আম বাজারজাতকরণে চাষী-ভুক্তার সরাসরি সংযোগ স্থাপন হতে পারে

ফেসবুক একটি শক্তিশালী সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম। বহু ঘটনায় বহুবার এর প্রমাণ পাওয়া গেছে। এই মাধ্যম ব্যবহার করে যেমন সমাজ সংসারের ভাল করা যায় তেমনি খারাপ কাজ করায়ও একই রকমের সমান কার্যকর এটি। ফেসবুকটি পারমানবিক শক্তির মতো। ব্যবহারকারীর ইচ্ছার উপর এর শুভাশুভ নির্ভরশীল। পারমানবিক শক্তি দিয়ে যেমন মানবকল্যাণ- বিদ্যুৎ উৎপাদন, চিকিৎসাসহ নানাবিধ কাজ করা সম্ভব তেমনি এই পারমানবিক শক্তি দিয়ে দুনিয়াজোড়া মানুষকে মেরে ফেলাও সহজ কাজ। এমন একটি শক্তিশালী সামাজিক মাধ্যমে তথ্যের অবাধ প্রবাহ নিশ্চিত করে মানুষকে প্রভূত পরিমাণে উপকার করা যায়।
ডিসি, সুনামগঞ্জ এর ফেসবুক পেজে দেখা গেল, উত্তরবঙ্গের আমচাষীদের নাম ও মোবাইল নম্বরসহ একটি তালিকা প্রচার করা হয়েছে, অনুরোধ করা হয়েছে, পাইকারি আম ব্যবসায়ীরা তাদের সাথে যোগাযোগ করে ব্যবসা করতে পারেন। এই পোস্ট দেখে ব্যবসায়ীরা উপকার পেতে পারেন। পোস্টে একজন মন্তব্য করেছেন, আমচাষী ও ভোক্তাদের মধ্যে সরাসরি সংযোগ স্থাপন করার বিষয়ে। আমরা জানি প্রচলিত বাজার ব্যবস্থায় অনুৎপাদক মধ্যসত্বভোগীদের দৌরাত্ম্য ও প্রতাপ প্রবল। এরা আড়ৎদার, পাইকার, খুচরা ব্যবসায়ী ইত্যাদি নামে পরিচিত। এদের কারণে উৎপাদক চাষী পণ্যের ন্যায্যমূল্য থেকে বঞ্চিত হন অন্যদিকে ভোক্তা সেই পণ্যই অতিরিক্ত মূল্য দিয়ে কিনতে বাধ্য হন। এতে মূল দুইটি শ্রেণি- উৎপাদক ও ভোক্তা উভয়েই ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হতে থাকেন। অনেকক্ষেত্রে উৎপাদক নামমাত্র মুনাফায় অথবা লোকসান দিয়ে পণ্য বিক্রি করেন আর সেই পণ্যই ভোক্তা কিনেন কয়েক গুণ বেশি দাম দিয়ে। মাঝখানে লাভের বড় অংশ পকেটে ঢুকে ওই অনুৎপাদক মধ্যসত্বভোগীদের। এই লাভের বাজার ব্যবস্থা থেকে উৎপাদক ও ভোক্তাদের রেহাই দিতে অর্থনীতিবিদ ও বিশেষজ্ঞরা নানা সময়ে নানা ব্যবস্থা বাতলে দিলেও মূলত এখন পর্যন্ত বাজারের এই প্রচ- মুনাফামুখী ব্যবস্থাকে রোধ করতে পারেনি। সমবায় বাজার ব্যবস্থার মাধ্যমে চেষ্টা করা হয়েছিলো, এখনও হচ্ছে। বড় আকারে সমবায় বাজার ব্যবস্থাপনা একটি বড় আকারের কার্যকর ব্যবস্থা হিসাবে দাঁড়াতে পারে রাষ্ট্রীয় সমর্থন পেলে। এর বাইরে উৎপাদক ও ভোক্তার মধ্যে সরাসরি সম্পর্ক স্থাপনের মধ্য দিয়েও আরেকটি কার্যকর গণমুখী বিকল্প বাজার ব্যবস্থা চালুর সম্ভাবনা রয়েছে।
বর্তমান যুগকে বলা হয় তথ্যপ্রযুক্তির যুগ। ইন্টারনেট ও এ্যান্ড্রয়েড মোবাইল ফোন সুলভ হওয়ায় এখন পুরো পৃথিবী মানুষের হাতের মুঠোয়। বাংলাদেশের অধিকাংশ মানুষই মোবাইল ব্যবহার করেন। ব্যবহারকারীদের একটি বড় অংশ ইন্টারনেট ব্যবহারে সক্ষম। ইন্টারনেট ও এ্যান্ড্রয়েড মোবাইল উৎপাদক ও ভোক্তার মধ্যে সরাসরি সংযোগ স্থাপনের সুযোগ তৈরি করেছে যা সম্ভাবনাময় একটি বাজার ব্যবস্থা প্রচলনের সহায়ক হবে।
এখন সারা দেশে পরিবহন ও কুরিয়ারের বিশাল নেটওয়ার্ক রয়েছে। দেশের যেকোনো জায়গা থেকে দুই বা তিন দিনেই পণ্য আনা যায়। সরাসরি ক্রয়-বিক্রয় প্রক্রিয়াকে এই পরিবহন ব্যবস্থা আরও সহজ করে দিতে পারে। উত্তরবঙ্গের কয়েকটি জেলা উন্নত জাতের আম উৎপাদনের জন্য প্রসিদ্ধ। ওই জেলাগুলোতে রয়েছেন লক্ষাধিক আমচাষী। অন্যদিকে সারা বাংলাদেশে এই আমের ভোক্তারা অবস্থান করেন। আমচাষীদের দেশব্যাপী বিস্তৃত পরিবহনের সুবিধা নিয়ে সরাসরি ভোক্তার নিকট আম বিক্রি করার ব্যবস্থা করে দিলে মধ্যসত্বভোগীরা যে বিশাল মুনাফা লুটে নিত তার অবসান ঘটতে পারে। এই বিষয়ে আমচাষীদের সংগঠন অথবা স্থানীয় কৃষিবিভাগ ও প্রশাসন উদ্যোগ গ্রহণ করতে পারেন। এই ধরণের ক্রয় বিক্রয়ের জন্য আলাদা মোবাইল এ্যাপসও ব্যবহার করা যেতে পারে। আমচাষীরা সহনশীল মূল্য নির্ধারণ করে নিজেদের সাথে যোগাযোগের মোবাইল নম্বর দিলে ভোক্তারা সরাসরি চাষীদের সাথে যোগাযোগ করে ন্যায্যমূল্যে রসালো ও সুস্বাদু আমের স্বাদ গ্রহণ করতে পারেন। চাষীরাও পেতে পারেন উপযুক্ত মূল্য। উৎপাদিত আমের হয়তো সামান্য অংশই এই ব্যবস্থার অন্তর্ভুক্ত হবে, তাতে ক্ষতি কী? সময়ের ব্যবধানে ব্যবস্থাটি উৎকর্ষতা অর্জন করে অগ্রসর হবে।