আর্সেনিক আক্রান্তের সংখ্যা বাড়ছে

বিশেষ প্রতিনিধি
ব্লো-আউটের প্রায় ১৪ বছর, টেংরাটিলা গ্যাসফিল্ডের আশপাশের এলাকাজুড়ে এখনো গ্যাস উদগিরণ হচ্ছে। পানিবাহিত রোগসহ গ্যাসফিল্ডের আশপাশের কয়েক গ্রামে নানা রোগ বালাই লেগেই আছে। গ্যাসফিল্ড থেকে রাষ্ট্রিয়ভাবে গ্যাস উত্তোলনের উদ্যোগ না নেওয়ায় জাতীয় সম্পদের সুরক্ষা হচ্ছে না। বিপন্ন পরিবেশের প্রভাব পড়ছে স্থানীয়দের উপর। স্থানীয়রা নিজস্ব প্রযুক্তিতে গ্যাস উত্তোলন করে ঝুঁকিপূর্ণভাবে ব্যবহার করছে। এলাকাবাসী গ্যাসফিল্ড বিস্ফোরণের কারণে নিজেদের ক্ষতিপূরণ যেমন চান তেমনি রাষ্ট্রীয় সম্পদের সুরক্ষাও প্রত্যাশা করেন।
২০০৫ সালের সাত জানুয়ারি রাত ১০ টায় টেংরাটিলা গ্যাসফিল্ডে প্রথম দুর্ঘটনা ঘটেছিল। দ্বিতীয় দফা বিস্ফোরণ ঘটেছিল একই বছরের ২৪ জুন রাত ২ টায়। প্রথম দফায় বিস্ফোরণের সময় আগুনের তাপে গভীর রাতেই গ্যাসফিল্ডের প্রডাকশন কূপের রিগ ভেঙ্গে আগুন ২০০ থেকে ৩০০ ফুট ওঠানামা করছিল। পরে এক মাসেরও বেশি সময় জ্বলার পর আপনা-আপনিই নিভে আগুন। দাউ দাউ করে জ্বলে ওঠা আগুন ১০ কিলোমিটার এলাকাজুড়ে আতঙ্ক ছড়িয়েছিল। কূপ এলাকার তিন কিলোমিটার দূরেও ভূ-কম্পন অনুভূত হয়েছিল। দু’দফা অগ্নিকান্ডে আশপাশের টেংরাটিলা, আজবপুর, গিরিশনগর, কৈয়াজুরি, টেংরাবাজার এবং শান্তিপুরের মানুষের ঘরবাড়ী, গাছগাছালি ও হাওরের ফসলি জমি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। বিস্ফোরণের পর থেকে এক দিনের জন্যও ঐ এলাকায় বুদ বুদ করে গ্যাস উঠা বন্ধ হয়নি। বসতঘর, উঠোন, পুকুর, কৃষিজমি, টিউবওয়েলসহ সকল স্থান দিয়েই বের হচ্ছে গ্যাস। অর্থাৎ টেংরাটিলার আশপাশের বাতাস গত ১৪ বছর ধরেই দূষিত হয়ে আছে। বিশেষ করে বিশুদ্ধ পানির সংকট এখানে লেগেই আছে। ভূ-গর্ভের পানিতে আর্সেনিক। উপরের পানিতে উদগিরণ হচ্ছে গ্যাস। একারণে রোগ বালাই এখানে লেগেই আছে। বিশেষ করে আর্সেনিকে আক্রান্তের সংখ্যা এখানে প্রতিমাসেই বাড়ছে। টেংরাটিলা গ্যাস ফিল্ডের পাশের গ্রাম গিরিসনগরেই রয়েছেন ১৫ জন আর্সেনিক আক্রান্ত ব্যক্তি। এছাড়া পাশের আজবপুর, টেংারাটিলা, শান্তিপুর ও কৈয়াজুরি এলাকায় আরো অনেকেই আর্সেনিক আক্রান্তের শিকার। আছে অন্যান্য বায়ু দূষণের রোগীও।
টেংরাটিলার বাসিন্দা সরকারি জুবিলী উচ্চ বিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক ফয়জুর রহমান বলেন, গ্যাসফিল্ড এলাকার আশপাশের সকল টিউবওয়েলের পানিতে আর্সেনিক। ভূগর্ভের উপরের পানিতে বুদ বুদ করে গ্যাস ওঠছে, বাতাসে গ্যাসের ঝাঁঝালো গন্ধ, চোখ-মুখ জ্বালাপোড়া হয়। এটি একদিন, একসপ্তাহ বা এক মাসের বিষয় নয়। গত ১৪ বছর ধরেই এমনটা হচ্ছে। একসময় নাইকো অনেক দূর থেকে ডিপ টিউবওয়েলের বিশুদ্ধ পানি এনে ট্যাংকি ভরাট করে রাখতো, বাড়ি বাড়ি সাপ্লাই হতো। এখন সেটি নেই। আমরা ৮ জন মিলে (আবুল কাসেম, ফয়জুর রহমান, আবুল হোসেন, জহুর মিয়া, আব্দুল মতিন, হাবিবুর রহমান, হবিবুর রহমান ও আব্দুল লতিফ) অনেক দূরে ডিপ টিউবওয়েল বসিয়ে পাইপের মাধ্যমে খাওয়ার পানি আনার ব্যবস্থা করেছি। আমার জানামতে গ্রামের জামাল মিয়াসহ কয়েকজন মিলে আরেকটি ডিপ টিউবওয়েল বসিয়ে এরকম বিশুদ্ধ পানির ব্যবস্থা করেছেন। গিরিসনগর, টেংরাটিলা, আজবপুর, শান্তিপুর ও কৈয়াজুরি’র অন্য বাসিন্দাদেরও বেশির ভাগেই আশপাশের টিউবওয়েলের পানি ব্যবহার করছেন, এ কারণে আর্সেনিক আক্রান্তের সংখ্যা বাড়ছে। শ্বাসকষ্ট, চর্মরোগ এবং চক্ষু’র নানা রোগে ভুগছেন অনেকে।
টেংরাটিলা কমিউনিটি ক্লিনিকের কমিউনিটি হেলথ প্রেভাইডার নজরুল ইসলাম জানালেন, তাদের হিসাব অনুযায়ী কেবল গিরিসনগর গ্রামেই ১৫ জন আর্সেনিক আক্রান্ত রয়েছেন। এরা হলেন, গ্রামের হারুনুর রশিদ (৪০), মুজিবুর রহমান (৪৫), এখলাছুর রহমান ফরায়েজি (৪১), ইলিয়াছুর রহমান (৩৯), মুখলেছুর রহমান ফরায়েজি (৩৮), কুহিনুর আক্তার (৩৫), গিয়াস উদ্দিন (৪৭), ওজুফা বেগম (৪৯), মনির হোসেন (৪৭), শফিুকুল ইসলাম (৪০), মো. মতি মিয়া (৫৫), সুফিয়া বেগম (৫২), মেওয়া বিবি (৬৫), জসিম উদ্দিন (৩৫) ও রুমেনা বেগম (৩৮)। এছাড়া আশপাশের গ্রামগুলোতে ৬২ জন আর্সেনিক আক্রান্ত রোগীর নাম পরিচয় তাদের স্বাস্থ্য কেন্দ্রে রয়েছে।
নজরুল ইসলাম জানালেন, ইতিপূর্বে উপজেলা, জেলা পর্যায়ের স্বাস্থ্য বিভাগের কর্মকর্তাদের কাছে এবং স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ে তারা এই রোগীদের তালিকা পাঠিয়েছেন।
জেলা ও উপেজলা স্বাস্থ্য বিভাগের নির্দেশে এসব রোগীদের নানা পরামর্শ ও চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে।
সিভিল সার্জন ডা. আশুতোষ দাস জানালেন, স্বাস্থ্য বিভাগের কর্মকর্তা কর্মচারীরা আন্তরিক ভাবেই টেংরাটিলার বিপদগ্রস্ত মানুষের পাশে আছেন। উপজেলা স্বাস্থ্য কর্মকর্তাগণসহ তিনি নিজেও এই এলাকায় মাঝে মধ্যে যাচ্ছেন, রোগাক্রান্ত মানুষের চিকিৎসার বিষয়ে পরামর্শ দিচ্ছেন।
জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ আব্দুল আহাদ টেংরাটিলার পরিবেশ-প্রতিবেশ মানুষের অনুকূলে নয় জানিয়ে বলেন, রাষ্ট্রীয় সম্পদ এখানে বিনষ্ট হচ্ছে, কিন্তু মামলাজনিত কারণে নতুন উদ্যোগ নেওয়াও সম্ভব হচ্ছে না।