‘আমার ভাইরে না খাওয়াইয়া মারছে’

স্টাফ রিপোর্টার
‘আমার ভাইরে বুকে আইন্না দাও। তোমরাও তো মায়ের সন্তান বইনের ভাই। তোমরার কাছে আমার আবদার, আমার ময়নারে আমার বুকে আইন্না দাও। আমার অতো সুন্দর ময়না গো, আমার ময়নারে না খাওয়াইয়া (খাইয়ে) মারছে গো। আমার ভাইরে আধাটা (অর্ধেক) রুটি দিছে গো। আধা রুটি খাইয়া ছটফটিয়ে মরছে গো। ২১ দিন এই আধাটা রুটি খাইয়া (খেয়ে) মরছে গো।’
এভাবেই ছবি বুকে নিয়ে বিলাপ দিয়ে কেঁদে কেঁদে ছোট ভাইয়ের করুন মৃত্যুর কথা বলছিলেন বিশ্বম্ভরপুর উপজেলার দক্ষিণ বাধাঘাট ইউনিয়নের সিরাজপুর গ্রামের আব্দুল মোতালিবের মেয়ে ও সৌদি আরবে নিহত আকবরের বড় বোন লাকিয়া খাতুন।
অসচ্ছল পরিবারে সচ্ছলতা আনতে ৫ ভাইয়ের মধ্যে সবার ছোট মো. আকবরকে সৌদি আরবে পাঠায় তার পরিবার। ইন্টারমিডিয়েট পাশ করে কিস্তি ও জমি বিক্রির টাকায় গত মার্চ মাসে বিদেশ পাড়ি জমান আকবর। একই গ্রামের মো. জালাল উদ্দিনের ছেলে সৌদিপ্রবাসী শহিদ মিয়ার মাধ্যমে গ্রামের ৪ জন যুবক একসাথে বিদেশে যান।
কোম্পানির ভিসায় ৪ লক্ষ টাকার চুক্তিতে সৌদি গিয়ে ৩ মাস পর সেখানে অবৈধ হয়ে যায় তারা। সৌদিপ্রবাসী দালাল শহিদ তাদের আকামা লাগিয়ে কাজ পাইয়ে দেয়ার কথা বলে সবাইকে নিয়ে যায় মরুভূমিতে। কাজ পেতে টাকা লাগবে বলে দেশে তাদের পরিবারের কাছ থেকে আরও অতিরিক্ত টাকা নেয় শহিদের বাবা মো জালাল উদ্দিন। কাজের অভাবে দুর্গম মরুভূমিতে দীর্ঘদিন অনাহারে, অর্ধাহারে, বিনা চিকিৎসায় শনিবার (৫ নভেম্বর) ৪ জনের মধ্যে মো. আকবরের মৃত্যু হয়।
আকবরের মৃত্যুর খবর দেশে আসলে শোকে কাতর হয়ে যায় পুরো পরিবার। ছেলের এমন অমানবিক মৃত্যুর কথা শুনে অসুস্থ হয়ে পড়েন মা, স্যালাইন লাগিয়ে রাখতে হচ্ছে তাকে। কাঁদতে কাঁদতে বার বার মুর্ছা যাচ্ছেন আকবরের ভাই ও বোন। এমন করুন মৃত্যুর সংবাদে আকবরের বাড়িতে ছুটে আসছেন তার আত্মীয়—স্বজন ও গ্রামবাসীরা। টাকার লোভে না খাইয়ে আকবরকে হত্যা করা হয়েছে বলে থানায় লিখিত অভিযোগ জানিয়েছেন তার বড় ভাই আব্দুস সালাম।
আব্দুস সালাম বলেন, কোম্পানির কাজ দিবে বলে ৪ লক্ষ টাকা দিয়ে আমার ভাইকে বিদেশ নিয়েছে। কোম্পানিতে না নিয়ে কয়েকদিন তার (দালালের) বাসায় রাখছে। পরে আমার ভাইকে নিয়ে গেছে মরুভূমিতে। সেখানে তাদের কোনো খাবার, কাপড়, চিকিৎসা কিছুই দেয়া হয়নি। মরুভূমিতে আমার ভাই না খেয়ে মারা গেছে। প্রধানমন্ত্রীর কাছে দাবি আমার ভাইয়ের লাশটা দেশে নিয়ে আসতে চাই।
আকবরের পিতা আব্দুল মোতালিব বলেন, জালাল উদ্দিন ও তার বউ আমাদের কাছ থেকে টাকা নিয়ে আমার ছেলেকে বিদেশ পাঠিয়েছে। আকাম দিবে দিবে বলে আকামা দেয়নি। খুব কষ্টে জীবন পার করছে আমার পুতে (ছেলে)। মরুভূমি পাঠাইয়া কোনো খোঁজ খবর নেয়নি। খাবার নাই, বিছনা নাই, পানি নাই। একটা রুটি ৪ জনে ভাগ করে খেয়েছে। কপি এনে লবন দিয়ে সিদ্ধ করে খাইছে। কলিজা ফেটে গেছে আমার। এখন আমার ছেলের লাশটা চাই, নিজ হাতে ছেলেকে মাটি দিতে চাই।
এদিকে একসাথে থাকা রাসেল, নুর আলম সহ বাকি ৩ জনেরও একই অবস্থা। বেঁচে থাকার প্রয়োজনীয় রসদ পাচ্ছেন না বলে জানিয়েছে তারা। দুঃখে—কষ্টে মানবেতর জীবন পার করছে জানিয়ে বিদেশ থেকে দেশে ফেরার আকুতি জানিয়ে পরিবারের কাছে ভিডিও পাঠিয়েছে ঐ ৩ যুবক। আকবরের মৃত্যুর পর তারা আরও বেশি আতঙ্কিত হয়ে পড়েছে। আকবরের বাড়িতে এসে কেঁদে কেঁদে ছেলেদের আসার অপেক্ষা করছেন তাদের বাবা—মা। এই বাবা—মাদের এখন একটাই দাবি দ্রুত জীবিত অবস্থায় দেশে ফিরিয়ে দেয়া হোক তাদের সন্তানদের।
নুর আলমের বাবা মিরাজ মিয়া বলেন, জালাল আর শহিদকে প্রথমে দিয়েছি ৪ লাখ টাকা। আকামা লাগাবে বলে পরে আরও ২০ হাজার দাবি করলে ১৫ হাজার টাকা দিয়েছি। এরপর মক্কা থেকে আমার ছেলেকে মরুভূমি নিয়ে গেছে। সেখানে তারা ৪ জনের মধ্যে একজন মারা গেছে। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার কাছে আমি বিচার প্রার্থী ।
অভিযুক্ত জালাল উদ্দিনকে তার বাসায় গিয়ে না পাওয়া গেলেও তার স্ত্রী ও শহিদের মা রাজিয়া খাতুন অতিরিক্ত টাকা নেয়ার কথা স্বীকার করে বলেন, সৌদিতে তাদের কাজের পাইয়ে দিতে এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় নিতে এই টাকা লেগেছে। তবে আকবরের মৃত্যুতে নিজেও ব্যথিত বলে এটাকে স্বাভাবিক মৃত্যু দাবি করেন তিনি। তিনি বলেন, তাদেরকে এসি রুমে রেখে থাকা খাওয়ার ব্যবস্থা করা হয়েছে। রক্ত বিক্রি করে হলেও আকবরের মৃতদেহ দেশে পৌছাবে তার ছেলে শহিদ।
পুলিশ সুপার মো এহসান শাহ বলেন, আমি অভিযোগের বিষয়ে জেনেছি। শুনেছি ওই এলাকার ৪—৫ জনকে যে স্টেটাসে পাঠানোর কথা ছিলো তা করা হয়নি। জব দেয়ার কথা বলে নিলেও চাকরি দিতে পারেনি। অনাহারে, কষ্টে, মানবেতর জীবন করেছে। এ বিষয়ে একটি অভিযোগ পেয়েছি। তদন্ত করে বিশ্বম্ভপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তাকে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণের নির্দেশ দিয়েছি।