আমড়াগড়া’য় ৫ কিলোমিটারে কোনো বিদ্যালয় নেই

আকরাম উদ্দিন
বিশ্বম্ভরপুর উপজেলার সলুকাবাদ ইউনিয়নে আমড়াগড়া গ্রামের আশপাশে প্রায় ৫ কিলোমিটারের ভেতরে কোনো প্রাথমিক বিদ্যালয় নেই। এই কারণে প্রাথমিক শিক্ষা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে এলাকার শিশুরা। প্রতিদিন আমড়াগড়া গ্রাম থেকে পায়ে হেঁটে শিশু শিক্ষার্থীরা মহাকুড়া সরকারী বিদ্যালয়ে যেতে হয়। পাহাড়ি এলাকায় এই শিশুদের যানবাহন চড়ে বিদ্যালয়ে যেতে খরচ হয় বেশি। শিশু শিক্ষার অগ্রগতিতে আমড়াগড়া গ্রামে একটি প্রাথমিক বিদ্যালয় স্থাপনের দাবি এলাকাবাসীর।
সরেজমিনে গেলে এলাকাবাসী জানান, প্রায় ৩ শত ভোটারের গ্রাম আমড়াগড়ায় ১ শত ৫০টি কৃষক পরিবার রয়েছে। এসব পরিবারে আছে প্রায় ২ থেকে ৩ শত শিশু শিক্ষার্থী। এই আমড়াগড়া গ্রামের ৫ কিলোমিটারের মধ্যে কোনো প্রাথমিক বিদ্যালয় না থাকায় শিশুরা প্রাথমিক শিক্ষা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। আগামী প্রজন্মের সম্ভাবনাময়ী উজ্জ্বল ভবিষ্যত অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে। প্রায় ১০ বছর আগে এই গ্রামে ছিল এফআইভিডিবি’র প্রাক-প্রাথমিক বিদ্যালয়। শিশু শিক্ষার অগ্রগতিতে বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার জন্য ১৫ শতাংশ ভূমি দান করেন এলাকাবাসী। প্রাইমারী অ্যাডুকেশন প্রোগ্রাম (পিইপি) নামের শিক্ষা প্রকল্প বন্ধ হওয়ায় বিদ্যালয় কার্যক্রমও বন্ধ হয়ে যায়। তখন গ্রামবাসীর উদ্যোগে সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার জন্য একই স্থানে আরও ১৮ শতাংশ ভূমি দান করেন। বর্তমানে সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়ের নামে ৩৩ শতাংশ ভূমি দলিলমূলে রেজিষ্ট্রি করা হয়েছে। এই জায়গার উপর প্রাথমিক বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার জন্য চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন এলাকাবাসী। কিন্তু বিদ্যালয় ভবন প্রতিষ্ঠার বিষয়টি এখনও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের নজরে আসেনি। বিগত ১০ বছরে অসংখ্য শিশু প্রাথমিক শিক্ষা থেকে বঞ্চিত হয়েছে।
এই আমড়াগড়া গ্রাম থেকে ৪ কিলোমিটার উত্তরে বাংলাদেশ-ভারত সীমান্ত এলাকায় মহাকুড়া সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়, ৫ কিলোমিটার দক্ষিণে ধনপুর সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়, ৫ কিলোমিটার পূর্বে আদাং সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়, ৪ কিলোমিটার পশ্চিমে চিনাকান্দি সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয় রয়েছে। কিন্তু এসব বিদ্যালয়ে ১ জন শিশু শিক্ষার্থী যানবাহনে আসা-যাওয়া করতে খরচ হয় ৫০ থেকে ১ শত টাকা। হেঁটে গেলে ক্লান্ত হয় শিক্ষার্থীরা। শারীরিক ও মানসিক চাপে বিদ্যালয়ে যেতে অনীহা প্রকাশ শিক্ষার্থীদের। এই কারণে শিশুরা প্রাথমিক শিক্ষা থেকে বঞ্চিত হয়ে আসছে।
আমড়াগড়া গ্রামের ২য় শ্রেণীর শিক্ষার্থী সাদিয়া বেগম বলেন,‘আমি মহাকুড়া সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়ে লেখাপড়া করি। প্রতিদিন হেঁটে যেতে হয় আমাদের। বিদ্যালয়ে হেঁটে যেতে খুব কষ্ট হয়। ক্লাশে গিয়ে ক্লান্ত হয়ে পড়ি। পেটে ক্ষিদে লেগে যায়।’
একই বিদ্যালয়ের ৩য় শ্রেণীর শিক্ষার্থী হুমায়রা আক্তার বলেন,‘অনেক দুর মহাকুড়া সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়। এই বিদ্যালয়ে প্রতিদিন হেঁটে যেতে হয় আমাদের। বিদ্যালয়ে হেঁটে যেতে যেতে শরীর দূর্বল হয়ে যায়। যানবাহনে আসা-যাওয়া খরচ অনেক বেশি।’
একই গ্রামের ৩য় শ্রেণীর শিক্ষার্থী আব্দুর রহমান বলেন,‘মহাকুড়া প্রাথমিক বিদ্যালয় আমাদের গ্রাম থেকে প্রায় ৪ কিলোমিটার দুরে। অন্যান্য প্রাথমিক বিদ্যালয় আরও বেশি দুরে প্রায় ৫ কিলোমিটার। আমাদের প্রাথমিক শিক্ষা অর্জনের সুবিধার্থে আমড়াগড়া গ্রামে একটি বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা জরুরি প্রয়োজন।’
দুধপুর গ্রামের বাসিন্দা কৃষক ফয়জুল বারী বলেন,‘আমড়াগড়ায় প্রাথমিক বিদ্যালয় না থাকায় শিশু শিক্ষার্থীরা অনেক দুরে গিয়ে শিক্ষা অর্জন করতে হচ্ছে। কিন্তু এলাকার সকল শিশুরা দুরের বিদ্যালয়ে যেতে পারছে না। এই কারণে প্রাথমিক শিক্ষা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে অনেক শিশু।’
আমড়াগড়া গ্রামের বাসিন্দা আব্দুল হালিম বলেন,‘এনজিও স্কুল বন্ধ হওয়ার পর শিশুদের লেখাপড়া বন্ধ হয়ে গেছে। আশপাশের কয়েকটি গ্রামের শিশু প্রাথমিক শিক্ষা থেকে বঞ্চিত হয়ে পড়েছে।’
আজিজুল হক বলেন,‘আমড়াগড়া গ্রামে বিদ্যালয়ের জন্য ৩৩ শতাংশ জায়গা দলিলমূলে দান করা হয়েছে। এই জায়গার উপর এনজিও’র পরিত্যাক্ত একটি এলপেটেন স্কুল ঘর আছে। সরকারীভাবে বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করলে এলাকায় প্রাথমিক শিক্ষার অগ্রগতি হবে।’
মো. আব্দুল হানিফ বলেন,‘আমড়াগড়া গ্রামে একটি প্রাথমিক বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার দাবি আমাদের। দীর্ঘদিন ধরে এই দাবির বাস্তবায়ন না হওয়ায় প্রাথমিক শিক্ষার ধস নেমেছে এলাকায়।’
সাইফুল ইসলাম বলেন,‘প্রাথমিক শিক্ষাই মূল শিক্ষা। আমড়াগড়া প্রাথমিক বিদ্যালয় না থাকায় শিক্ষা থেকে বঞ্চিত শিশুরা।’
গ্রামীণ চিকিৎসক মোহাম্মদ আলী বলেন,‘আমড়াগড়া গ্রামের আশপাশে ৫ কিলোমিটারের ভেতরে কোনো প্রাথমিক বিদ্যালয় নেই। এই গ্রামে বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার জন্য ৩৩ শতাংশ ভূমি দলিলমূলে দান করা হয়েছে। দীর্ঘ ১০ বছর যাবত এলাকার শিশুরা প্রাথমিক শিক্ষা থেকে বঞ্চিত হয়ে আসছে। আমড়াগড়া গ্রামে একটি সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার দাবি আমাদের।
বিশ্বম্ভরপুর উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তা মোহাম্মদ সেলিম খাঁন বলেন,‘সলুকাবাদ ইউনিয়নে আমড়াগড়া গ্রামে প্রাথমিক বিদ্যালয় ভবন নির্মাণের বিষয়ে আমার কাছে কেউ আবেদন করেননি। তবে কেউ আবেদন করলে পরবর্তীতে ভবন নির্মাণ প্রকল্পে আমড়াগড়া গ্রামে প্রাথমিক বিদ্যালয় ভবন নির্মাণ বিষয়টি সংযুক্ত করব।’