিন চাইরটা ঘর ইখানো ফাইছি। আমরার ফরে আরো পাঁচ ছয় ঘর আইছইন। সবতায় মিলাইয়া ইখানো আমরা এগারো বারো পরিবার। একশ জনের বেশি মানুষ। অনেকদিন ধইরা আমরা নদীর পানি খাইরাম। ই পানিতে শরীর খারাপ অইযায় কইরা কষ্ট করি দূর থাকি পানি আনোন লাগে। দুই মাইল দূর থাকি পানি আইন্যা খাই আমরা। আমরার কষ্ট দেউখরা মানুষ নাই।’
কথাগুলো অনেক কষ্ট আর ক্ষোভ নিয়ে বলছিলেন পূর্ব পাগলা ইউনিয়নের ডিগারকান্দি গ্রাম থেকে বেড়িয়ে কাঁচিভাঙ্গা হাওরের পাশে মহাসিং নদীর পাড়ে বসতি স্থাপন করা কৃষাণী হেলেনা বেগমের। তিনি জানান, আশপাশে তারা প্রায় ১১ থেকে ১২ টা পরিবার। একটি মাত্র টিউবওয়েলের অভাবে প্রায় দুই কিলোমিটার দূরের গ্রাম ধরাধরপুরের কাছে আমীর আলীর বাড়ি থেকে এসে কলসি করে পানি নিতে হয় তাদের। প্রতিদিন বিকালে ঐ বাড়িগুলোর কিশোরীরা মেয়েরা দল বেঁধে কলসি করে পানি নিতে আসে। এক কলসি পানি আনতে এক ঘন্টারও বেশি সময় লাগে।
সরেজমিন ঘুরে দেখা যায়, মনাফ আলী, সুলেমান মিয়া, জমসেদ আলী, সাদিকুর রহমান, জবা বেগম ও আনোয়ার হোসেনসহ আলাদা আলাদাভাবে দশ বারোটি পরিবারের বসবাস পূর্ব পাগলার নতুন এ ডিগারকান্দি গ্রামে। টিউবওয়েল নিয়ে প্রতিবেদন করতে সাংবাদিক এসেছেন শুনে ঘর থেকে বেরিয়ে আসেন চার পাঁচজন মহিলা। এতো দূর থেকে টিউবওয়েলের পানি এনে পান করতে হয়, এমন কষ্টের কথা বলতে লাগলেন অকপটে। এদের একজনের নাম হেলেনা বেগম। তাদের সাথে কথা বলতে বলতে পাশেই নিজেদের জমি থেকে উঠে আসেন পুরুষ মানুষেরাও। তারাও তাদের কষ্টের কথা জানালেন। এদের মধ্যে একজনের নাম রাহাত হোসেন। তার ভিতরে অনেক ক্ষোভ। তিনি বলেন, ‘কি হবে ভাই লিখে? কারো কানে কি যাবে? দুঃখ শোনার আর দেখার মানুষ কি দুনিয়াতে আছে? আমরা কি কোনো উপকার পাবো? যদি কেউ আমাদের মেয়ে মহিলাদের দুঃখের কথা একবার চিন্তা করতো, যদি আমরা অসহায় দশ বারোটা পরিবারের কথা ভাবতো তাহলে একটা টিউবওয়েল আসে না কেনো? আমরা কি ভোট দেই নাই? আমরা সবাই মিলে একটা টিউবওয়েলের জন্য ঠিক কতোবার আবেদন করলে টিউবওয়েল পাবো? অনেক বছর নদীর পানি খাইছি। এখন শিশুদের অসুখ হয়ে যায় বিধায় দুই কিলোমিটার দূর থেকে অনেক কষ্ট করে পানি এনে খেতে হয় আমাদের। আপনাদের মাধ্যমে আমি সকলকে অনুরোধ করবো, দয়াকরে আমাদের এই দুঃখ লাঘবে একটু সদয় দৃষ্টি দিন। আমরা গরিব মানুষ, নুন আনতে পান্তা ফুরায়। না হলে আমরা নিজেরাই একটি টিউবওয়েল বসাইতে পারতাম।’
ডিগারকান্দি গ্রামের প্রবীণ কৃষক মো. আঙ্গুর মিয়া বিস্ময় প্রকাশ করে বলেন, ‘আল্লাহ্ মা’বুদ, পানির লাগি যে কষ্ট করে ই কয়েক বাড়ির ফুরিন্তে আর বেটিনতে! যদি একটা সরকারী টিউবওয়েল হখলরে মিলাইয়া দেওয়া যায়- তাইলে এরার খুব উপকার অইবো। অনেক কষ্ট কমিজাইবো।’
ধরাধরপুর গ্রামের যে বাড়ির সামনে টিউবওয়েল সে বাড়ির মালিক আমীর আলী বলেন, ‘আমাদেরও টিউবওয়েল দেওয়ার সামর্থ্য ছিলো না। এক লন্ডনী আমাদের এটা দান করেছেন। আমার গরিব, গরিবের দুঃখ বুঝি। সকলে যাতে পানি নিতে পারে তাই রাস্তার পাশে টিউবওয়েল স্থাপন করছি।’ আঙ্গুল দিয়ে দূরে দেখিয়ে বলেন, ‘ঐযে দেখেন দশ বারোটা ঘর। তারাও এখান থেকে পানি নেয়। দেড় দুই কিলোমিটার দূর থেকে এসে তারা পানি নেয়।’
উপজেলা আওয়ামীলীগের দপ্তর সম্পাদক দিলীপ তালুকদার বলেন, আমরা হাওর পরিদর্শনে গিয়ে এতো দূর থেকে পানি আনার দৃশ্যটি দেখেছি। আমাদের নজরে পড়লে আমার ইউএনও সাহেবের সাথে আলাপ করেছি। তিনি আমাদের আশ্বস্ত করেছেন, দ্রুত একটি টিউবওয়েল দেওয়ার চেষ্টা করবেন তিনি।’
পূর্ব পাগলা ইউনিয়ন পরিষদের ৮নং ওয়ার্ডের সদস্য ইয়াহিয়া আহমদ সুমন বলেন, ‘অতিদ্রুত তারা টিউবওয়েল পাবে। ইউএনও স্যারের সাথে আমার কথা হয়েছে।’
পূর্ব পাগলা ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মো. আক্তার হোসেন বলেন, ‘অবশ্যই এক মাস সময়ের মধ্যেই আমি একটি টিউবওয়েল দেওয়ার চেষ্টা করবো।’
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. হারুন অর রশিদ বলেন, ‘আমি তাদের নাম ইতোমধ্যে তালিকাবদ্ধ করে রেখেছি। মেম্বারের সাথে কথা হয়েছে। বরাদ্দ আসলেই তারা এ টিউবওয়েল পাবে। আমি তাদের ব্যপারে অবগত আছি।’
উপজেলা চেয়ারম্যান হাজি আবুল কালাম বলেন, ‘আমাদের উপজেলায় বেশির ভাগ গ্রামেই টিউবওয়েল আছে। যারা নতুন বাড়ি করে গিয়েছেন তাদের ব্যপারটা আমাদের জানান নেই। তারা আমাদের কাছে লিখিত আবেদন করলে আমরা দ্রুত টিউবওয়েল দিতে চেষ্টা করবো।’



আরো খবর