আমার ছেলেবেলা

হাসান শাহরিয়ার
বড়দের কাছে শুনেছি : সেদিন বিকেল থেকেই সূর্য ছিল অদৃশ্য। আকাশ ক্রমশ কালো হচ্ছিল, চোখে কিছুই দেখা যাচ্ছিল না। বলতে গেলে টানা দু’দিন ধরেই গগণে মেঘের সঞ্চার হয়েছিল, চলছিল ঝড়Ñঝঞ্ঝা। মেঘ কখনও এদিকে যায়, আবার কখনও ওদিকে। অবশেষে মঙ্গলবার বিকেল থেকেই ভয়ঙ্কর সাজেসাজলো মেঘ। সন্ধ্যের আগেই সন্ধ্যে নেমে এলো। সব বাড়িতেই লণ্ঠন বা প্রদীপ জালানো হয়। হিন্দুরা ধূপধূনা দিতে শুরু করে। বোধকরি বৃষ্টি নামবে, কিন্তু তার পরিবর্তে শুরু হলো বজ্রপাত ও বিদ্যুৎস্ফুরণ। কিছুক্ষণের মধ্যেই সুনামগঞ্জ শহরে আঘাত হানলো কালবৈশাখী। উত্তরপূর্ব ভারতের খাসি পাহাড়ের দক্ষিণে একটি মালভ‚মির উপর অবস্থিত চেরাপুঞ্জি বা কমলা দ্বীপের তলদেশেই সমতল সুনামগঞ্জ। চেরাপুঞ্জিতে সবচেয়ে বেশি বৃষ্টিপাত হয় বলে এর প্রভাব পড়ে সুনামগঞ্জেও। কখনও বছরে ১৪০ ইঞ্চিতে গিয়ে ঠেকে। প্রচÐ তাপদাহে যখন সুনামগঞ্জ ও তার আশেপাশের থানাগুলোয় মানুষের প্রাণ ওষ্ঠাগত হয়ে উঠেছিল ঠিক তখনই এই কালবৈশাখী আছড়ে পড়ে মহকুমা শহরটিতে। চারদিকে অন্ধতমসা। শুধু মানুষেরআহাজারি ও কলকাকলি এবং‘আল্লাহু আকবার’, ‘মা দূর্গা’ ও ‘মা কালী’রব। রাত ১০টার দিকে শুরু হলেও দু’তিন ঘন্টা ধরে চলে এই ঝড়বৃষ্টি। বাতাসের তীব্রতা কমে গেলে নেমে এলো অঝোর বারিধারা। ঝড়ের ছোবলেশহরের অনেক বাড়িঘর ধসে গেল, ঘরের চাল উড়ে গিয়ে যত্রতত্র ছিটকে পড়লো। বর্ধিষ্ণু হাসন নগরে মহকুমার একমাত্র কলেজের মুসলিম হোস্টেলটি ভ‚মিসাৎ হয়ে গেল।হোস্টেলের উল্টোদিকে নতুন বাসা করেছেন মকবুল হোসেন চৌধুরী।আজ থেকে ৭৩ বছর আগে এপ্রিল মাসের ২৫ তারিখে এই মহাতাÐবেররাতে তাঁর স্ত্রী শফিকুন্নেসা চৌধুরী জন্ম দিলেন আরেক পুত্র সন্তানের। এই বৃষ্টিঝরা রাতে নবজাতকের মুখে কেউ সোনার চামচে করে মধু দিল না; তার বদলে ফুটো চাল দিয়ে তার ক্রন্দনরত মুখে ঝরে পড়লো একের পর এক বৃষ্টির ফোঁটা, পাতলা কাঁথাসহ সর্বাঙ্গ ভিজিয়ে দিল। সেদিনের এই বৃষ্টি¯œাত শিশুটিই আমি, এখন জীবন সায়াহ্নে।
শহরে আমার বাবার বাবা মকবুল হোসেন চৌধুরীর নামডাক ছিল। তাঁকে সকলেই চিনতো। তিনি ছিলেন তদানীন্তন আসামের প্রথম মুসলিম সম্পাদক। তিনি সম্পাদনা করেছেন কলকাতার দৈনিক ‘ছোলতান’ (১৯৩০Ñ৩১), সিলেটের সাপ্তাহিক ‘যুগবাণী’ (১৯২৫), সাপ্তাহিক ‘যুগভেরী’ (১৯৩২Ñ৩৯) ও ‘সিলেট পত্রিকা’ (১৯৫৭)। মকবুল হোসেন চৌধুরী ছিলেন খেলাফত আন্দোলনের তরুণ নেতা, আসাম ব্যবস্থাপক সভার সদস্য (এমএলএ),হুইপ ও ভাষাসৈনিক। মহকুমা শহরের সকল অনুষ্ঠানেই তাঁর উপস্থিতি ছিল মধ্যমণি হিসেবে।তবে এক মাস আগে অনুষ্ঠিত আসাম ব্যবস্থাপক সভার নির্বাচনে তিনি পরাজিত হওয়ার পর তাঁর মনটা ভেঙ্গে গিয়েছিল। অবশ্য ১৯৩৭ থেকে ১৯৪৬ সাল পর্যন্ত তিনি নির্বাচিত এমএলএ ছিলেন।একটু বড় হতেই ভাবতে লাগলাম, বাবার জনপ্রিয়তা যখন তুঙ্গে (১৯৪৬) তখন তিনি নির্বাচনে হেরে গেলেন। তাহলে নিশ্চয় আমার জন্ম ছিল অমঙ্গলজনক। বিষয়টিকে বাবা বা অন্যরা কীভাবে নিয়েছিলেন জানি না। তবেআমি মনে মনে নিজেকে অবাঞ্ছিত বলে ধরে নিলাম যদিও এর কোনো ভিত্তিই ছিল না। আমার প্রতি বাবাÑমা বা পরিবারের অন্য কারো ¯েœহÑভালোবাসার কোনো ঘাটতি লক্ষ্য করিনি। মাছের মুড়ো বা হাঁসমুরগির মুÐ আমার পাতেও আসত। বাবার সঙ্গে একই বিছানায় ঘুমাতাম, তাঁর আঙ্গুল ধরে সব জায়গায় যেতাম। আমি হলফ করে বলতে পারি কেউ আমাকে অবহেলা করেনি।তারপরও সকলের অজান্তে কেন যে আমি নিজেকে অপরাধী ভেবেছিলাম তার কোনো সুস্পষ্ট জবাব আজও আমার কাছে নেই। আমি কিছুটা জেদি প্রকৃতির। মনে মনে প্রতিজ্ঞা করলাম আমাকে লেখাপড়া শিখে বড় হয়ে প্রমাণ করতে হবে যে, আমি অনাকাঙ্খিত বা অবাঞ্ছিত ছিলাম না। আমি বাবার সাংবাদিকতার পথটি বেছে নিয়েছি; কিন্তু আত্মীয়স্বজন, বন্ধুবান্ধব ও শুভানুধ্যায়ীদের শত অনুরাধ সত্তে¡ও রাজনীতির পথ মাড়াইনি। বাবার রাজনীতির যোগানদারের ভ‚মিকা পালন করে আমার মা বীতশ্রদ্ধ হয়ে পড়েছিলেন। তিনি বলতেন, ‘জীবনে আর যাÑই কিছু করিস না কেন, কখনও অ্যাসেম্বলির ভোটে দাঁড়াবি না’। এই মহিয়সীর কথাটি আমি অক্ষরে অক্ষরে পালন করেছি।
পূর্বপুরুষ :আমার পিতৃপুরুষের বাড়ি খাসি পাহাড়ের পাদদেশে ¯্রােতস্বিনী যাদুকাটা নদীর তীরে লাউড়ের নয়নাভিরাম বিন্নাকুলি গ্রামে। পূর্বপুরুষ দায়েম চৌধুরী ছিলেন পলাশ পরগনার মেরুয়াখলার বাসিন্দা। পলাশের ঐশ্বর্যশালী ব্যক্তি আজম খা চৌধুরীর কোনো পুত্রসন্তান ছিল না। চার মেয়ের মধ্যে একজনের বংশধর ছিলেন দায়েম চৌধুরী। এক সময়ে দায়েম চৌধুরী তার ছেলে কামেল চৌধুরীকে সঙ্গে নিয়ে লাউড় পরগনার মানসী গ্রামে (মানি গাঁও) বসতি স্থাপন করেন। এক প্রলয়ংকরী ভূমিকম্প, ঝড় ও বন্যায় মানসী গ্রামের বাসিন্দারা ভীষণভাবে জানেÑমালে ক্ষতিগ্রস্ত হন। দায়েম চৌধুরী ও কামেল চৌধুরীর মৃত্যুর পর মানসী গ্রামে মহামারি আকারে কালাজ্বর দেখা দিলে কামেল চৌধুরীর ছেলে আবুল হোসেন চৌধুরী বিন্নাকুলি গ্রামে পাড়ি জমান। তখন তাদের পরিবার ছিন্নভিন্ন হয়ে যায়ÑÑএক অংশ বসতি স্থাপন করে মল্লিকপুর (বারভূইত) ও আরেক অংশ মোল্লাপাড়ায়। তাদেরই একজন চলে যান ময়মনসিংহের আঠারো বাড়ি। আবুল হোসেন চৌধুরীর বড় ছেলে ছিলেন আমার বাবা মকবুল হোসেন চৌধুরী ও ছোট ছেলে জেলা ও দায়রা জজ ইকবাল হোসেন চৌধুরী।বিন্নাকুলির অনতিদূরেই রয়েছে হিন্দু স¤প্রদায়ের তীর্থকেন্দ্র শ্রী শ্রী অদ্বৈত মহাপ্রভুর আশ্রম। পাশেই বাংলাদেশÑভারত সীমান্তের ওপারে খাসি পাহাড়ে হয়রত শাহজালাল (র.)Ñএর অন্যতম সঙ্গী হযরত শাহ আরেফিন (র.)Ñএর মোকাম।কথিত আছে, শাহ আরেফিন যখন নামাজ আদায় করতেন, তখন নাকি বন্য বাঘ তার পাশে শুয়ে থাকতো। শুধু তাই নয়, বনেÑজঙ্গলে বাঘের দেখা মিললে বাবা শাহ আরেফিনের দোহাই দিলে নাকি এই হিং¯্র জন্তু মাথা নিচু করে চলে যেতো।প্রতি বছর প্রায় একই সময়ে মোকামে অনুষ্ঠিত হয় পবিত্র উরস এবং যাদুকাটার তীরে বসে পণাতীর্থ বা বারুণির মেলা। দুই ধর্মের অগণিত ভক্তের পদভারে মুখরিত হয় নদীর উভয় তীর। পড়ন্ত বেলায় অস্তগামী সূর্যকিরণ যখন যাদুকাটার নীলাভ পানিতে বিচ্ছুরিত হয়, তখন এক মনোমুগ্ধকর পরিবেশের সৃষ্টি হয়। আমার নানাবাড়িও ঐ এলাকায়ই, নদীর ওপর পারে মোল্লাপাড়ায়। মার সঙ্গে আমার ভাই হোসেন তওফিক চৌধুরী, বোন আসমা হোমায়েরা চৌধুরী বেবী (প্রয়াত) ও আমি বহুবার রিয়াসত মাঝির নৌকায় চড়ে বিন্নাকুলি ও মোল্লাপাড়া গিয়েছি।বর্ষায় খরচার হাওরের মধ্য দিয়ে চলে যেতাম চারÑপাঁচ ঘন্টায়। কিন্তু হেমন্তে রক্তি নদী হয়ে ঘুরে গেলে সময় লাগতো প্রায় দেড় দিন। শক্তসামর্থ্য ও যুবকেরা চলাচল করতেন পদব্রজে। তবে বষস্ক পুরুষেরা গয়নার নৌকায় যাতায়াত করতেন। রাতভর দাঁড় টেনে মাঝিরা যাত্রীদের সুনামগঞ্জ পৌঁছাতো ভোরে। পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে চালু হয়েছে ‘ইঞ্জিন নৌকা’। কিন্তু পাকা রাস্তাঘাট হয়ে যাচ্ছে সর্বত্র। ফলে অচিরেই এই ‘ইঞ্জিন নৌকা’ অতীত স্মৃতিরখাতায় নাম লেখাবে।বোধকরি ১৯৬০ সালে আমি সাহস করে একবার পায়ে হেঁটে দাদাবাড়ি ও নানাবাড়ি গিয়েছিলাম। সেটাই ছিল আমার পদব্রজে প্রথম ও শেষ লাউড় ভ্রমণ। সুনামগঞ্জ শহর থেকে খেয়া নৌকায় সুরমা নদী পার হয়ে প্রথমে সদরগড় ও ভাদেরটেক। তারপর খরচার হাওরের মাঝখানের মেঠোপথ পার হয়ে গিয়ে উঠলাম পলাশ বাজারে। পায়ে হাঁটার যাত্রীরা এখানে কিছুক্ষণ জিরিয়ে নিতেন। আমরাও তাÑই করলাম। সবাই পলাশ থেকে কারেন্টের বাজার ও ইকরাটিয়া হয়ে বিন্নাকুলি যায়। কিন্তু আমাদের গৃহকর্মী আলতাফ আলী (ঝাড়– মিয়া) আমাকে মল্লিকপুর, মুক্তিখলা, বিশ্বম্ভরপুর বাজার, দুর্গাপুর, উলাশ নগর ও ইকরাটিয়া হয়ে বিন্নাকুলি নিয়ে গেল। মনে আছে, আমরা বিশ্বম্ভরপুর বাজারেও কিছুক্ষণ বিশ্রাম নিয়েছিলাম। মাত্র কয়েকটি ছনের চালা ছিল বিশ্বম্ভরপুর বাজারে। আমার বাবা আসামের এম এল এ ও হুইপ মকবুল হোসেন চৌধুরীর ঐকান্তিক চেষ্টায় ১৯৩৮ সালে আমন জমির আইল কেটে এবং স্থানে স্থানে বাঁশের পুল তৈরি করে সুনামগঞ্জের সুরমা নদীর উত্তর পার থেকে যাদুকাটা নদীর পূর্ব পার পর্যন্ত হৈমন্তিক বাস সার্ভিস চালু হয়েছিল। মকবুল হোসেন চৌধুরী তাঁর এলাকার লোকজনকে বলেছিলেন, ‘ইনশাল্লাহ, রাস্তা হবে এবং আমি গাড়ি চড়ে এখানে আসব’। তিনি কথা রেখেছিলেন। কিন্তু আট বছর পর বাস চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। ফলে এলাকার বাসিন্দারা আগের মতো হেমন্তকালে ২১ কিলোমিটার পথ পাঁয়ে হেঁটেই সুনামগঞ্জ সদরে যেতেন। এখন রাস্তায় মোটর গাড়ি চলে। পলাশÑধনপুরÑআনন্দবাজার হয়ে বিন্নাকুলি যাওয়া যায়। এলাকার বেকার যুবকেরা মোটর সাইকেল সার্ভিস চালু করেছে। একবার চড়েছিলাম। বেশ কষ্টকর। তবে এই সার্ভিস খুব জনপ্রিয়। ভিয়েতনামের হ্যানয় ও হো চি মিন সিটিতে (সায়গন) এ রকম হাজার হাজার মোটর সাইকেল দেখেছি। তারা সস্তায় যাত্রী বহন করে। মকবুল হোসেন চৌধুরী যখন এমএলএ, তখন তিনি সুনামগঞ্জ লোকেল বোর্ডেরও সদস্য ছিলেন। তার চেষ্টায় নিয়ামতপুর হয়ে ওয়েজখালি-তাহিরপুর সড়ক নির্মাণের প্রকল্প নিয়ে কাজ শুরু হয়। সত্তর বছরের বেশি হয়ে গেছে, কিন্তু এই সড়কের নির্মাণ কাজ এখনও শেষ হয়নি।
ভাইবোন :আমারা ছিলাম আট ভাইবোন। বোন হাওয়া ও ভাই তা’হা জন্মের পরপরই মারা যান। অবশিষ্ট ছ’জন ছিলেন রোকেয়া চৌধুরী, ফারুক চৌধুরী, আসিয়া রওশন জাহান চৌধুরী, হোসেন তওফিক চৌধুরী, হাসান শাহরিয়ার ও আসমা হোমায়েরা চৌধুরী বেবী। বর্তমানে হোসেন তওফিক চৌধুরী ও আমি ছাড়া সবাই পরপারে। আমার বাবা বড় বোন রোকেয়া আপাকে ‘বড় মা’ বলে ডাকতেন।বড়আপা আমাকে খুব আদর করতেন। রাজরাণী, দৈত্যদানব ও ভ‚তের গল্প শুনিয়ে তিনি আমার মুখে একটি একটি করে ভাতের ‘নলা’ তুলে দিতেন এবং পরে ঘুমপাড়ানি গান শোনাতেন। আমার পেটে অসুখ লেগেই থাকতো। মা বলতেন, ‘তোর তো গন্যা পেট, কোনোদিন এ অসুখ সারবে না’। আসলেও তাই। এখনও হরেকরকমের পেটের অসুখে ভুগছি। ভারত বিভক্তির আগে চারদিকে স্বাধীনতার হাওয়া বইতে শুরু করে, সর্বত্র মিছিল ও গণসমাবেশ। গণভোটের মাধ্যমে সিলেট পূর্ববঙ্গে যোগ দিয়েছিল। মা বলতেন, আমাকে কোলে নিয়ে তিনি গণভোটে অংশ নিয়েছিলেন। বাড়িতে কাজের লোকের অভাব ছিল না। ডাক দিলেই কেউ না কেউ হাজির হতো। রান্নাবান্নার দায়িত্বে ছিলেন জুরণ ঝি। তাঁর হাতে যাদু ছিল। এত সুস্বাদু রান্না খুব কমই খেয়েছি। আমার মায়ের বিয়ের সময় তাঁর বাবা (আমার নানা) মোল্লাপাড়ার জমিদার হাজি মকবুল পুরকায়স্থ জুরণ ঝিকে সঙ্গে দিয়েছিলেন। সেই থেকে তিনি আমাদের সঙ্গে। পরে জুরণ ঝি আমাদের গ্রামের বাড়ি বিন্নাকুলিতে চলে যান এবং আজীবন আমার দাদী আজিজুন্নেসা চৌধুরীর সেবাশুশ্রƒষা করেন। দাদীর কোনো দাঁত ছিল না; কিন্তু পানসুপারি ছেঁচে মনের আনন্দে খেতেন। আমার নানা মকবুল পুরকায়স্থ আমাদের বাসায় এলে আমি খুব খুশি হতাম। তিনি বাঁধানো দাঁত খুলে খেতে বসতেন। দুধ, কলা ও গুড় ছিল তাঁর পছন্দের খাবার। আমি পাশে বসে পাত থেকে তুলে খেতাম। কি যে আনন্দ লাগতো ! জাফর আলী আমাকে কোলেপিঠে নিত। তার ঘাড়ে চড়তে আমার খুব ভালো লাগতো। আলতাফ আলী ঝাড়– মিয়া, সাধূর মা, দৈয়লির মা, দৈয়লি ও আরও দু’একজন ছিল, কিন্তু তাদের নাম এখন আর মনে নেই। একদিন আমাদের বাড়ির সকলের পরিচিত এক অসহায় গরীব লোক এলো, সঙ্গে দুই বা আড়াই বছরের এক শিশুসন্তান। ‘আম্মা, আমার পক্ষে মাÑমরা এই ছেলেটির লালনপালন সম্ভব নয়,’ এই উক্তি করে কান্নাঝরা কণ্ঠে আমার মার কাছে আকুতিমিনতি করে সে বললো, ‘আমি বেলায়েতকে আপনার কাছে রেখে গেলাম।’ মা কিছু বলতে চাইছিলেন, কিন্তু তার আগেই সে চলে গেল, আর কোনাদিন ফিরে আসেনি। আমার মার আদরে বেলায়েত (সবাই তাকে বিলাত বলে ডাকতো) বড় হতে লাগলো, আমাদের সঙ্গেই খেলাধূলা করতো। সে করাচিতে গিয়ে সরকারি চাকুরি পেয়েছিল, স্বাধীনতার পর বাংলাদেশে সেই চাকুরি ফিরে পায়। অবসর গ্রহণের পর সে পবিত্র হজব্রত পালন করেছে।
আমাদের বাড়ির বিরাট আঙ্গিনায় মেঝো বোন আসিয়ার সঙ্গে খেলতে আসত উল্টোদিকের বাসা থেকে বীরগাঁয়ের উকিল সাহেব রফিকুল বারি চৌধুরীর ভায়েস্তিরা। আমার তখন বাইরে যাওয়া নিষিদ্ধ। বড়রা বলতেন, একা বাইরে গেলে ‘খুজকর’ (ছেলেধরা) আমাকে ধরে নিয়ে যাবে। তাই আমিও মেয়েদের সঙ্গে গোল্লাছুট ও অন্যান্য খেলা খেলতাম। কিছুদিন পর মেঝো ভাই হোসেন তওফিক চৌধুরীর সঙ্গে বাইরে খেলতে যাওয়া শুরু করি। তওফিক ভাই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এম এ এবং এলএলবি পাস করে সাপ্তাহিক ও পরে দৈনিক ‘পূর্বদেশ’ পত্রিকায় কাজ করতেন। বিগত ১৯৭৫ সালে সরকার চারটি বাদে সব পত্রিকা বন্ধ করে দিলে তিনি সিনিয়র রিপোর্টার হিসেবে পদত্যাগ করেন। বর্তমানে তিনি সুনামগঞ্জ বারের একজন সিনিয়র অ্যাডভোকেট ও বিশিষ্ট কলাম লেখক। গত ২০১২ সালে তিনি, তাঁর স্ত্রী গুলনূর চৌধুরী, বোন আসমা হোমায়েরা চৌধুরী বেবী (প্রয়াত) ও তাঁর মেয়ে ডা. ফারহানা ইয়াসমিন চৌধুরী ঊর্মি পবিত্র হজব্রত পালন করেন। আমাদের ‘বাংলা ঘরের’ মেঝেতে পাড়ার অন্য ছেলেদের সঙ্গে মার্বেল, ক্যারম ও লুডু খেলতাম। আমরা ছোট দড়ির সাহায্যে লৌহ শলাকাযুক্ত ঈষৎ গোলাকার লাটিম মাটিতে ঘুরাতাম। আমাদের বাসায় কাঁঠালের দু’টো এবং একটি করে আম, লিচু, বড়ই ও লেওইরের গাছ ছিল। এই গাছগুলোর ফল বন্ধুরা তৃপ্তির সঙ্গে খেতো। এখনও আম গাছটি আছে, অন্যগুলো নেই। ঘুড়ি ওড়ানো খুব পছন্দ করতাম, কিন্তু পয়সার অভাবে অনেক সময়ই অন্যের ঘুড়ি ওড়ানো দেখে মনকে প্রবোধ দিতাম। ভাই তওফিক সূতায় মাঞ্জা দিয়ে প্যাচ খেলতো। আমাদের দুই ভাইয়ের মধ্যে খুব সখ্যতা ছিল, এখনও আছে। শীতকালে আমাদের বাসার পূবদিকে খালি যায়গায় পাড়ার বড় ভাইরা ব্যাডমিন্টন খেলতেন। আমরা বসে বসে দেখতাম, কখনও বা খেলতাম। বর্ষাকালে আমরা ছিপ দিয়ে মাছ ধরতাম। ১৯৫৪ সালের বন্যায় আমাদের আঙ্গিনায় পানি উঠে গিয়েছিল। আমরা একটি কলাগাছের ভেলা বানিয়ে মনের আনন্দে এদিকসেদিক যেতাম। ভাই তওফিক ও আমি ‘বাংলা ঘরের’ সামনেই বড়শিতে জিরের (কেঁচো) টোপ লাগিয়ে ছিপ পানিতে ফেলতাম। অসংখ্য ছোট মাছ আমাদের বড়শিতে ধরা পড়ত। মা বড়শিতে ধরা মাছ খেতেন না। বলতেন, ‘জিরের টোপে ধরা মাছ আমি ঘৃণা করি’। আকাশে মেঘ ডাকলে কৈ মাছ পানি থেকে ডাঙ্গায় উঠে আসত। সিলেটি ভাষায় একে বলে ‘কৈ মাছের উজাই’। কাঁটা বিধতে পারে এই ভয়ে ধরতে যেতাম না। তবে আমাদের বন্ধুরা পলো দিয়ে মাছ ধরতো। বর্ষার পানিতে পায়ের আঙ্গুলের চিপায় পচন ধরলে লাঠুম গাছের গুটা কেটে রস লাগাতাম, ভালো হয়ে যেত। বর্ষায় পানিতে ভেসে আসতো লাঠুম। লাঠুমে একটি কাঠি লাগিয়ে লাটিম খেলতাম। দেহের কোথাও কেটে গেলে আমের পাতার কস লাগিয়ে দিতাম, অচিরেই সেরে উঠতো। দাঁত নড়লে পেয়ারা গাছের কচি পাতা বেটে লাগাতাম, দাঁত নড়া বন্ধ হতো। বাসার সীমানার মধ্যেই পশ্চিমদিকে ছিল একটি বাঁশঝাড়। আমরা ভাবতাম, বাঁশঝাড়ে বোধকরি ভ‚ত আছে। বড় ঘর থেকে বেশ কয়েক গজ দূরে বাঁশঝাড়ের পাশেই টানা পায়খানা। ভ‚তের ভয়ে রাতের বেলা লন্ঠন হাতে কাউকে সঙ্গে না নিয়ে যেতাম না। বাসার ভেতরেই একটি তালাব (পুকুর) ছিল, পাড়ে কলাগাছ। আমাদের কাছে এর পানি ছিল পবিত্র। কারণ কলসিতে করে ছেঁকে এই পানি ঘরে তুললে আমরা পান করতাম। আমাদের নিজস্ব একটি টিউবওয়েল ছিল, কিন্তু পাইপের গভীরতা ছিল না। ফলে এই টিউবওয়েল দিয়ে পুকুর থেকে পানি তুলে কাপড় ধোওয়া, বাসন মাজা ও গোসল করা হতো। আমাদের বাসার পশ্চিমদিকে ছিল সরকারি পুস্করিণী। সেই পুকুরে সাঁতার শিখতে গিয়ে কত যে পানি গলাধঃকরণ করেছি তার হিসেব দিতে পারব না। স্কুলে যাওয়ার আগে আমরা সেখানে দল বেঁধে গোসল করতাম। আমাদের ‘বাংলা ঘরেই’ হাসন নগর প্রাথমিক বিদ্যালয়ের যাত্রা শুরু হয়। পরে পুকুর পাড়ে একুট ঘর তুলে তা স্থানান্তরিত হয়। অবশেষে কুরিয়ার পারের কাছে নিজস্ব ভবনে চলে য়ায়। আমার ছোটবোন বেবী এই স্কুলের ছাত্রী ছিল। আব্দুল কাদির আজীবন এই স্কুলে শিক্ষকতা করেছেন।
পর পর নির্বাচন করে বাবা অনেকটা নিঃস্ব হয়ে পড়লেন। পৈত্রিকসূত্রে প্রাপ্ত জমিজমাই ছিল একমাত্র সম্বল। আয় বলতে আর কিছু ছিল না। বড়বোনের বিয়ে হয়ে গেছে, স্বামী আব্দুস সামাদ খান একজন পুলিশ অফিসার। বাবার পক্ষে ছেলেমেয়েদের লেখাপড়ার খরচ মেটানো প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়ে। কোনো কোনো সময় স্কুলের টিফিনের দুই আনাও সবদিন পেতাম না। প্রতি মাসে সময়মতো স্কুলের বেতনও দিতে পারতাম না। নতুন কাপড় ছাড়াই আমরা ঈদ করতাম। একবার টাকা বিলম্বে জোগাড় হওয়ায় মনোরঞ্জন দাস অর্থাৎ মনাই দর্জির কাছ থেকে ঈদের দিন সকালে গিয়ে শার্ট নিয়ে এসেছিলাম। বাড়িতে এনে দেখি শার্টে বোতামই লাগানো হয়নি। এই অভাবঅনটনের মধ্যেই আমাদের সংসার চলতো, কিন্তু মুখ ফুটে আমরা কেউ অভিযোগ করতাম না। বাবাÑমা সব বুঝতেন, কিন্তু তাঁদেরই বা কি করার ছিল ?বাধ্য হয়ে বাবা হোমিওপ্যাথি চিকিৎসা শুরু করলেন। এতে তাঁর সংসার মোটামুটি চলে যেত।
অসম ভাগাভাগি :অবিভক্ত ভারতের আসাম প্রদেশের সিলেট জেলার পাঁচটি মহকুমার মধ্যে সুনামগঞ্জ ছিল একটি। পাকিস্তান সৃষ্টি হলে গণভোটের রায়ের ভিত্তিতে অনেকটা ‘অসম’ ভাগাভাগি হয়। করিমগঞ্জ ভারতে থেকে যায়; আর সিলেট, সুনামগঞ্জ, হবিগঞ্জ ও মৌলভীবাজার যুক্ত হয় পাকিস্তানে। এগুলো এখন জেলা। এই চার জেলার সমন্বয়েই গঠিত হয়েছে সিলেট বিভাগ। সিলেট জেলা আসাম প্রদেশে যোগদানের তিন বছর পর ১৮৭৭ সালের জানুয়ারি মাসে সুনামগঞ্জ মহকুমা সৃষ্টি হয়। ওপারে খাসিয়া পাহাড় ও ভারত। প্রকৃতি যেন নিজ হাতে ঢেলে সাজিয়েছে এই অঞ্চলটিকে। আমাদের ছেলেবেলায় অবহেলিত এই প্রান্তিক শহর বা ‘ভিলেজ টাউনে’ আধুনিক সভ্যতার তেমন ছোঁয়া লাগেনি। এখানকার আলো-বাতাসে আমি বেড়ে ওঠেছি, এখানেই কেটেছে আমার শৈশব, কৈশোর এবং যৌবনের প্রারম্ভ। আমাদের ছেলেবেলায় এই শহরে বিজলি বাতি ছিল না, পাখা ছিল না, ছিল না এসি, ফ্রিজ, মাইক্রোওয়েভেন, গিজার বা ওয়াশিং মেশিন। রিকশাই যেখানে ছিল না সেখানে প্রাইভেট কার আসবে কোত্থেকে ? এখন বাড়ির ঝি থেকে শুরু করে সবার হাতেই মোবাইল ফোন। তখন টেলিফোনই ছিল না। আজ যখন সুনামগঞ্জে যাই তখন আমি আমার কৈশোরের শহরটিকে খুঁজি, কিন্তু পাই না। হতাশ হই। ছায়াঢাকা, কোলাহলমুক্ত ও ছবির মতো এই শহরটি এখন আর নেই। এখন ভোরে বন্য পাখির কিচিরমিচির ডাকে ঘুম ভাঙ্গে না, কলসী কাঁখে কোন তরুণী নদী বা পুকুর থেকে পানীয়জল আনে না, পূজোর জন্যে শেষ রাতে ফুল চুরি করতে বাড়ি বাড়ি হানা দেয় না হিন্দু ছেলেমেয়েরা। পাড়ায়-পাড়ায় এখন আর ফুটবল টিম নেই, নেই সংস্কৃতি চর্চার বিশেষ কোন উদ্যোগ। যান্ত্রিক সভ্যতার ছোঁয়া লেগে হারিয়ে গেছে সুনামগঞ্জের সৌন্দর্য, হারিয়ে গেছে এর ঐতিহ্য। কিন্তু যা ছিল তা নিয়ে এই শেষ বয়সেও আমি গর্ব বোধ করি। দেশের অন্য কোথাও ছিল কি না জানি না, তবে ছায়াঢাকা, কোলাহলমুক্ত ও ছবির মতো সুন্দর আমার জন্মস্থানে ছিল সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি। জন্মেছিলাম ব্রিটিশ ভারতে, বড় হয়েছি পাকিস্তানে, কর্মজীবন শেষ করে অবসরের দিনগুলো কাটাচ্ছি বাংলাদেশে। তিন দেশের নাগরিকত্ব ! এই মহকুমার যোগাযোগ ব্যবস্থাও ছিল খুব খারাপ। হাওরের মধ্যে নির্মিত সিলেটÑসুনামগঞ্জ মহাসড়কে পাকা সেতু ছিল না, ছিল বাঁশের পুল। ফলে কমপক্ষে ১৩/১৪ বার যাত্রীদের গাড়ি থেকে নামতে হতো। বিকল্প পথ ছিল লঞ্চে ছাতক এবং সেখান থেকে ট্রেনে বা বাসে করে সিলেট।একবার বাবার সঙ্গে নৌকায় চড়ে সিলেট গিয়েছিলাম, থেকেছিলাম বন্দরবাজারে মুসলিম হোটেলে । সুনামগঞ্জ মোটরস্ট্যান্ড বা বাস স্ট্যান্ডটি ছিল সাবজেলের কাছে মাছ বাজারে। সাবজেলটি স্থানান্তরিত হয়েছে। মোটরস্ট্যান্ড থেকে শুধু সিলেটের গাড়ি যেত। সকাল ১১টার বাসটি ছিল মেইলÑÑসিলেট থেকে আসতো জরুরী সরকারি চিঠিপত্র ও দৈনিক পত্রিকাসমূহ। পত্রিকা হকারের নামছিল ঠাকুর। তিনি অত্যন্ত দ্রƒত পায়ে হেঁটে সারা শহরে পত্রিকা বিলি করতেন। পরে মোটরস্ট্যান্ডটি চলে যায় ডাকঘরের সামনে। কিছুদিন পর সরে যায় আরও উত্তরে। এরপর জামাইপাড়ায়। সেখানে ছিল অনেকদিন। অবশেষে স্থায়ীভাবে স্থানান্তরিত হয় ওয়েজখালিতে, সুনামগঞ্জের প্রবেশমুখে।
প্রকৃতপক্ষে সুনামগঞ্জ ছিল এক দ্বীপসদৃশ মহকুমা, প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের লীলাভ‚মি। তবে সুনামগঞ্জ ছিল নামেই শহর। আসলে উন্নত একটি ছায়াঢাকা গ্রাম। এই গ্রামীণ শহরের নৈসর্গিক দৃশ্য খুবই মোহনীয়। সর্বত্র গাছগাছালি। রাতে কানে আসতো ঝিঁঝিঁ পোকার শব্দ ও শিয়ালের হুক্কা হুয়া ডাক; আর ভোরে ঘুম ভাঙ্গতো পাখির কলকাকলিতে। ঢাকার সংবাদপত্র পৌঁছতো পরেরদিন সন্ধ্যার পর। বেশিরভাগ লোকের বাড়িতে রেডিও ছিলো না। তাই দু’দিনের বাসি খবর টাটকা মনে করে সবাই তৃপ্তির সঙ্গে পড়তেন। এই শহরে সবাই গদাইলস্করি চালে চলে। যেন কারো কোন কাজ নেই, নেই কোন অভাব। অবসর জীবন যাপনের জন্যে একটি উৎকৃষ্ট শহর।রাজধানী ঢাকার কর্মকর্তাদের দৃষ্টি সিলেটে এসে থেমে যায়, অবহেলিত এই জনপদের দিকে নিবদ্ধ হতো না। মহকুমা সদরে পাকা ঘরবাড়ির সংখ্যা ছিলো খুব কম। বেশিরভাগ বাড়ির ছাদ টিনের। ছনের ঘরের সংখ্যাও ছিল অনেক। মানুষের আয়ের উৎস সীমিত। তবে তারা অভাবী ছিল না, গ্রামের জমির ধান বিক্রি করে স্বাচ্ছন্দ্যেই শহরে বাস করতো; প্রধানত সন্তানদের লেখাপড়ার জন্যে। গ্রামাঞ্চলের জনগোষ্ঠীর প্রধান পেশা কৃষিকাজ। রকমারী রবিশষ্যও উৎপন্ন হতো এখানে। তবে আয়েশী সুনামগঞ্জ মহকুমাবাসীবাসী বিরাট চাষযোগ্য এলাকা অনাবাদী রেখে দিয়েছিলো। হিন্দুরা ছিলো মৃৎশিল্প ও বেতের কাজে পারদর্শী।
ছয় ঋতুতে সুনামগঞ্জ : গ্রীষ্মের খরতাপের সঙ্গে ছিল কাল বৈশাখী, তুফান বা ঝড়ের তাÐবলীলা। একবার প্রচÐ ঝড় হচ্ছে। আমরা সবাই বড়ঘরে একত্র হয়ে আল্লাহর নাম নিয়ে তাঁর কৃপা কামনা করছি। হঠাৎ তাকিয়ে দেখি ঘরের টিনের চাল উড়ে গেছে। বৃষ্টিতে হাঁটুসমান পানি হয়ে গেল ঘরে। শহরে তখনও পাকা রাস্তা হয়নি। কোনো কোনো রাস্তা ইট বিছানো ছিল। তবে একবার ইট উঠে গেলে আর নতুন ইট বসানোর কথা কেউ ভাবত না। খানাখন্দক মেরামতের কোনো চেষ্টাই ছিল না। বৃষ্টির দিনে কষ্ট হতো বেশি। তবে এসব শহরবাসীর গা-সওয়া হয়ে গিয়েছিল।বর্ষায় এক অপরূপ রূপে সজ্জিত হতো ভাটির জেলা সুনামগঞ্জ। কুÐলি পাকিয়ে বড়, মাঝারি ও ছোট আকারের মেঘ আকাশের এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে বিচরণ করতো। যখন ইচ্ছে ঝরে পড়তো, শুরু হতো মুষলধারে বৃষ্টি। মনে আছে, একবার এক নাগাড়ে সাত দিন বৃষ্টি হয়েছিল। শ্রাবণের বারিধারায় মানুষের মন উদাস হয়ে যেতো, যেমনটি হয়েছিল কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের :
‘এমন দিনে তারে বলা যায়
এমন ঘনঘোর বরিষায়।
এমন দিনে মন খোলা যায়
এমন মেঘস্বরে বাদল ঝরোঝরে
তপনহীন ঘন তমসায়।।…
ব্যাকুল বেগে আজি বহে যায়
বিজুলি থেকে থেকে চমকায়।’
চারদিকে পানি আর পানি। যে স্থানটিতে এখন কলেজ হয়েছে তা ছিল ধানি জমি। রংÑবেরংÑএর পাল তুলে নৌকা আসতো। বীর গাঁয়ের জমিদার ওয়ারিস চৌধুরী তার ছেলে এডভোকেট রফিকুল বারী চৌধুরীর হাসন নগরের বাসায় আসতেন পান্সি নৌকা চড়ে। আমাদের বাসার সামনের রাস্তাটি জলমগ্ন হয়ে যেতো। আমাদের বাসার পূর্বদিকে কয়েক গজ দূরে একটি খাল ছিল। এর কোনো নাম ছিল না। এই খালে নৌকা নিয়ে আসতো রিয়াসত মাঝি। বাংলাঘরের কাছ থেকে এক কদম হেঁটেই আমার মা নৌকায় চড়তেন, যেতেন আমাদের পৈত্রিক গ্রাম যাদুকাটা নদীর তীরে অবস্থিত বিন্নাকুলি ও আমার নানার বাড়ি মোল্লাপাড়ায়। বিশ্বস্ত রিয়াসত মাঝি ঝাওয়ার হাওরের (প্রকৃত নাম জয়ার হাওর) এক পাশ দিয়ে গিয়ে কামার খালে পড়তেন। আর সেখান থেকেই সুরমা নদী। এখন আর এসব নেই, সব ভরাট ও দখল হয়ে গেছে। যেমনটি হয়েছে ঢাকার ধোলাই খালে। ধোলাই খাল না থাকায় ঢাকায় পানি নিষ্কাশনের সমস্যা হচ্ছে। তেমনি সুনামগঞ্জ শহরের পানিও নিজস্ব গতিতে বের হয়ে ঝাওয়ার হাওর বা সুরমা নদীতে গিয়ে পড়ছে না। ফলে শহরে জলাবদ্ধতা লেগেই আছে। রিয়াসত মাঝির বাড়ি ছিল লামাকাজির কাছে আমতইল (আমতলি) গ্রামে। আট নয় মাস সুনামগঞ্জের ঘাটে তাকে পাওয়া যেতো। শুষ্ক মৌসুমে বাড়ি চলে যেতেন। শশ্রæমÐিত রিয়াসত মাঝি তখন ভরা যৌবন পেরিয়ে প্রৌঢ়ত্বে পা দিয়েছেন। তারপরও মনের আনন্দে বৈঠা বাইতেন, গুণ টানতেন, আর ভাটিয়ালি গান গাইতেন সিলেটি সুরে। সফরে খাওয়ার প্রয়োজন হতো। কিন্তু তিনি এই দায়িত্ব কখনও তার তরুণ সঙ্গীকে দিতেন না। তার জানা ছিল ভাল ও সস্তা মাছ কিংবা সতেজ সবজি কোথায় পাওয়া যায়। ঠিকই নৌকা ভিড়িয়ে গিয়ে বাজার করে আনতেন। তার রান্নার প্রশংসা না করে পারা যায় না। যা কিছুই তিনি শানকিতে তুলে দিতেন, তাই ভাল লাগতো, তৃপ্তির সঙ্গে খেতাম। এতদিন পর মনে হচ্ছে এর স্বাদই ছিল আলাদা। এরকম সুস্বাদু খাবার খুব কম খেয়েছি। তখনকার দিনে সুরমা নদীর পানি ছিল স্বচ্ছ। এই পানি ব্যবহার করতেন রান্নাবান্না বা থালাবাসন ধোয়ার কাজে। এমনকি আমরা এই পানিই পান করতাম। কলেজ প্রতিষ্ঠা ও রাস্তা তৈরি হওয়ায় এখন ঝাওয়ার হাওর, কুরিয়া ও সোনাখালি (সোনা খাল) হয়ে কোনো নৌকা আমাদের পাড়ায় আসে না। যেখানে নৌকা ভিড়তো এই জায়গাটি ছিল আমাদের। যারা কিনেছেন তারা বহুতল ভবন নির্মাণ করেছেন। কে বলবে এককালে বর্ষার সময় এখানে নৌকা আসতো ? শরৎ ও হেমন্তে নতুন রূপ নিতো সুনামগঞ্জ। যে অনতিগভীর ভ‚ভাগ বর্ষায় জলমগ্ন হয় এবং হেমন্তে শুকিয়ে যায় তাকেই বলে হাওর। হাওরের যে অংশে হেমন্তে পানি থাকে সেই গভীর অংশের নাম বিল। এরই অপর নাম হৃদ। ঝাওয়ার হাওরে লক্ষণছিড়ির জমিদার দেওয়ান আনোয়ার রাজা চৌধুরীর বিল ছিল। প্রতি তিন বছর পর পর সেখানে মাছ ধরা হতো। এজন্য সেখানে অস্থায়ীভাবে ‘খলা’ স্থাপন করা হতো। আমাদের চোখের সামনে দিয়ে সারি বেধে ট্রাক এসে মাছ বোঝাই করে চলে যেত সিলেটে। এত মাছ হতো এই বিলে; কিন্তু সুনামগঞ্জবাসীর ভাগ্যে তা জুটতো না। বলতে গেল বাজারে ভাল মাছই পাওয়া যেতো না। অগ্রহায়ণ মাসে ধান কাটার ধুম পড়তো। ফরিদপুর, নোয়াখালী, ময়মনসিংহ প্রভৃতি জেলা থেকে কামলারা আসতো ধান কাটতে। সিলেটি ভাষায় তাদের বলা হয় ‘ভাগালু’। বর্তমান কলেজ এলাকায়ও এই দৃশ্য দেখা যেতো। ধান কাটা ও মাড়া দেয়া শেষ হলে কৃষকেরা আমোদÑফঁ‚র্তি করতো। গানÑবাজনা এবং নতুন ধানের চাল দিয়ে ‘রুট’ পিঠা তৈরি করে গান গেয়ে গেয়ে এক সঙ্গে বসে খাওয়া এই উৎসবের অংশ ছিল। শীতের প্রকোপ বোধহয় তখন একটু বেশিই ছিল। সেপ্টেম্বরের মাঝামাঝি থেকে জানুয়ারিÑফেব্রæয়ারি পর্যন্ত শীত থাকতো। শীতে ঝাওয়ার হাওরে ঝাঁকে ঝাঁকে পাখি আসতো সাইবেরিয়া থেকে। তখন পাখি শিকারে নিষেধাজ্ঞা ছিল না। ফলে পাখি শিকারের মহোৎসব চলতো শীত মৌসুমে। পদস্থ সরকারি কর্মকর্তা থেকে শুরু করে বিভিন্ন শ্রেণীÑপেশার লোকেরা মহানন্দে অতিথি পাখি, বিশেষ করে সাইবেরিয়ান ডাক বা হাঁস, লেঞ্জা, অটা ইত্যাদি পাখি শিকার করতেন ঝাওয়ার হাওরে। পাকিস্তানের দৌর্দন্ড প্রতাপশালী প্রেসিডেন্ট জেনারেল (পরে ফিল্ড মার্শাল) আইয়ুব খান একবার পাখি শিকার করতে আসেন পাগলা বাজারের কাছে দেখার হাওরে। প্রভুকে খুশি করার জন্য তদানীন্তন পূর্ব পাকিস্তানের গভর্ণর তথাকথিত ‘লৌহমানব’ মোনায়েম খান নির্দেশ দিলেন, পাখি ধরে পা বেঁধে হাওরে ছেড়ে দিতে। উড়তে না পেরে পাখি থাকলো পানিতে, আর প্রেসিডেন্ট সাহেব মহাসুখে হত্যাযজ্ঞ চালালেন। পরে ঢাকায় গিয়ে এই মাংস দিয়ে বিশেষ ভ‚রিভোজ করলেন। শীতে গাছের পাতা ঝরে পড়লেও বসন্তে আবার তা গজিয়ে উঠতো। সব জায়গায় সবুজের সমারোহ। মধু আহরনের জন্য মৌমাছিরা ফুলে ফুলে ঘুরে বেড়াতো, মাঠভর্তি সরিষার ফুল এক অপূর্ব শোভা বর্ধন করতো। হইরোলুটি নামে এক প্রকারের ছোট পাখি সরিষার ফুল খেয়ে যেতো। কোকিলের কুহু কুহু ধ্বনি ও অন্যান্য পাখির কলরবে প্রত্যুষে ঘুম ভাঙ্গতো। মনে হতো, ঋতুরাজ বসন্তে প্রকৃতি বোধকরি নিজ হাতে এক নতুন পোষাকে সাজিয়েছে সুনামগঞ্জকে।
বিশিষ্ট ব্যক্তিবর্গ : শিক্ষার ক্ষেত্রে সুনামগঞ্জ বেশ অগ্রসর ছিল। মহকুমা সদরের বিশিষ্ট ব্যক্তিরা ছিলেন সরকারি কর্মচারি, উকিল, মোক্তার, ডাক্তার, শিক্ষক ও ব্যবসায়ী। অন্যান্য শিক্ষিত ও গণ্যমান্য ব্যাক্তির মধ্যে ছিলেন সাবেক মন্ত্রী মুনাও’ওর আলী ও অক্ষয়কুমার দাশ; সাবেক এমএলএ আব্দুল বারী চৌধুরী, মফিজ চৌধুরী ও আব্দুল খালিক আহমদ, লক্ষণছিড়ির জমিদার দেওয়ান আনোয়ার রাজা চৌধুরী, পলাশের জমিদার ও সুনামগঞ্জের প্রথম পৌর চেয়াম্যান রায়বাহাদুর অমরনাথ রায়, জমিদার দেওয়ান উবেদুর রেজা চৌধুরী, অধ্যক্ষ দেওয়ান মোহাম্মদ আজরফ, পৌর চেয়ারম্যান আবু হানিফা আহমদ (নওয়াব মিয়া),অ্যাডভোকেট জিতেন্দ্রনাথ রায় (চারুবাবু), রফিকুল বারি চৌধুরী, মুজিবুর রহমান চৌধুরী, সুরেশচন্দ্র চৌধুরী, আজিজুর রহমান ও জামিনীকান্ত দেব; রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব হোসেইন বখত ও সাংবাদিক আব্দুল হাই প্রমুখ। বিশিষ্ট মোক্তারদের মধ্যে ছিলেন হেমচন্দ্র চৌধুরী, আব্দুল আজিজ, জামিনীকুমার শ্যাম, আবুল হোসেন চৌধুরী, সুধীরচন্দ্র চৌধুরী, আব্দুল আহাদ চৌধুরী, নানু মিয়া, আসদ্দর আলী, আজব আলী প্রমুখ।
চৈত্র মাস শেষ হতে না হতেই ব্যবসায়ীরা হালখাতা তৈরি করে পাওনাদারদের তাগদা দেওয়া শুরু করতেন। এতে ভালো সাড়া পাওয়া যেত। হিন্দু ও মুসলমান ব্যবসায়ীগণ জাঁকজমকের সঙ্গে হালখাতা পালন করতেন। হিন্দুদের দোকানে মিষ্টান্ন পরিবেশন করা হতো, মুসলমানগণ আয়োজন করতেন মিলাদ শরিফের। ‘ইয়া নবী সালামালাইকা’ বলে দাঁড়িয়ে কিয়াম করতে খুব ভালো লাগতো। এখন তো মিলাদ শরিফ উঠেই গেছে। এর বদলে বলা হয় দোয়া মাহফিল। এই দুই অনুষ্ঠানে সকলের জন্য ছিল অবারিত দ্বার। আমরা দল বেধে যেতাম। শহরের বিশিষ্ট ব্যবসায়ীগণ ছিলেন হাজি তৈয়ব আলী, নূর মিয়া, লাল মিয়া, খোদাবক্স, গুলিস্তান প্রেসের মালিক আফাজউদ্দিন আহমদ, রাধারমণ দাস, নেপালচন্দ্র রায়, মাহমুদ আলী, আসদ্দর চৌধুরী, আব্দুল বারী, আব্দুর রাজ্জাক, আব্দুল হামিদ, রোকসানা হোটেলের মালিক ইন্তাজ মিয়া, বিষ্ণুপদ রায়, জগন্নাথ রায়, নূরজাহান সিনেমা হলের মালিক নসর মিয়া। সমাজসেবক ও জমিদার মন্মথনাথ রায় (পিলুবাবু) সখ করে হোমিওপ্যাথি প্রাকটিস করতেন। তবে কোনো রোগীর কাছ থেকে টাকা নিতেন না। তিনি শহরে তাঁর বাসভবনের একাংশ সুনামগঞ্জ মহিলা সমিতিকে দান করে গেছেন। একাত্তরের মহান মুক্তিযুদ্ধের সময় পাক হানাদার বাহিনি এই নিবেদিতপ্রাণ সমাজসেবীকে নির্মমভাবে হত্যা করে। সাংস্কৃতিক সংগঠক ও শিল্পী মনোরঞ্জন চৌধুরী (রঞ্জুবাবু), সুনু মিয়া, উজির মিয়া, আব্দুর রহিম, তরণীকান্ত দে, ফারুক চৌধুরী, বশির আহমদ, দেওয়ান মহসিন রাজা, অমিয়েশ চক্রবর্তীর অবদান অনস্বীকার্য। এক অপূর্ব শ্রদ্ধার নিদর্শন দেখিয়েছিলেন শহরের বিশিষ্ট ব্যবসায়ী রাধারমন দাস। পৌর চেয়ারম্যান আবু হানিফা আহমদ (নওয়াব মিয়া), লক্ষণছিড়ির জমিদার আনোয়ার রাজা চৌধুরীসহ শহরের বেশ কয়েকজন বিশিষ্ট ব্যক্তি বিকেলে বাজারে তার দোকানে (বর্তমান দাস ব্রাদার্স) আড্ডায় বসতেন। নওয়াব মিয়ার বসার জন্য রাধারমন একটি চেয়ার তৈরি করেন। এই চেয়ারে শুধু নওয়াব মিয়াই বসতেন। অন্য কাউকে বসতে দেওয়া হত না। নওয়াব মিয়ার মৃত্যুর পর রাধারমন চেয়ারটি তার বাড়িতে পাঠিয়ে দেন। নওয়াব মিয়ার ছেলে অ্যাডভোকেট হুমায়ুন কবির জাহানূর (প্রয়াত)ও রাধারমনের ছেলে রঞ্জিতকুমার দাস কটির সঙ্গে সুসম্পর্ক বজায় রাখেন।
শহরে ডাক্তার ছিলেন পাঁচজনÑÑডা. রাধিকা রঞ্জন চৌধুরী, ডা. আহমেদ রেজা (বিহারি ডাক্তার), ডা. আবুল লেইছ, ডা. আব্দুল মুয়িদ পীর ও ডা. সতীশচন্দ্র দাস। ডা. রাধিকা রঞ্জন চৌধুরী কলকাতা থেকে এমবি পাস করেন। দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের সময় তিনি ব্রিটিশ সেনাবাহিনীর ক্যাপ্টেন ছিলেন। তিনি সুনামগঞ্জ কলেজে জীববিদ্যা বা বায়োলজি পড়াতেন। তিনি সব সময় কেতাদুরস্ত থাকতেন, কড়া ইস্ত্রি করা কাপড় পরতেন। তিনি প্রয়োজনে অস্ত্রোপচারও করতেন। তাঁর ভিজিট ছিল পাঁচ টাকাÑÑঅন্যদের তুলনায় অনেক বেশি। প্রতিটি রুগী দেখে তিনি সাবান দিয়ে হাত ধুইতেন। ¯ø্পভাষী রাধিকা বাবু আমার মায়ের ডাক্তার ছিলেন। তাঁর মুল বাড়ি ছিল হবিগঞ্জে। উর্দুভাষী বলে ডা. আহমেদ রেজা বিহারি ডাক্তার হিসেবে সমধিক পরিচিত ছিলেন। পঞ্চাশের দশকে তিনি সহকারি সার্জন হিসেবে সুনামগঞ্জ হাসপাতালে বদলি হয়ে আসেন। তিনি ছিলেন এলএমএফ (লোয়ার মেডিক্যাল ফেলো) ডাক্তার। তিনি খুব অমায়িক, ফুর্তিবাজ ও বন্ধু বৎসল ছিলেন। সব সময় টাই পরতেন। আমার বড় দুলাভাই আব্দুস সামাদ খান সুনামগঞ্জে গেলে তাঁকে একটি টাই উপহার দিতেন। চাকুরিতে ইস্তফা দিয়ে তিনি সুনামগঞ্জেই স্থায়ীভাবে বসবাস শুরু করেন। মাথায় হেট পরে এবং সাইকেলে চড়ে তিনি গ্রামে গিয়েও রোগী দেখতেন। তিনি অত্যন্ত জনপ্রিয় চিকিৎসক ছিলেন। ডা. আবুল লেইছ, ডা. আব্দুল মুয়িদ পীর ও ডা. সতীশচন্দ্র দাস খুব দরদ দিয়ে রোগী দেখতেন। রাইচরণ দে কম্পাউন্ডার হলে কি হবে, আশেপাশের গ্রামে তাঁর চিকিৎসা ভালোই ছিল। কয়েকজন নামকরা হোমিওপ্যাথও ছিলেন। কবিরাজি চিকিৎসার জন্য ছিল সাধনা ঔষধালয়। শহরে তখনও চুল কাটার সেলুন চালু হয়নি, ক্ষৌরকারগণ বাড়ি বাড়ি গিয়ে চুল কাটতেন। এমনি একজন ছিলেন দয়াল। আরেকজন নিজের চুল কাটতেন না, তার লম্বা চুলের খোপা ছিল। আমরা তাকে ‘খোপালাসি’ বলে ডাকতাম। আসল নামটা কখনও জানার চেষ্টা করিনি। তবে বাবা ঠাট্টা করে তাদের কখনও বলতেন নরসুন্দর, কখনও বা চন্দ্রবৈদ্য।
ফুটবল খেলা : খেলাধূলার দিক দিয়ে সুনামগঞ্জ মোটামুটি এগিয়ে ছিল। আজাদী ও মোহামেডান ক্লাবের মধ্যে ফুটবল ফাইনাল খেলা উপভোগ করার জন্য এÑটিম ফিল্ডে (বর্তমানে স্টেডিয়াম) শত শত দর্শক আসতেন। অনেকটা ঢাকার আবাহনী ও মোহামেডান ক্লাবের মতো। দুই টিমই শক্তিশালী ছিল। তবে প্রয়োজনে তারা সিলেট থেকে খেলোয়াড় ‘হায়ার’ করতো। একবার আজাদী জিতলে পরের বার হয়তো মোহামেডান ক্লাব জয়লাভ করতো। নামকরা খেলোয়াড়দের মধ্যে ছিলেন হারুনূর রশিদ চৌধুরী, হাসিনূর রশিদ চৌধুরী, বাবন মিয়া, লালশাদ, আবুল কালাম, আসদ্দর ভুইয়া, গোলাম জিলানী চৌধুরী (কন্টর), লেচুয়া, শমশের আলী, আবুল মিয়া, নূরুল হক আম্বিয়া, আব্দুস সালাম, সাইফুল ইসলাম প্রমুখ। দুই টিমেরই উৎস ছিল লক্ষণছিড়ি ও আরফিন নগর। মেথরবাড়ির ছেলে লেচুয়ার কর্ণার কিক এখনও আমার মনে ভাসে। সেন্টার ফরোয়ার্ড আবুল কালামের কাছে বল গেলে সুন্দর প্যাচ খেলে জালে ঢুকিয়ে দিতেন। লালশাদ ও আম্বিয়া গোলকিপার ছিলেন। তখনকার দিনে গোলকিপার লালশাদ আউটের বল জায়গামতো বসাতেন আর কিক করতেন ডিফেন্ডার বাবন মিয়া। কন্টরও খুব ভালো খেলতেন। আজাদী টিম শোভাযাত্রা সহকারে মাঠে যাওয়ার সময় সরকুম আলী পীর একটি লাঠি হাতে নিয়ে সর্বাগ্রে থাকতেন।
শিক্ষায় হাতেখড়ি :গত শতাব্দীর পঞ্চাশের দশকের শুরুতে তওফিক ভাই ও আমি এইচএমপি (হাজী মকবুল পুরকায়স্থ) এমই মাদ্রাসার মক্তবে (এখন হাইস্কুল) ভর্তি হই। এখানেই আমাদের শিক্ষার হাতেখড়ি। এই মাদ্রাসাবা স্কুলের প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন আমাদের নানা হাজী মকবুল পুরকায়স্থ। ষোলঘরের আব্দুস সোবহান পীর ছিলেন মক্তবের একজন নিবেদিতপ্রাণ এবং কড়া শিক্ষক। মক্তবের পাঠ শেষ হলে ভর্তি হই এমই মাদ্রাসায়। মাইজবাড়ির মর্তুজা আলী পীর, শাহাবুদ্দিন পীর, বিশ্বেশ্বর দাস প্রমুখ ছিলেন এমই মাদ্রাসার শিক্ষক। আমাদের বিদ্যালয়ের উত্তর পাশেই ছিল সুদৃশ্য টাউন মসজিদ। অনেকটা কোর্ট-আদালতের গা-ঘেঁষে অবস্থান ছিল বলেই এর অপর নাম কোর্ট মসজিদ। এখন নাম হয়েছে কেন্দ্রিয় জামে মসজিদ। স্কুলে যাওয়া শুরু হতে না হতেই আরবি শেখার হুকুম হলো। দুই ভাই প্রথমে কায়দা এবং পরে সিপারা (আমপাড়া) ও কোরআন শরিফ পড়তে রোজ সকালে এক ঘন্টার জন্য টাউন মসজিদে যেতাম। ইমাম ছিলেন দরবেশতুল্য হাফেজ মাওলানা সৈয়দ আলকাব আলী। তাঁর বাড়ি ছিল জগন্নাথপুরে। আমরা বাসা থেকে সকালে হেঁটে যেতাম মসজিদে। ফিরে এসে গোসল করে রাতের বাসি তরকারি ও আলু ভর্তার সঙ্গে গরম ভাত খেয়ে দল বেঁথে পদব্রজে ছুটতাম স্কুলে। তখনকার দিনে বৃহত্তর সিলেটের অধিকাংশ সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবারের কর্তারা মনে করতেন ধর্ম সম্পর্কে ছেলেমেয়েদের প্রাথমিক জ্ঞানদান তাদের পবিত্র কর্তব্য। কারণ একটু বয়স বাড়লে ছেলেমেয়েদের মধ্যে পরিবর্তন আসে এবং ধর্ম শিক্ষার ব্যাপারে আগ্রহ কমে যায়। অতএব এ ব্যাপারে যা তালিম দেওয়ার তা শুরুতেই দিতে হবে। ছেলেমেয়েদের স্কুলের লেখাপড়ার সঙ্গে যোগ হত নামাজ শেখা এবং পবিত্র কোরআন শরিফের কয়েকটি সুরা মুখস্থ করা। সেই সঙ্গে বাধ্যতামূলক ছিল রমজান মাসে রোজা রাখা। আমাদের পরিবারও এর ব্যতিক্রম ছিল না। মসজিদে ইমাম সাহেব ছাড়াওদু’জন হুজুর আমাদের পড়াতেন। তাদের অক্লান্ত চেষ্টায়ই আমরা নামাজ পড়া শিখলাম। শেষ বয়সে এসে আজ উপলব্ধি করছি বাল্যকালের এই শিক্ষাটি ছিল অত্যন্ত প্রয়োজনীয়। ২০০০ সালে পবিত্র হজব্রত পালন করার পর নিয়মিত নামাজ পড়তে শুরু করলাম। কোরআন শরিফ পড়তে গিয়ে দেখলাম এই সুদীর্ঘ সময়ের ব্যবধানেও সবকিছু স্পষ্ট মনে আছে, শুধু উচ্চারণে খটকা লাগত। ছেলেবেলায় নামাজ পড়া রপ্ত না করলে হয়তো পরবর্তীকালে আর নামাজই পড়া হতো না।
দুই ভাই সরকারি জুবিলি হাইস্কুলে ভর্তি হলাম ১৯৫৬ সালেÑÑতওফিক সপ্তম শ্রেণীতে এবং আমি পঞ্চম শ্রেণীতে। আমাদের বড়ভাই ফারুক চৌধুরী এর আগেই জুবিলি স্কুল থেকে ম্যাট্রিক পাস করে বেড়িয়ে গেছেন। ইংল্যাÐের রানী ভিক্টোরিয়ার (১৮৩৭-১৯০১) সিংহাসনে আরোহনের রজত জয়ন্তী উদযাপন উপলক্ষে ১৮৮৭ সালেভারতবর্ষসহ ব্রিটিশ সা¤্রাজ্যের বিভিন্ন কলোনিতে অনেক ইংরেজি উচ্চ বিদ্যালয় স্থাপিত হয়। সে সময় সুনামগঞ্জ শহরে হাসন এম ই স্কুল নামে একটি বিদ্যালয় ছিল। এর প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন জমিদার ও মরমী কবি দেওয়ান হাসন রাজা। রানীর শাসনামলের রজত জয়ন্তীতে সুনামগঞ্জে একটি ইংরেজি স্কুল প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নিলেন স্থানীয় বিশিষ্ট ব্যাক্তিবর্গ ও প্রশাসন। হাসন এম ই স্কুলের অবলুপ্তি ঘোষনা করে একই জায়গায় বেসরকারি ব্যবস্থাপনায় সুনামগঞ্জ জুবিলি হাই ইংলিশ স্কুল প্রতিষ্ঠিত হলো। স্কুলটি যখন স্থাপিত হয় তখন মহকুমা শহর হলেও সুনামগঞ্জ ছিল জেলা সদর থেকে বিচ্ছিন্ন ছোট্ট এক দ্বীপসদৃশ বর্ধিষ্ণু জনপদ। ব্রিটেনের রাজা সপ্তম এডওয়ার্ড-এর পুত্র পঞ্চম জর্জ (১৮৬৫-১৯৩৬) ক্ষমতারোহন করেন ১৯১০ সালে। তিনি প্রাণত্যাগ করেন ১৯৩৬ সালে। তার রাজ্যাভিষেক উপলক্ষেও বাংলা প্রদেশের খুলনা, বগুড়া, নড়াইল ও চট্টগ্রাম জেলার ফটিকছড়িতে ইংরেজি উচ্চ বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হয়। এদের বলা হতো করোনেশন স্কুল। অবশ্য সিলেট জেলায় কোন করোনেশন স্কুল স্থাপিত হয়নি। প্রথমে এটি ছিল সুনামগঞ্জ জুবিলি হাই ইংলিশ স্কুল। কালের বিবর্তনে ‘ইংলিশ’ শব্দটি বিলুপ্ত হয়ে গেছে। এখন সুনামগঞ্জ সরকারি জুবিলি উচ্চ বিদ্যালয়।
জুবিলি স্কুল :এক মনোমুগ্ধকর প্রাকৃতিক পরিবেশের মধ্যে জুবিলি স্কুলের অবস্থান। উত্তর দিকে কয়েকশ’ গজ দূরে ¯্রােতস্বিনী সুরমা নদী। এই নদীতে জাহাজ চলাচল করতো। একটি জাহাজের হর্ণ ছিল কুকুরের ডাকের মতো। আমরা একে ‘কুত্তার জাহাজ’ বলে ডাকতাম। এসডিপিও-এর জাহাজের নাম দেয়া হয়েছিল ‘পুলিশ সাহেবের জাহাজ’। উত্তরে তাকালে দেখা যেতো আকাশ নেমে এসেছে খাসিয়াÑজয়ন্তিয়া পাহাড়ে। মনে হতো পৃথিবী বুঝিবা এখানেই শেষ হয়েছে। স্কুলের দক্ষিণে প্রশস্ত রাস্তা, শহরের প্রধান সড়ক। রাস্তার ওপারে শিক্ষা কর্মকর্তার অফিস। এক পাশে মহকুমা প্রশাসকের (এসডিও) কার্যালয় ও কোর্ট এবং অন্যপাশে ডাকবাংলো। অদূরেই টাউন মসজিদ। পূবদিকে খেলার মাঠ ও পশ্চিমদিকে একটি সরকারি পুকুর ও পৌরসভা। চারদিকেই রকমারি বৃক্ষ। তিনটি ভবনে ক্লাস হতো। প্রতিটি ক্লাসেই ‘এ’ ও ‘বি’ নামে দু’টি সেকশন ছিল। প্রথম ও দ্বিতীয় ভবনের মধ্যে ছিল একটি করিডর। বৃষ্টি হলে এসেম্বলি হতো সেখানে। বিজলি বাতি না থাকায় প্রতিটি ক্লাসেই ছিল টানাপাখা। একজন পার্টটাইম কর্মচারি সারাক্ষণ পাখার দড়ি টানতো। ভলিবল, বাস্কেটবল ও টেনিস খেলার জন্যে স্কুল চত্বরে তিনটি কোর্ট ছিল। অবশ্য ফুটবলের জন্যে পূবদিকে নিজস্ব মাঠ ছিল। এর নাম ছিল ‘বি-টিম ফিল্ড’। এখন সবাই বলে ‘বালুর মাঠ’। লন টেনিস কোর্টটি ব্রিটিশ আমলে তৈরি। শিক্ষক ও সিনিয়র ছাত্ররা সাদা পোষাক পড়ে খেলতেন। নিচের ক্লাসের ছাত্ররা বল কুড়িয়ে নিয়ে আসতো। সহকারি প্রধান শিক্ষক মোহাম্মদ আলি স্যার উৎসাহী ছাত্রদের খেলা শিখাতেন। এখন আর টেনিস কোর্টটির অস্তিত্ব নেই। ঠিক তেমনি দ্বিতীয় ভবনের কাঠের ফ্লোরও নেই। হিন্দু হোস্টেলও সরিয়ে নেয়া হয়েছে স্কুল চত্বরের বাইরে।
দশটা-চারটা স্কুল। সকালে ভাত খেয়ে যেতাম, বিকেলে ফিরে এসে খেতাম দুপুরের খাবার। যারা স্কুলের কাছাকাছি থাকতো, তারা বাসায় গিয়ে খেয়ে আসতো। টিফিনের বিরতিতে মসজিদে গিয়ে জোহরের নামাজ পড়া ছিল অনেকটা বাধ্যতামূলক। স্কুলে টিফিন দিতো, কিন্তু তা দিয়ে পেটের এক কোণাও ভরতো না। তাই টিফিন খাওয়ার জন্যে বাড়ি থেকে অতিরিক্ত দু’আনা বরাদ্দ ছিল। আগে ছিল ষোল আনায় এক টাকা। ষাটের দশকের শুরু থেকে এক শ’ পয়সায় এক টাকা। স্কুলের পিয়ন সুধীর দা খুব ভাল মিষ্টি তৈরি করতো। অল্পদামে ছাত্রদের খাওয়াতো। তখন স্কুলের প্রধান শিক্ষক ছিলেন কাজী সিরাজুল হক। আমাদের ক্লাসটিচার ছিলেন আব্দুল জলিল। গুরুদাস ভট্টাচার্য, শামসুল হুদা,হুমায়ূন মঞ্জুর চৌধুরী, অমিতাভ চৌধুরী পিনু, দেওয়ান শামসুল আবেদীন, শামসুল হুদা, প্রবীর চক্রবর্তী বাচ্চু, শ্যামলকান্তি চৌধুরী, দেওয়ান শেরজাহান, নাজমুল চৌধুরী, আব্দুর রব চৌধুরী শেলী, শেখর ভট্টাচার্য, সমীরণ, সৌরভ দাস, আজিমুর রহমান অলিÑউল কাইয়ুম, আব্দুল মুনিম চৌধুরী, শফিকুদ্দোজা আহমদ নেজাসহ অন্যরা বোধকরি তৃতীয় শ্রেণী থেকেই জুবিলি স্কুলের ছাত্র। ওদের পেলাম ক্লাশ ফাইভে। আজিরউদ্দিন আহমদ, মনোয়ার আলী, আব্দুল মতিন, আবুল খায়ের, মকবুল হোসেন এবং আরও কয়েকজন আমার মতো ফাইভে ভর্তি হলো। লিয়াকত হোসেন বড়ভুঁইয়া চতুর্থ শ্রেণীর পর চলে গিয়েছিল। সে এসে আমাদের সঙ্গে যোগ দেয় ৬ষ্ঠ শ্রেণীতে। যারা আগে থেকেই স্কুলে ছিল তারা প্রথমদিকে আমাদের পাত্তা দিতে চাইতো না। যেন তারা ব্রাহ্মণ! আর অন্য স্কুল থেকে এসেছি বলে আমরা নমঃশূদ্র! কিন্তু কিছুদিনের মধ্যেই আমরা সবাই খুব ভাল বন্ধু হয়ে গেলাম।
জলিল স্যার ছাড়া আমাদের ক্লাস নিতেন তিন স্যারÑÑআব্দুল কাইয়ুম চৌধুরী, আব্দুল মান্নান পীর ও মু. আব্দুর রহীম। আমরা ক্লাস ফাইভে থাকতেই দু’জন নতুন শিক্ষক এলেনÑÑকামিনীকুমার সিংহ ও শামসুদ্দিন আহমদ। কিছুদিনের মধ্যেই প্রধান শিক্ষক কাজী সিরাজুল হক বদলি হয়ে গেলেন। দায়িত্বভার নিলেন আব্দুল ওয়াহিদ চৌধুরী। সেদিন অর্ধদিবস ছুটি দিয়েছিলেন। তিনি বদলি হয়ে যান ১৯৫৭ সালে। তখন আমরা ৬ষ্ঠ শ্রেণীতে। তার স্থলে এলেন তফাজ্জল হোসেন। বেঁটে তবে ডাকসাইটে। সব সময় স্যুট-টাই পড়তেন। তাকে আমরা পেয়েছি অনেকদিন। তিনি খুব কড়া মেজাজের লোক ছিলেন। পিয়ন কালা দা, সুধীর দা, হরেন্দ্র দা কিংবা আকলাস ভাইকে সঙ্গে নিয়ে সকালে রাউÐে বের হলে ছাত্রÑশিক্ষক সকলেরই থরহরি কম্পন শুরু হতো। তবে ছাত্রদের লেখাপড়ার দিকে তিনি বিশেষ নজর দিতেন। তিনিই প্রথম ছুটির পর কোচিং ক্লাস চালু করেন। শিক্ষকরা কোনো আলাদা ভাতা পেতেন না। অবশ্য ছাত্ররা এক টাকা করে দিতো চাÑনাস্তার জন্যে। তফাজ্জল স্যার ১৯৬১ সালে ঢাকা কলেজিয়েট স্কুলে বদলি হয়ে চলে যান। কোন শিক্ষকের বদলি উপলক্ষে ফেয়ারওয়েল মিটিং হতো কাঠের ভবনে। কোন কোন বিদায়ী শিক্ষককে অঝোর কান্নায় ভেঙ্গে পড়তেও দেখেছি। এ ছিল আমাদের প্রতি তাঁদের ভালবাসার বহিঃপ্রকাশ। সিনিয়র ছাত্ররা চাঁদা তুলে তাঁদের উপহার দিতেন। তফাজ্জল স্যারের পরে এলেন আব্দুল গণি। আমরা যখন ম্যাট্রিক পরীক্ষা দিই তখন তিনিই ছিলেন প্রধান শিক্ষক। বাড়ি সিলেট শহরের মিরা বাজার। অত্যন্ত অমায়িক ব্যবহার ছিল তার। তিনি অতীত দিনের গল্প করতে ভালবাসতেন। কলকাতার দ্বারভাঙ্গা বিল্ডিং-এর গল্পটি ছিল তার খুব প্রিয়। যেদিন তার ক্লাস করতে আমাদের মুড হতো না, সেদিন আমরা তাকে কলকাতার গল্প শোনাতে বলতাম। খুশি হয়ে তিনি চলে যেতেন তার ফেলে আসা দিনগুলোয়। তিনি খুব মোটা ছিলেন। ‘জন গিলপিন’ কবিতাটি পড়ানোর সময় তিনিও ঘোড়সওয়ার গিলপিনের মতো দুলতেন। খুব হাসি পেতো আমাদের।
হিন্দু ছাত্রছাত্রীরা জাঁকজমকের সঙ্গে সরস্বতি পূজা পালন করতো। এই পূজা হতো স্কুল-কলেজ ও বিভিন্ন পাড়ায়। সরকারি জুবিলি হাইস্কুল ও সতীশচন্দ্র বালিকা বিদ্যালয়ে সরস্বতি পূজামÐপে মুসলমান ছাত্রছাত্রীরা যেতো। ঠিক তেমনি স্কুলের বার্ষিক মিলাদের বনরুটি ও তোষা হালুয়া খাওয়ার জন্য ভিড় করতো হিন্দু ছাত্রছাত্রীরা। আমার ভাই তওফিক ও আমি যখন প্রথম পূজা দেখতে যাই, তখন গুরুজনদের অনুমতি চেয়েছিলাম। তারা বললেন, ‘যেতে চাও, যাও। তবে তাদের পূজায় অংশ নিও না, দেবীকে প্রণাম করো না এবং দেবীর প্রসাদ খেয়ো না।’ কারণ জানতে চাইলে তারা বললেন, ‘এগুলো আমাদের ধর্মে নিষেধ আছে। বড় হলে সব জানতে পারবে।’ সেদিনই প্রথম বুঝলাম যে, হিন্দু ও মুসলমানের রীতিনীতির মধ্যে অনেক ফারাক। সুনামগঞ্জের হিন্দু-মুসলমানের মধ্যে সম্পর্ক ছিল ভ্রাতৃপ্রতীম। সাম্প্রদায়িকতার ছোঁয়া আগেও যেমন লাগেনি, এখনও না।
বাবার প্রয়াণ :ক্লাস সিক্সে বৃত্তি পরীক্ষা দেওয়ার দ্বিতীয় দিনে সিলেট থেকে খবর এলো আমার বাবা খুব অসুস্থ। তিনি তখন সিলেটে থাকেন, ‘সিলেট পত্রিকা’ নামে একটি সাপ্তাহিকের সম্পাদক। চলে গেলাম সিলেট। বাবাও ১৯৫৭ সালের ২০ ডিসেম্বর আমাদের ছেড়ে চলে গেলেন চিরতরে। বাবার অকাল মৃত্যু ছিল আমাদের জন্য ঈশান কোণে কালো মেঘের অশনি সংকেত, এক অন্ধকার ভবিষ্যতের ইঙ্গিত। কিন্তু সবার অলক্ষ্যে যিনি রিমোট কন্ট্রোলে সবকিছু পরিচালিত করেন, তার ইচ্ছে ছিল ভিন্ন। এই দুঃসময়ে পিতার অনুপস্থিতি বুঝতে না দিয়ে সংসারের দায়িত্বভার গ্রহণ করলেন আমাদের মহীয়সী জননী শফিকুন্নেসা চৌধুরী। তাঁর অদম্য উৎসাহ, বিরামহীন উদ্যম ও অহর্নিশ চেষ্টার ফলে আমরা একে একে সবাই মানুষ হলাম। তাঁর ছায়া, অফুরন্ত মায়াÑমমতা ও আশীর্বাদই আমাদের অগ্রযাত্রার পাথেয়। ১৯৯৩ সালের ২৬ জানুয়ারি তিনি আমাদের ¯েœহের বন্ধন ছিন্ন করে চলে যান ওপারে, যেখান থেকে কেউ আর ফেরে না। আমার একমাত্র চাচা ইকবাল হোসেন চৌধুরী মুন্সেফ (বর্তমান নাম সহকারি জজ) ছিলেন। ঐ সময় মুন্সেফদের ডিস্ট্রিক্ট ম্যানেজার ফর একোয়ার্ড এস্টেট হিসেবে বিভিন্ন জেলায় প্রেষণে পাঠানো হতো। চাচাকে পাঠালো পাবনায়। বাবার মৃত্যুর পর পরই তিনি আমার মেঝো বোন আসিয়া ও আমাকে কিছুদিনের জন্যে তাঁর কাছে নিয়ে যান। তখনকার দিনে শোকাহত পরিবারের প্রতি সমর্থন প্রদর্শন এবং পারিবারিক বন্ধন শক্তিশালী করার লক্ষ্যে বিভিন্ন পরিবারে এই রীতি চালু ছিলো। ভর্তি হলাম পাবনা জিলা স্কুলে, ক্লাস সেভেনে। ঐ বছরই (১৯৫৮) চাচা মুন্সেফ হিসেবে বদলি হলেন চট্টগ্রামের ফটিকছড়ি। গেলাম তাঁর সঙ্গে। চাচাতো ভাই ইশফাক হোসেন চৌধুরী ও আমি ভর্তি হলাম ফটিকছড়ি করোনেশন হাই ইংলিশ স্কুৃলে। ইশফাক ত্রিতে, আমি সেভেনে। ডিসেম্বরে বার্ষিক পরীক্ষার পর বড়ভাই আমাদের দুই ভাইÑবোনকে নিয়ে এলেন সুনামগঞ্জ। কিন্তু জুবিলি স্কুলে কোন সিট নেই। অগত্যা বুলচান্দ হাইস্কুলে ঠাঁই হলো। তবে মাসখানেক পরে একটি সিট পাওয়া গেল। ঘরের ছেলে ঘরে ফিরে এলাম, আবার ভর্তি হলাম জুবিলি স্কুলে, ক্লাস এইটে।
শফিকুল হক চৌধুরী স্যার ও চেরাগউদ্দিন আহমদ চৌধুরী স্যার খুব স্টাইলিস্ট ছিলেন। সদ্য ইস্ত্রি করা জামাকাপড় পড়তেন। চেরাগউদ্দিন স্যার ইংরেজি ও শফিকুল হক স্যার ইতিহাস পড়াতেন। ইসলামের ইতিহাস পড়াতে গিয়ে হুদায়বিয়ার সন্ধি প্রসঙ্গ এলেই শফিকুল হক স্যার যেন সে যুগে ফিরে যেতেন। খুব দরদ দিয়ে পড়াতেন তিনি। হরিচরণ স্যার তোতলা ছিলেন। কিন্তু যখন গান গাইতেন, তখন তোতলামি থাকতো না। স্যার অনেক হাসির গল্প শোনাতেন। মেট্রিক পরীক্ষার আগে তার কাছে প্রাইভেট পড়তাম জালাল আহমদ বুলবুল ও আমি। বুলবুলকে সাইকেলে করে নিয়ে যেতাম। স্যার খুব মনোযোগ দিয়ে আমাদের পড়াতেন। তবে ফাঁকে ফাঁকে গৃহস্থালী কাজ সেরে ফেলতেন। আমাদের অংক দিয়ে বলতেন, ‘তোমরা অংকটি করো, আমি একটু গাই খিরাইয়া আই’ (গাভী দোহন করা)। আমরা চুপ থাকতাম। শামসুদ্দিন আহমদ ছিলেন ফিজিক্যাল ইন্সট্রাক্টর। তাকে আমরা পিআই স্যার বলেই ডাকতাম। তিনি ছাত্রদের খুব প্রিয় শিক্ষক ছিলেন। কামিনীকুমার সিংহ ছিলেন মণিপুরী সম্প্রদায়ের লোক। তিনি অত্যন্ত নিবেদিতপ্রাণ শিক্ষক ছিলেন। শামসু মিয়া কাজী ছিলেন আরেকজন জাঁদরেল শিক্ষক। আমি অংকে খুব কাঁচা ছিলাম। তাই ম্যাট্রিক পরীক্ষার আগে কিছুদিন প্রাইভেট পড়েছিলাম তার কাছে। জোর করেও টাকা দিতে পারিনি। তিনি খেলাধূলায় খুব উৎসাহী ছিলেন। পিআই স্যার আসার আগে তিনিই ছিলেন খেলাধুলার দায়িত্বে। একবার বার্ষিক ক্রীড়া প্রতিযোগিতার সময় পিআই স্যার ও তার মধ্যে ঝগড়া বেঁধে গেলো। তিনি তো বাঁশ নিয়ে মারতে উদ্যত হয়েছিলেন পিআই স্যারকে। কিন্তু ব্যক্তিগত জীবনে তাঁরা উভয়ে খুব ঘনিষ্ট বন্ধু ছিলেন। আবুল হাসন স্যার অত্যন্ত নরম প্রকৃতির লোক ছিলেন। তবে জয়েনউদ্দিন স্যার রাগী ছিলেন।রেবতীমোহন ভট্টাচার্য আমাদের বাংলা পড়াতেন। তার ছেলে শেখর ছিল আমাদের সহপাঠী। স্যার অত্যন্ত প্রাঞ্জল ভাষায় রবীন্দ্রনাথের কবিতা ব্যাখ্যা করতেন। এসময় কেউ কথা বললে ক্ষেপে যেতেন। রঞ্জিত চৌধুরী বাচ্চু খুব দুষ্ট ছিলো। সে ইচ্ছে করেই কথা বলতো। এরপর স্যার তার লম্বা চুল ধরে টানতেন। তখন তার পাশে উপবিষ্ট ফারুক মার খাওয়ার ভয়ে চুপ করে বাইরে চলে যেতো। আলতাফুর রহমান স্যার খুব রসিক ছিলেন। তিনি ছিলেন অতিমাত্রায় কৃষ্ণকায়। মদরিস খান স্যার খুব ফুর্তিবাজ লোক ছিলেন। স্কাউট ক্যাম্পফায়ারে তিনি সক্রিয়ভাবে অংশ নিতেন এবং সবাইকে হাসাতেন। পরে সবকিছু ছেড়ে দিয়ে ধর্মকর্মে মনোনিবেশ করেছিলেন। কামরুল ইসলাম স্যার বেশ রাগী ছিলেন। একদিন ড্রয়িং ক্লাসে রেগে গিয়ে ডাস্টার ছুড়ে মেরেছিলেন। মাথায় লেগেছিল আমাদের চাইতে এক বছরের সিনিয়র ছাত্র গণির। স্কাউট হিসেবে আমি লাহোর জাম্বুরি এবং যশোর ও সিলেট র‌্যালিতে যোগদান করি। কামরুল ইসলাম স্যারের নেতৃত্বে¡ আমরা সব সময় জাম্বুরি বা র‌্যালিতে ক্যাম্পক্র্যাফটে প্রথম পুরস্কার পেতাম। রেজান আলি স্যার রাশভারী লোক ছিলেন। খুব কম কথা বলতেন। তবে অবসর সময়ে সিগার খেতেন। সুলেখক আব্দুর রহীম স্যার সকলের প্রিয় ছিলেন। কোন ছাত্র লেখালেখি করতে চাইলে তিনি উৎসাহ দিতেন। আমি তখন থেকেই লিখতে শুরু করি। তিনি অত্যন্ত আনন্দের সঙ্গে আমার কাঁচা হাতের লেখা শুদ্ধ করে দিতেন। তিনি স্কুল কো-অপপরেটিভ সোসাইটির সম্পাদক ও স্কুল ম্যাগাজিনের ভারপ্রাপ্ত শিক্ষক ছিলেন। তিনি সতীর্থ মলয় ভৌমিক ও আমাকে স্কুল ম্যাগাজিনের তৃতীয় সংখ্যার (১৯৬০Ñ৬১) সম্পাদক নিযুক্ত করেছিলেন। সিলেটের রাগীবÑরাবেয়া ফাউÐেশন ২০১১ সালে যে দশ ব্যক্তিকে একুশে সম্মাননা প্রদান করে তার মধ্যে আব্দুর রহীম স্যার ও আমি ছিলাম। একই মঞ্চে গুরু ও শিষ্য। আমার জীবনের সবচাইতে সার্থক ও আনন্দমুখর ছিল সেদিনের সন্ধ্যাটি। রহীম স্যার এখনও বেঁচে আছেন। বয়সের ভারে নূয়ে পড়েননি, সুস্থ ও স্বাভাবিক জীবনযাপন করছেন। মোকাররম আলি স্যার খুব অমায়িক লোক ছিলেন। সকলের সঙ্গে ঠাট্টা-মস্করা করতেন। অনেক বছর পর কামিনী স্যারের সঙ্গে দেখা করতে মৌলভীবাজারে তাঁর বাসায় গিয়েছিলাম। তাঁর দৃষ্টিশক্তি লোপ পেয়েছিল। তারপরও ছাত্র পড়াচ্ছিলেন। অত্যন্ত খুশি হয়েছিলেন আমাকে পেয়ে। ছাত্রদের বললেন, ‘দেখো, খোঁজ করে আমাকে দেখতে এসেছে। এরা আমার হাতেগড়া ছাত্র। আজ আনন্দে আমার বুক ভরে গেছে’। শৈলেশচন্দ্র স্যারকে কিছুদিন পেয়েছিলাম। পাকিস্তানের জাতীয় সঙ্গীত ‘পাক সর জমিন’ চালু হওয়ার আগে আমাদের স্কুলে সকালের এসেম্বলিতে গান গাইতেন শৈলেশচন্দ্র স্যার। তার সঙ্গে কণ্ঠ মিলাতে হতো ছাত্রদের। কোনোদিন ‘পূরব বাংলার শ্যামলীমায়/পঞ্চনদীর তীরে অরুণীমায়,’ কোনোদিন ‘সংশয় বিঘেœর জিঞ্জির ভাঙ্গি/আমরা এনেছি পাকিস্তান’। তিনি আরেকটি গান গাইতেন: ‘যদি কিছু দাও মোরে দান, হে ভগবান/ কণ্ঠ ভরিয়া দিও গান’। পরে পাকিস্তানি কায়দায় ‘ভগবান’ শব্দটির বদলে ব্যবহার করা হতো ‘রহমান’। শৈলেশচন্দ্র দেব বিজ্ঞানের শিক্ষক ছিলেন। তবে স্কাউটিং-এ তার খুব সখ ছিল। আমাদের নিবেদিতপ্রাণ শিক্ষকরাই ছিলেন সত্যিকারের মানুষ গড়ার কারিগর। আমরা তাদের ভালবাসা পেয়েছি, পেয়েছি আশীর্বাদ। স্কুল জীবনের শিক্ষাই ছিল আমাদের মূলধন, পরবর্তী জীবনের পাথেয় এবং চালিকা শক্তি। আমরা সব সময় তাদের প্রতি শ্রদ্ধাশীল ছিলাম। স্কুল ছাড়ার পর যখনই তাদের সঙ্গে দেখা হয়েছে পা ছুঁয়ে কদম্বুসি করেছি। বুকে জড়িয়ে ধরেছেন, আশীর্বাদ করেছেন। তারা আমাদের নমস্য।
দুরন্তপনা :অন্য স্কুলের ছাত্রদের চাইতে আমরা কম ডানপিটে ছিলাম না। একটি ঘটনা মনে পড়ছে। স্কুলের অনতিদূরেই ছিল লঞ্চঘাট। পাক ওয়াটার ওয়েজ কোম্পানির লঞ্চ চলতো ছাতক, ধর্মপাশা, মোহনগঞ্জ ও অন্যান্য স্থানে। লঞ্চ কর্তৃপক্ষ ছাত্রদের কাছ থেকে অর্ধেক ভাড়া নিতো। কিন্তু একদিন আমাদের ক্লাসের এক ছাত্রের সঙ্গে ভাড়া নিয়ে ঝগড়া হলে লঞ্চের কর্মচারিরা তাকে মারধোর করে। খবর পাওয়ার পর আব্দুল আহাদ চৌধুরীর (আহাদ মিয়া) নেতৃত্বে আমরা হানা দিলাম লঞ্চে। শুরু হলো ইটপাটকেল নিক্ষেপ ও ভাঙ্গচুর। কলেজের ছাত্র সৈয়দ রফিকুল হক সোহেল ছিলেন যাত্রী। আমরা তাকে চিনতাম না। ছাত্ররা ধরে নিয়েছিল তিনি বোধহয় লঞ্চের কেরানি। আহাদ মিয়া তাকে বেদম মারপিট করে। অবশ্য পরিচয় পাওয়ার পর সবাই ক্ষমা চেয়েছিল। পরবর্তীকালে তিনি আইনজীবী হন এবংরাজনীতিতে জড়িয়ে পড়েন। তিনি সুনামগঞ্জ-১ আসন (তাহিরপুরÑধর্মপাশাÑজামালগঞ্জ) থেকে সংসদ সদস্যও নির্বাচিত হয়েছিলেন। লঞ্চ কোম্পানির ম্যানেজার তোতা মিয়া ও একাউনটেন্ট আব্দুস সালাম ক্ষমা চাওয়ার পর আমরা সেদিন নিবৃত্ত হয়েছিলাম। এর পর লঞ্চ কোম্পানির সঙ্গে আর বিরোধ বাধেনি। আরেকটি ঘটনা। আমরা তখন দশম শ্রেণীতে। স্কুলের টিফিনের মান খারাপ হয়ে গেছে। অভিযোগ করেও কোন ফল হচ্ছে না। হঠাৎ হেডমাস্টার স্যারের কাছে এক খোলা চিঠি। স্বাক্ষরকারী ক্লাসের সব ভাল ছাত্র: গুরুদাস, লিয়াকত, শামসুল হুদা, আজিরউদ্দিন, হেমেন্দ্র, উপেন্দ্র প্রমুখ। আসলে তারা কেউ সই করেনি। কে বা কারা তাদের নাম ব্যবহার করেছে। তবে তাদের উদ্যোগ বৃথা যায়নি, উন্নতমানের টিফিন সরবরাহ শুরু হয়।
আমাদের বাসার পূবদিকে একটি পাকা দালান ছিল। এখনও আছে। সবাই বলতো : ভাটিপাড়ার বাসা। মামলাÑমোকদ্দমা বা বিভিন্ন কাজে তখনকার মহকুমা শহরে এলে যাতে পান্সি নৌকায় রাত কাটাতে না হয় সেজন্য ভাটিপাড়ার জমিদার এই বাড়িটি তৈরি করেছিলেন। অধিকাংশ সময়ই বাড়িটি খালি থাকতো বলে অনেকের নজর ছিল এই দালানের উপর। বাংলাদেশ রাইফেলস বা বিডিআর (বর্তমান নাম বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ বা বিজিবি) সেটি রিকুইজশন করে নেয়। বহুদিন তাদের দখলে ছিল। পরে তারা ষোলঘর চলে গেলে মালিক বাড়িটি বিক্রি করে দেন। এখন শহরে আরও অনেক সুন্দর দালান হয়েছে, তাই ভাটিপাড়ার বাসার কথা কেউ আর তেমন বলে না।হাসন নগর নওজোয়ান ক্লাব নামে আমাদের একটি ফুটবল টিম ছিল। মরাটিলার কাছে সরকারি জুবিলি হাই স্কুলের সহকারি প্রধান শিক্ষক মোহাম্মদ আলী স্যারের পতিত জমিটি ছিল আমাদের খেলার মাঠ। ক্লাবের কয়েকজন সদস্যের নাম এখনও মনে আছে : হোসেন তওফিক চৌধুরী (আইনজীবী), আব্দুল মুকিত চৌধুরী পাশা (সেনাবাহিনীর অবসরপ্রাপ্ত মেজর), শাকিরউদ্দিন আহমদ (অবসরপ্রাপ্ত অতিরিক্ত সচিব), শওকত আলী, শিহাবউদ্দিন আহমদ (ব্যবসায়ী), প্রয়াত আবুল ফাত্তাহ মো. মনসুর বাবু, আব্দুল হক চৌধুরী (চিকিৎসক, ইংল্যান্ড প্রবাসী), শোয়েব আহমদ চৌধুরী (আইনজীবী), সাব্বির আহমদ চৌধুরী (ব্যবসায়ী), সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী আনসার (অবসরপ্রাপ্ত আনসার কর্মকর্তা), বেলায়েত আলী বিলাত, সমির ও প্রয়াত লিয়াকত আলী (বীর মুক্তিযোদ্ধা)। আমাদের প্রতিযোগিতা হতো ষোলঘর ক্লাবের সঙ্গে। খেলোয়াড়ের বয়স নয়, উচ্চতাই ছিল খেলায় অংশগ্রহণ করার মাপকাঠি। যারা লম্বাটে ছিল আমরা তাদের কোমরে শক্ত করে বেল্ট বেঁধে দিতাম। ফলে তার দৈর্ঘ্য কমে যেত। আমি সব সময় খেলার সুযোগ পেতাম না, তবে হাফটাইমে খেলোয়াড়দের সঙ্গে লেবু খেতে খুব ভালো লাগতো।
শেষকথা :টাউন মসজিদের পাশে আহাদ মিয়ার চায়ের দোকানের একটি ঘটনা এখনও ভুলিনি। একদিন মরাটিলার মাঠে ফুটবল খেলা শেষে কয়েকজন বন্ধু বাসায় ফিরছিলাম। হঠাৎ দেখি পাঁচ টাকার একটি কড়কড়ে নোট রাস্তায় পড়ে আছে। পথচারীদেরএই নোটের কথা জিজ্ঞেস করলে কেউ এরদাবিদার হলো না। আমি টাকাটা রাস্তায়ই রেখে দেওয়ার পক্ষপাতি ছিলাম। কিন্তু অন্যরা বলল, রাস্তায় ফেলে রাখলে কেউ নিয়ে যাবে। এর চেয়ে কারো কাছে এটি রাখ, কি করতে হবে কাল সিদ্ধান্ত নেব। পরদিন আহাদ মিয়ার চায়ের স্টলে এই টাকা দিয়ে সবাই মিলে পরোটা-মিষ্টি খাই। আহাদ মিয়া আমাদের পাড়ায়ই থাকতেন। তিনি কথাচ্ছলে আমার বাবাকে বললেন, ‘গতকাল আপনার ছোট ছেলে ও তার বন্ধুরা আমার দোকানে এসে মিষ্টি খেয়ে গেছে’। বাবা আমাকে জিজ্ঞেস করলে পুরো ঘটনা তাকে খুলে বললাম। তাঁর প্রশ্ন ছিল : ‘এই টাকার মালিক কি তোমরা ছিলে ?’ বললাম, ‘না’। তিনি বললেন, ‘তাহলে পরের টাকা নিলে কেন ? এটা তো চুরির সমান।’ এরপর লাঠি দিয়ে বেদম প্রহার করলেন বাবা। শেষে বললেন, ‘জীবনে কোনোদিন পরের জিনিসে হাত দিবে না।’ এই প্রহার আমার জীবনে কাজে লেগেছে। সেই থেকে আমার নিজের না হলে আমি অন্যের জিনিসে হাত দিই না। কয়েকবারই এরকম টাকা আমার সামনে এসেছে; কিন্তু আমি স্পর্শও করিনি। জীবনভর আমি নির্লোভ, বিশ্বস্ত, কর্মঠ, কর্তব্যপরায়ণ পেশাজীবী, শিষ্টাচারপূর্ণ, বাস্তববাদী, স্বাধীন, আরামপ্রিয় ও হিতৈষী থাকার চেষ্টা করেছি। তবে নীতির প্রশ্নে আমি কখনও আপোস করিনি। অবশ্য এজন্য আমাকে বেশ খেসারত দিতে হয়েছে। আহাদ মিয়ার চাÑস্টলের ঘটনাটি ছিল আমার চরম শিক্ষা, জীবন গঠনে পদে পদে কাজে লেগেছে।*
*হাসান শাহরিয়ার: প্রবীণ সাংবাদিক, কলাম লেখক ও বিশ্লেষক; দৈনিক ইত্তেফাকের সাবেক নির্বাহী সম্পাদক, আন্তর্জাতিক সংবাদ সাময়িকী নিউজউইক ও ভারতের ড্যাকান হেরাল্ডÑএর বাংলাদেশ প্রতিনিধি; কমনওয়েলথ জার্নালিস্ট অ্যাসোসিয়েশনের (সিজেএ) ইন্টারন্যাশনাল প্রেসিডেন্ট ইমেরিটাস ও জাতীয় প্রেসক্লাবের সাবেক সভাপতি।
ঢাকা, ২৭ জুলাই ২০১৯।