আরেক অমূলক ধারণা-করোনা গরিবকে খাতির করে

করোনা গরিবকে ধরে না, এবার এমন একটি বিতর্ক তৈরি হয়েছে। বস্তি ও রোহিঙ্গা শরণার্থী শিবিরগুলোতে করোনা মহামারীর প্রকোপ উল্লেখযোগ্য মাত্রায় কম থাকার কারণে জনস্বাস্থ্য ও পুষ্টি বিশেষজ্ঞরা রীতিমতো কৌতুহল প্রকাশ করেছেন। প্রচারিত পরিসংখ্যান, পর্যবেক্ষণ, পরিচিত পরিবেশের বাস্তবতা; সবকিছুই কিন্তু এই সত্যই প্রকাশ করে মেহনতী মানুষ কম করোনাক্রান্ত হচ্ছেন। তবে যা সাদা চোখে দেখা যায় তার সবই সত্য বলে ধরে নেয়ার সুযোগ নেই, এমন কথাই সকল সময় বলে এসেছেন জ্ঞানীরা। কোনো কিছুকে সত্য বলতে গেলে প্রমাণ লাগে, লাগে পরীক্ষালব্ধ তথ্য ও উপাত্ত। বাংলাদেশে কিংবা বিশ্বে এমন কোনো বৈজ্ঞানিক পরীক্ষা বা স্টাডি হয়নি যার প্রেক্ষিতে বলা যেতে পারে করোনা মেহনতীদের খাতির করে। মন্ত্রী-এমপি, আমলা, ব্যবসায়ীদের করোনাক্রান্তের যে পরিসংখ্যান বানের ¯্রােতের মত ভেসে বেড়াচ্ছে তাতে আয়েশি অভিজাত সম্প্রদায় আতংকিত হয়ে পড়েছেন। দৃশ্যমান কোনো শত্রু কিংবা প্রতিবন্ধকতাকে যারা কখনও পরোয়া করেননি আজ তাদের অসহায়ত্ব, বেঁচে থাকার জন্য ঘরবন্দি জীবন যাপন, তদুপরি করোনাক্রান্তের খবর শুনে আজ মনে হয়, অদৃশ্যমান এক জীবাণু বুঝি অভিজাতদের শত্রুরূপেই সামনে আবির্ভূত হয়েছে। অন্যদিকে গরিব মেহনতীরা বেপরোয়া। তারা কোনো স্বাস্থ্যবিধির ধার ধারছে না। করোনাকে তাচ্ছিল্য করে তারা চলছেন নিজেদের নিয়মে। করোনাকে পাত্তা না দেয়ার এক অসম সাহস দেখাচ্ছেন তারা। কী আশ্চর্য, করোনাও সেই কারণেই কিনা গরিবের কাছে আসছে কমই। করোনা গরিবকে কাবু করতে পারলে, যে গাদাগাদি অবস্থায় বসবাস করেন বস্তিবাসীরা; তাতে পরিস্থিতি অন্যরকম হত। আর এ কারণেই বিশেষজ্ঞরা পর্যন্ত বলতে বাধ্য হচ্ছেন, বস্তির প্রতি করোনার এমন অনাগ্রহ কেন তা নিয়ে স্টাডি করা প্রয়োজন। তাহলে কি এমন কথা বলার পরিস্থিতি এসেছে, করোনা গরিব শ্রমজীবীদের সত্যিই খাতির করছে?
না, এমন আত্মঘাতী কথা বলা ভয়াবহ রকম বিপদের। করোনায় বহু গরিব মানুষ মারা যাচ্ছেন। শিল্প পুলিশের তথ্য মতে ৩৮১ পোশাককর্মী আক্রান্ত করোনায়। তবে করোনাক্রান্তদের পেশাভিত্তিক তথ্য নেই কোথাও এটি সত্য। আর প্রচার প্রচারণার সবটুকু জায়গাজুড়ে থাকেন বিশিষ্টরা। তাই বিশিষ্টদের কথাই শুনা যায় বেশি। অবিশিষ্টরা লুকিয়ে যায়। অন্যদিকে শিক্ষিত ও বিশিষ্টরা সচেতন বেশি। তারা স্বউদ্যোগেই পরীক্ষা করান। তাদের পরীক্ষা করানোর সুযোগও বেশি। উপসর্গ না থাকলেও এই শ্রেণিটি সরকারি খরচে দামি করোনা পরীক্ষার সুযোগ ভোগ করতে পারছেন। তিক্ত হলেও সত্য, গরিব শ্রমজীবীদের যেমন সচেতনতা কম তেমন পরীক্ষার সুযোগ গ্রহণের জায়গায় তাদের প্রবেশাধিকারও অনেক বেশি কঠিন। তাই তারা পরীক্ষার ধারও ধারেন না। উপসর্গ না থাকলে তারা ভুলেও করোনায় আক্রান্ত হওয়ার আশংকা করেন না। জ্বর সর্দি কাশি হলে চিরকালের মতো তারা ফার্মেসি থেকে দুই একটা টেবলেট কিনে খান। পরীক্ষার জায়গায় সমান সুযোগের অভাবের কারণেই করোনায় শ্রমজীবীরা কী পরিমাণে আক্রান্ত হচ্ছেন তার সঠিক তথ্য পাওয়া যায় না। আর বাংলাদেশে করোনায় মৃত্যুহার, সৌভাগ্যজনকভাবে অনেক কম। তাই দুই চার দশ জন গরিব মারা গেলেও সেই কথা থেকে যায় প্রচারের অন্তরালে।
তবে এ কথাও সত্য, গরিব শ্রমজীবীরা তুলতুলে পুতুপুতু জীবনে অভ্যস্ত নন। তারা দামি কিন্তু স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর ফাস্ট ফুড জাংক ফুড খান না। তারা শরীরকে আয়েশের মধ্যে বন্দি করেন না। তারা অল্প দামের কচু ঘেচু লতা পাতা মলা ঢেলা পাঙাস পাতলা ডাল খেয়েই বাঁচেন। আর করেন পরিশ্রম। ফলে প্রাকৃতিকভাবে তারা রোগ প্রতিরোধী সুবিধা পেয়ে থাকেন। এই একটি জায়গায় তারা করোনা ভাইরাসের থেকে সুবিধা পেতে পারেন। গরিবের রোগ প্রতিরোধ বেশি বলে আত্মতৃপ্তি পাওয়ার উপায় নেই। কারণ গরিব শ্রমজীবীদের উপরই যাবতীয় ভাইরাস ও জীবাণুবাহিত রোগের আক্রমণ বেশি। তারা অপুষ্টিতে ভোগেন। অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে বসবাস করেন। বস্তুিবাসী ও শ্রমজীবীদের গড় আয়ুর পরিসংখ্যান হাতের কাছে থাকলে বুঝা যেত কত অকালে প্রাণ হারান তারা। গরিবকে করোনায় ডরায়, দয়া করে এই উদ্দেশ্যমূলক প্রোপাগান্ডা তাই বন্ধ করা উচিৎ।
পৃথিবীর সকল সম্পদহীন মানুষ আজ যাবতীয় অসাম্যের শিকার। উন্নয়নের সুষম বণ্টন সোনার হরিণের মতো অবাস্তব। দুনিয়ার ৯৫ ভাগ সম্পদের মালিক মাত্র ৫ ভাগ মানুষ। এই চরম অসাম্যের বিশ্বে করোনা সত্যিই যদি পক্ষপাতিত্ব করে গরিবকে খাতির করত তবে বোধ করি সেটি বঞ্চিতদের জন্য সুখেরই হতো। কিন্তু তা যে হবার নয়। ভাইরাস গরিবকেই বেশি ধরে। আজ না হোক কাল, স্বাস্থ্য ব্যবস্থার প্রগতিশীল বিকাশ না হলে করোনার স্বরূপ ঠিকই চিনা যাবে।