আরেক বিপাকে কৃষক

বিশেষ প্রতিনিধি
সুনামগঞ্জের হাওরাঞ্চলের সাড়ে তিন লাখ কৃষকের মধ্যে এক লাখ ৮৫ হাজার ৩০৫ জন কৃষক ঋণগ্রস্ত। এঁদের কাছে বিভিন্ন তফসিলি ব্যাংকের পাওনা ৭৯ কোটি ১৯ লাখ টাকা। সরকারি ক্রয় কেন্দ্রে ধান বিক্রির টাকা জমা হবে সোনালী ব্যাংক ও কৃষি ব্যাংকে কৃষকদের নামে খোলা ব্যাংক হিসাবে। ধান বিক্রির টাকা থেকে ব্যাংক ঋণের টাকা সমন্বয় করে নেওয়া হবে, এই ভয়ে ঋণগ্রস্ত কৃষকদের অনেকেই সরকারি ক্রয় কেন্দ্রে ধান বিক্রি করবে না। কৃষক নেতারা বললেন,‘জেলা কৃষি ঋণ কমিটির সভায় বা উপজেলা কৃষি ঋণ কমিটির সভায় স্থানীয় ব্যাংক কর্তৃপক্ষকে অনুরোধ করলেও একাধিক ব্যাংক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, ঋণ আদায় স্থগিত করার নির্দেশনা দিতে হবে ব্যাংকের উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে, তা না হলে এই অবস্থায় ঋণগ্রস্ত অনেক কৃষকই সরকারি খাদ্য গোদামে সুযোগ পেলেও ধান বিক্রি করবেন না।’
জেলার শাল্লা উপজেলার আনন্দপুরের একজন কৃষক নিজের নাম প্রকাশ না করার অনুরোধ জানিয়ে সোমবার এ প্রতিবেদককে জানালেন, কৃষি ব্যাংকে আমার অনাদায়ী ঋণ রয়েছে ৫৫ হাজার টাকা, ব্যাংকের একজন অফিসারের সঙ্গে কথা বলেছিলাম, তিনি জানিয়েছেন ধান সরকারি ক্রয় কেন্দ্রে বিক্রি করলে তাঁদের ব্যাংকে টাকা জমা হবে এবং তারা ঋণের টাকা কর্তন করবেন। সরকারি ক্রয় কেন্দ্রে ১ টন ধান দেবার সুযোগ পেলেও তিনি ওখানে ধান দেবেন না বলে সিদ্ধান্ত নিয়েছেন।’
আনন্দপুরের এই কৃষক কেবল নয়, আরও অনেক কৃষকই সরকারি ক্রয় কেন্দ্রে ধান দিয়ে টাকা ওঠাতে ঝামেলায় পড়েন কিনা, এই ভয়ে ধান নিয়ে যাবেন না।’
বিশ্বম্ভরপুর উপজেলার উপজেলা নির্বাহী অফিসার সমীর বিশ্বাস জানালেন, বিশ্বম্ভরপুরে এখনো ধানের দামের টাকা থেকে কোন কৃষকের ঋণের টাকা সমন্বয় করা হয়নি। তবুও সোমবার কৃষিঋণ কমিটির সভায় ব্যাংক ম্যানেজারদের অনুরোধ করা হয়েছে, ধানের দামের টাকা থেকে যেন কোন কৃষককে বাধ্য করে ঋণের টাকা কর্তন না করা হয়। বুঝিয়ে যদি আদায় করা যায়, তাহলে আদায় করা যেতে পারে। বাধ্য করে আদায় করা হলে অন্য কৃষকরা সরকারি ক্রয় কেন্দ্রে ধান বিক্রয় করবে না। কৃষকরা ধান বিক্রি করে উৎপাদন খরচসহ নানা খরচ মেটান, এক্ষেত্রে তারা বিপদে পড়বেন। গত মাসে জেলা কৃষিঋণ কমিটির সভায়ও একইভাবে অনুরোধ জানানো হয়েছে। সোমবার বিশ্বম্ভরপুরের কৃষি ঋণ কমিটির সভায়ও উপস্থিত ব্যাংক কর্মকর্তারা কথা দিয়েছেন তারা সেভাবেই করবেন।
সোনালী ব্যাংকের সুনামগঞ্জ শাখার ব্যবস্থাপক আতিকুল ইসলাম জানালেন, ফনি আক্রান্ত এলাকায় ঋণ আদায় বন্ধ রাখার নির্দেশনা রয়েছে। সুনামগঞ্জে পাওনা আদায় না করার কোন নির্দেশনা কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নেই। সেহেতু পাওনা আদায় করতেই হবে আমাদের। তিনি জানান, কৃষকরা কৃষিঋণ নেন অক্টোবর থেকে মার্চ মাস পর্যন্ত, সেপ্টেম্বরের ৩০ তারিখের মধ্যে এই টাকা পরিশোধ না করলে সেটি অনাদায়ী হয়ে যায়। অনাদায়ী হিসাবধারীর ব্যাংক হিসাবে টাকা জমা হলে সেটি ব্যাংক কর্তৃপক্ষকে সমন্বয় করতে হবে। এটিই নিয়ম বা আইন।
কৃষি ব্যাংকের সুনামগঞ্জের আঞ্চলিক পরিচালক খন্দকার সাইফুল্লাহ্ জানালেন, পাওনা টাকা আদায়ের অধিকার রয়েছে ব্যাংক কর্তৃপক্ষের। সংশ্লিষ্ট ব্যাংকের উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ ছাড়া অন্য কারো অনুরোধে ঋণ আদায় বন্ধ করতে ব্যাংকের কোন শাখাই বাধ্য নয়।’
বাংলাদেশ কৃষক সংগ্রাম সমিতির কেন্দ্রীয় আইন বিষয়ক সম্পাদক ধর্মপাশার বাদশাগঞ্জের বাসিন্দা খায়রুল বাশার ঠাকুর খান বলেন,‘কৃষিঋণ কৃষকরা তখনই পায় যখন তার চাহিদা অন্য কোনভাবে (মহাজনের কাছ থেকে ঋণ নেবার পর) মিটিয়ে নেয়। আবার এখন নানা প্রয়োজন মেটানোর জন্য চেষ্টা তদবির করে কিছু ধান সরকারি ক্রয় কেন্দ্রে দেবার পর, ওই ধান বিক্রয়ের টাকা ঋণের টাকায় সমন্বয় করে নিলে, সেটি হবে অমানবিক।
সুনামগঞ্জ জেলা কৃষক সমিতির আহ্বায়ক, জেলা সিপিবির সভাপতি চিত্তরঞ্জন তালুকদার মনে করেন, সরকার ধানই ক্রয় করছে সামান্য পরিমাণে। কোন কৃষকই এক টনের বেশি ধান ক্রয় কেন্দ্রে দিতে পারছে না। এরমধ্যে ওই টাকা ব্যাংকের ঋণে সমন্বয় হবার ভয়ে অনেকেই সরকারি ক্রয় কেন্দ্রে ধান নিয়ে যাবে না।