আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থায় ইংরেজির বর্তমান অবস্থা

মীর মোশারফ হোসেন
আমাদের আনুষ্ঠানিক শিক্ষায় দ্বিতীয় শ্রেণি থেকে স্নাতক পর্যন্ত (শ্রেণি ভেদে এক পত্র/দুই পত্র) পাঠ্যসূচীতে ইংরেজি বিষয় আছে। কিন্তু বর্তমানে এই বিষয়টির অবস্থা খুবই শুচনীয়। ইংরেজির প্রতি নীতি নির্ধারক থেকে শুরু করে শিক্ষার্থী পর্যন্ত কারোরই অনুভূতি ভাল না। শিক্ষার্থীরা অপেক্ষা করছে কবে ইংরেজি পড়া থেকে মুক্তি পাবে। আর নীতি নির্ধারকরা উপায় খুঁজছে কিভাবে ইংরেজিকে বাদ দেওয়া যায়। ইংরেজি শিক্ষকগণ ও খুব কষ্টে নিজেদের মান সম্মান টিকিয়ে রাখছে।
এই দেশের একাডেমিক শিক্ষায় প্রাথমিক থেকে মাধ্যমিক, এমনকি উচ্চশিক্ষায়ও আবশ্যিক হিসেবে ইংরেজি বিষয় পাঠ্যসূচীতে অন্তর্ভুক্ত আছে। ২০০০ সাল পর্যন্ত ইংরেজি শিক্ষাদান এবং শিখন পদ্ধতি ছিল traditional বা Grammar Translation Method। ঐ সময়টাতে ইংরেজি কারিকুলাম অনেকটা সাহিত্য ও Grammar নির্ভর ছিল। প্রাথমিকে Grammar এর অল্প কিছু সংজ্ঞা পড়ানো হতো। বেশিরভাগ পাঠই মুখস্থ করার মত ছিল। মাধ্যমিকে (ষষ্ঠ থেকে দ্বাদশ শ্রেণি পর্যন্ত)ব্যাপকভাবে grammar ও Translation পড়ানো হতো। তখন পর্যন্ত যারা মাধ্যমিক কিংবা উচ্চমাধ্যমিক ভালভাবে পাশ করেছে তারা ইংরেজিতে অনুবাদ করা, বাক্য পরিবর্তন করা, ইংরেজিকে বাংলায় অনুবাদ করে পড়া বা বলা, ইংরেজিতে দরখাস্ত লেখা, পত্র লেখা ইত্যাদি কাজ করতে পারত। যারা খুব ভাল ইংরেজি পারত তারা ইংরেজিতে কথা বলতে পারত এবং সৃজনশীল কাজ ইংরেজিতে করতে পারতো। আর যারা ইংরেজি নিয়ে বা ইংরেজি মাধ্যমে উচ্চ শিক্ষা লাভ করতো তারা তো সমাজে অনেকটা ম্যাজিসিয়ানের মতোই ছিল। অবশ্য অল্প কিছুদিন আগ পর্যন্তও আমাদের দেশের উচ্চ শিক্ষা ইংরেজি মাধ্যমেই হতো। অফিস আদালতের অনেক নথিপত্রও ইংরেজিতে লিখিত হতো।
২০০০ সালের পর থেকে আমাদের দেশের মাধ্যমিক স্তরে আবশ্যিক ইংরেজিতে communicative approach প্রবর্তন করা হয়েছে যা এখনো বলবৎ আছে। এই পদ্ধতিতে চারটি দক্ষতার উপর আলোকপাত করা হয়। সেগুলো হলো listening, speaking, reading এবং writing।এই পদ্ধতিতে ভাষার উপর বেশি জোর দেওয়া হয়, সাহিত্যের উপর নয়। একই সাথে মুখস্থকরণকে নিরুৎসাহিত করে সৃজনশীলতাকে উৎসাহিত করাই এই পদ্ধতির মূল লক্ষ্য। অনেকের বিরোধিতা সত্বেও নীতি নির্ধারকগণ বৈশ্বিক প্রেক্ষাপট চিন্তা করে ইংরেজি শিখন-শিখার এই অত্যাধুনিক পদ্ধতি প্রবর্তন করেছিলেন। যারা বিরোধিতা করেছিলেন তারা বলেছিলেন যদি সাহিত্য না পড়ানো হয় তবে জাতির মনুষত্বের বিকাশ হবে না। অন্যদিকে যারা এই পদ্ধতির পক্ষে ছিলেন তারা বলেছেন, ‘এই বিশ্বায়নের যুগে সাহিত্যের চাইতে ইংরেজি ভাষা জানা বেশি দরকার। আমাদের দেশ থেকে প্রতি বছর উল্লেখযোগ্য মানুষ জীবিকার জন্য অন্য দেশে যায়। শুধুমাত্র ইংরেজি ভাষা জানে না বলে তারা কম বেতন পায়। তারা যদি ইংরেজি বলতে এবং বুঝতে পারতো তবে তারা আরো বেশি রোজগার করতে পারতো।“তা তাছাড়া ইংরেজি জানা থাকলে উচ্চশিক্ষায়ও তা সহায়ক ভুমিকা পালন করবে। অতি সাম্প্রতিক কালে প্রাথমিকেও (তৃতীয় থেকে পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত) ইংরেজিতে communicative approach প্রবর্তিত হয়েছে। এখন তৃতীয় শ্রেণি থেকে স্নাতক পর্যন্ত আবশ্যিক ইংরেজি বিষয়ের কারিকুলাম এবং সিলেবাসের কিছু ব্যাতিক্রম ছাড়া বেশ মিল রয়েছে।যেমন তৃতীয় থেকে স্নতক শ্রেণি পর্যন্ত wh-question, filling gaps with articles, filling gaps with right form of verbs, punctuation, re-arrange, seen comprehension, unseen comprehension ইত্যাদি আছে। আবার অষ্টম শ্রেণিতে প্রথমবারের মতো speech/narration যুক্ত করা হয়েছে এবং এ বছরে্ই passage narration change করতে হয়। অথচ Narration, combination, transformation এর মত উচ্চ মাত্রার grammatical প্রশ্নগুলো অনুপস্থিত। এখন আর গাদা গাদা translation, phrase, paragraph, essay ইত্যাদি মুখস্থ করতে হয় না।প্রাথমি থেকে স্নাতক পর্যন্ত এত মিল থাকা সত্ত্বেও শিক্ষার পরিমাপ এবং মূল্যায়নগত মান নিম্নমূখী। প্রাথমিকের প্রশ্নের ভাষা এবং স্নাতকের প্রশ্নের ভাষা প্রায় একই রকম। প্রশ্নপত্রের ভাষা দেখলে প্রাথমিকের শিক্ষার্থীদের ইঁচড়ে পাকা মনে হয় আর স্নাতকের শিক্ষার্থীদেরকে অতিশয় দুর্বল মনে হয়। কিন্তু কাগজে ফলাফল সকল ক্ষেত্রেই অতিশয় ভাল। যেটুকু খারাপ হয় সেটা ইংরেজির জন্যই। অতি সাম্প্রতিক কালে ষষ্ঠ থেকে অষ্টম শ্র্রেণি পর্যন্ত ইংরেজি সংকুচিত করে দুই পত্রের পরিবর্তে এক পত্র করা হয়েছে। জানিনা এর পরে কি হবে।
এই communicative approach চালু হয়েছে প্রায় বিশ বছর সময় অতিক্রান্ত হয়েছে। আমাদের শিক্ষার্থীরা কি ইংরেজি ভাষায় কাঙ্খিত চারটি দক্ষতা অর্জন করতে পারছে? আমরা কি আসলে ইংরেজি ভাষায় যোগাযোগ করার দক্ষতা সম্পন্ন, মানব সম্পদ তৈরি করতে পেরেছি? আমাদের স্কুল কলেজ থেকে মাধ্যমিক বা উচ্চ মাধ্যমিক পাশ করে শিক্ষার্থীরা কি ইংরেজি বলতে পারছে? নাকি ইংরেজি শুদ্দ করে লিখতে পারছে? পাবলিক পরীক্ষা ছাড়া বিভিন্ন প্রতিযোগীতামূলক পরীক্ষার ফলাফল প্রকাশিত হলেই বুঝা যায় আমাদের শিক্ষার্থীদের ইংরেজি ভাষার দক্ষতা কতটুকু আছে । অনেকেই একাডেমিক ইংরেজিতে জিপি পাঁচ পেয়ে উত্তীর্ণ হয়েছে কিন্তু শুদ্ধ করে এক লাইন ইংরেজিও লিখতে বা বলতে পারছে না ।এমনকি অনেকে ইংরেজি দেখে দেখে পড়তে পারছে না। আমরা আশা করি বাস্তব অবস্থাটা কাউকে চোখে আংগুল দিয়ে দেখাতে হবে না।
ইংরেজি বিষয় নিয়ে আমাদের চিন্তা করার সময় এসে গেছে। আমাদের শিখন ফল কেন অর্জিত হচ্ছেনা তা খুঁজে বের করতে হবে। একই সাথে সমস্যা সামাধানে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে।
এত অবহেলা করে একটি বিষয়ে টিকিয়ে রাখার কোন অর্থ হয় না। আমাদেরকে সিদ্ধান্ত নিতে হবে আমরা আমাদের পাঠ্যসূচীতে ইংরেজি রাখব কি না। আমরা কি কেবলি উচ্চ আয়ের শ্রমিক বানানোর জন্যই ইংরেজি পড়াব? নাকি অন্যকে খুশি করার জন্য ইংরেজি পড়াব। অথবা অন্য কোন উদ্দে্শ্যে ইংরেজি পড়াব। আমাদের আর এক্সপেরিমেন্টের সময় নাই। আমাদের নীতি নির্ধারকদের সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে হবে। সঠিক লোক সঠিক জাযগায় বসাতে হবে। বিদ্যালয়ের পরিবেশ, শিখন পদ্ধতি, পরীক্ষা পদ্ধতি, মূল্যায়ন পদ্ধতি ঢেলে সাজাতে হবে।
আমরা এই উপমহাদেশ থেকে ইংরেজ তাড়িয়েছি, ইংরেজিকে নয়। মনে রাখতে হবে, ইংরেজি ভাষা শিখার অর্থ নিজেকে নিচু করা নয়। বরং নিজেকে আরো অনেক উঁচুতে নিয়ে যাওয়া। নিজেকে, নিজের দেশকে, নিজের সাহিত্য ও সংস্কৃতিকে বিশ্বমঞ্চে উপস্থাপন করা। আমার ভালকে পৃথিবী ব্যাপি ছড়িয়ে দেওয়া। একই সাথে অন্যের ভালটাকে নিজেদের কাজে লাগানো। ভাষা শেখার মাধ্যমে বিভিন্ন ভাষাভাষি জাতি সমূহের মধ্যে পারস্পরিক সম্পর্কের উন্নয়ন হয়। সংস্কৃতির বিনিময় হয়। বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে ইংরেজির গুরুত্ব দিন দিন বাড়ছে। বিশ্বায়নের এই যুগে ইংরেজি কারো একক ভাষা নয়। ইংরেজি এখন বিশ্বের সকলের ভাষা। বিশ্বায়নের ভাষা ইংরেজি। প্রযুক্তির ভাষা ইংরেজি। এই ভাষা জাতি, ধর্ম, বর্ণ নির্বিশেষে সকলকে এক সুতায় বেধে রেখেছে। তাই সকলের সাথে তাল মিলিযে চলতে গেলে ইংরেজি শেখার বিকল্প নাই। এখনও পর্যন্ত পৃথিবীতে নিজের অস্তিত্ব জানান দিতে হলে ইংরেজি লাগে। ভবিষ্যতে বাংলাও হতে পারে বিশ্বায়নের ভাষা। সেই ক্ষেত্রেও ইংরেজি সাহায্য করবে। তাই
সংশ্লিষ্ট সকলকে বলব: আসুন, ইংরেজিকে বোঝা মনে না করে আশির্বাদ মনে করি। ইংরেজির ভিত আরো মজবুত করি। বিশ্বায়নের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় দক্ষ প্রজন্ম গড়ে তুলি।
লেখক : প্রভাষক (ইংরেজি), জামালগঞ্জ সরকারি কলেজ, জামালগঞ্জ।