‘আমি আজ চোর বটে’

দুই বিঘা জমি কবিতায় রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর লিখেছিলেন‘এ জগতে হায় সেই বেশি চায় আছে যার ভূরি ভূরি/ রাজার হস্ত করে সমস্ত কাঙালের ধন চুরি।’ সমকালীন বাস্তবতা অনুধাবন করে কবি বুঝেছিলেন ক্ষমতাশালী রাজন্যবর্গ কাঙাল প্রজা সাধারণের ধর চুরি করতে রীতিমত সিদ্ধহস্ত। এতে তাদের বিন্দুমাত্র মনস্তাপ হয় না। বরং এই চৌর্যবৃত্তিকে তারা রীতিমত বাহাদুরি মনে করে আত্মশ্লাঘা অনুভব করেন। রবি ঠাকুরের যুগের পর শতাব্দী পেরিয়ে গেলেও বাস্তবতা একটুও বদলায়নি। বরং ক্ষমতাসীনদের চৌর্যবৃত্তি এখন প্রাতিষ্ঠানিকতা পেয়ে গেছে। যে যত বেশি চুরি করতে সক্ষম সেই তত বেশি নমস্য আজকের এই সমাজে। সুতরাং কোনো একজন ইউপি সদস্যের কয়েক টন রড চুরি করার বিষয়টি আমাদের মূল মাথা ব্যথার কারণ হতে পারে না কিছুতেই। বরং তার এই তস্করপনাকে বাহাদুরির পরিবর্তে অবজ্ঞা অথবা তাচ্ছিল্যের দৃষ্টিতে দেখে মূলত কালে তার আরও বড় চোর হওয়ার পথটি আমরা আটকে দিতে চাইছি। একেই বলে অপরের সুখ কেউ সহ্য করতে পারে না। এই ইউপি সদস্য যদি রাস্তায় পড়ে থাকা কয়েক টন রড চুরির পরিবর্তে একটি প্রকল্প বানিয়ে এক কোটি টাকা মেরে দিতে পারত তাহলে তাকে মাথায় তুলে নাচানাচি শুরু হত। কিন্তু সে ওই পর্যায়ের ক্ষমতা অর্জন করতে পারেনি। মূলত সে রয়েছে কাঙালের স্তরেই। তাই এত হাঁকডাক। কাঙাল তো চুরি করে না বরং তার ধন চুরি হয়। ব্যতিক্রম করেই ফেঁসেছেন জনাব ফরিদুল ইসলাম কুটি, সদস্য, দরগাপাশা ইউনিয়ন পরিষদ, দক্ষিণ সুনামগঞ্জ। হ্যাঁ ভাই কুটি, আমরা সত্যিই দুঃখিত জনসমক্ষে আপনাকে অবজ্ঞার চোখে দেখা হলো বলে। আপনি আজ তিন টন রড চুরি করেছেন, তা রোজ কত হাজার কোটি টাকা গায়েব হয়ে পড়ে তার হিসাব এখন কেউ রাখে না। এই কয়দিনে পেঁয়াজের দাম বাড়িয়ে কত টাকা লুটে নিয়েছেন বণিক-অমাত্যরা কাঙাল জনগণের পকেট থেকে সেই হিসাবও কেউ চাইবে না। সকলের চোখ আপনার উপর। কারণ আপনি এখনও কুলীন স্তরে উঠে আসতে পারেননি। সম্ভবত আপনার সেই ইচ্ছাও ছিল না। নতুবা কেন নিজের পুরোনো চৌর্যকৌশলটি ছেড়ে আধুনিক চৌর্যকলা রপ্ত করার দিকে আপনি গেলেন না। সেই সিঁধ কাটা চুরির স্বভাব পালটাতে পারলেন না? তাহলে কেন ভোটে দাঁড়িয়ে ছোট হলেও একটি জনপ্রতিনিধির চেয়ার দখল করেছিলেন? আপনার যে ভবিষ্যৎ অন্ধকার তা বেশ পরিষ্কার। সুতরাং আপনার জন্য একটু কষ্ট অনুভব করা ছাড়া আমাদের করার আর কিছুই নেই।
কুটি, আপনি বরং এমন মানহানিকর চুরি করে অন্যদের মান খুইয়েছেন। এখন সকলেই বলবেন একজন নির্বাচিত জনপ্রতিনিধি রড চুরি করতে গিয়ে ধরা খেয়েছেন। নিজের চামড়া তো খসিয়েছেনই, অন্যেরটাও হালকা করার ব্যবস্থা করেছেন। এত নির্বোধ হয়ে কেন যে আপনি ভোটে দাঁড়ালেন তা ভেবে পাওয়া কঠিন কাজই বটে। আচ্ছা বলুন তো, সদস্য হওয়ার পর আপনি ধরা পড়েননি এমন ক’টা চুরি করতে পেরেছেন? যদি এই বিষয়ে একটি দীর্ঘ তালিকা দিতে পারেন তাহলে নাহয় আপনার রড চুরির নির্বোধপনা মাফ করার একটু চেষ্টা করা যেতে পারে। নতুবা আপনাকে সমাজচ্যুত করাটাই হবে একমাত্র প্রতিকার। রবিঠাকুরের দুই বিঘা জমির সেই মালির মতই আপনার অবস্থা হবে। আপনাকেও কম্পিত কণ্ঠে চরম আক্ষেপ গলায় নিয়ে বলতে হবে ‘‘আমি কহিলাম, ‘শুধু দুটি আম ভিখ মাগি মহাশয়।’/ বাবু কহে হেসে, ‘ব্যাটা সাধুবেশে পাকা চোর অতিশয়।’/ আমি শুনে হাসি আঁখিজলে ভাসি, এই ছিল মোর ঘটে/ তুমি মহারাজ সাধু হলে আজ, আমি আজ চোর বটে।’’