‘আর করব না ধান চাষ দেখব এবার কী খাস’

চলমান বোরো মৌসুমে সুনামগঞ্জে সরকারিভাবে ৬৫০৮ মে. টন ধান কেনা হবে। পাশাপাশি ১৭ হাজার ৭৯৮ মে. টন আতব চাল এবং ১৪ হাজার ১৭৯ মে. টন সিদ্ধ চাল অর্থাৎ সব মিলিয়ে মোট ৩১,৯৭৭ মে. টন চাল কিনবে সরকার। ধান কেনা হবে কথিতমতে কৃষকদের নিকট থেকে আর চাল সরবরাহ করবে মিলাররা। সুনামগঞ্জের বিভিন্ন উপজেলায় সিদ্ধচালের মিল না থাকলেও সেখানে সিদ্ধ চালের বরাদ্দ রয়েছে। ধানের তুলনায় ৫ গুণ বেশি চাল কিনবে সরকার। অর্থাৎ কৃষকদের চাইতে ৫ গুণ বেশি সুবিধা পাচ্ছে মিলাররা। বৈষম্যটা পরিষ্কার। বোরো ধানে কৃষকদের প্রণোদনা দেবার নামে ন্যায্যমূল্যে খাদ্যশস্য ক্রয়ের সিংহভাগ সুফল দিয়ে দেয়া হচ্ছে ব্যবসায়ী-চালকল মালিকদের। মিলার ও ফড়িয়ারা বাজার কারসাজির নামে এখন ধানের বাজার দর ৫০০ টাকার বেশি উঠতে দিচ্ছে না। প্রতি মণে প্রায় দুই শ’ টাকা লোকসান দিয়ে চোখের জল ফেলে কৃষকরা কষ্টার্জিত ধান বিক্রি করছেন। সেই ধানকে চাল বানিয়ে খাদ্যগোদামে সরবরাহ করে মিলাররা প্রতি মণ চালে প্রায় ৬০০ টাকা করে মুনাফা তুলে নিবে। কৃষকদের প্রণোদনা দেবার নামে সরকার যে কর্মসূচী গ্রহণ করেছে সেখানে কৃষকরা মণপ্রতি দুই শ’ টাকা লোকসান দিচ্ছে আর মিলাররা প্রতি মণে মুনাফা তুলছে ৬ শ’ টাকা। কী অদ্ভুত প্রণোদনা। বলিহারি এমন প্রণোদনার। এই দুঃখেই আজ কৃষক নিজের ফলানো ধান খেতে আগুন দিচ্ছে। মনের কষ্টে শ্লোগান তুলছে- আর করব না ধান চাষ/ দেখব এবার কী খাস’। অথচ সদিচ্ছা থাকলে সরকার আরও বেশি পরিমাণ ধান কিনতে পারত। গুদাম নাই এই অজুহাত গ্রহণযোগ্য নয়। গুদামের বিকল্প ব্যবস্থা অনায়াসেই করা যেতে পারে। সংগ্রহ লক্ষ্যমাত্রা না বাড়ালে, শুধু চাল কেনার লক্ষ্যমাত্রাকে ধানে পরিবর্তিত করা হলে ৭ গুণ বেশি কৃষককে এই সুবিধার আওতায় আনা যেত। সুনামগঞ্জ জেলায় যে ৩১,৯৭৭ মে. টন চাল কেনা হবে সেটি না করে এর পরিবর্তে ৪৭,৯৬৫ মে. টন ধান কেনা সম্ভব ছিল। সেই ধানকে মিলারদের মাধ্যমে চালে পরিণত করাও কঠিন কোন কাজ নয়। মিল নির্ধারণ করে দিয়ে কৃষকদের মিলেই ধান সরবরাহ করার কথা বলা যেত। নীতিনির্ধারকরা সেটি করছেন না। কারণ নীতিগতভাবে তারা ব্যবসায়ী ও পূঁজিপতিদের লাভবান করতেই বিশ্বাসী। নীতির জায়গায় মৌলিক পরিবর্তন ভিন্ন কৃষকদের দুর্দশা ঘুচানোর কোন আশা নেই। তা তারা যত দুঃখ পেয়েই খেতে আগুন দেন আর ফসল ফলানো থেকে বিরত থাকুন না কেন।
দেশের মেরুদ- বলে বিবেচিত হয় যে খাত সেই খাতটিকে সর্বোচ্চ প্রণোদনা ও সহযোগিতা দান করা যেকোনো উন্নয়নপ্রত্যাশী রাষ্ট্রের কর্তব্য। প্রয়োজনের তুলনায় বেশি ধান হয়ে গেছে বলে হায় আফসোস করার প্রগলভতা মানানসই নয়। বেশি ধান হয়েছে. এ তো আনন্দসংবাদ। পৃথিবীতে বাজারের অভাব নেই। সেই বাজারে বাংলাদেশি চালের চাহিদারও অভাব নেই। উদ্বৃত্ত ধান সরকার বিদেশে রফতানি করবে, সেই পরিকল্পনা আগে থেকেই করে রাখবে সরকার। কিন্তু সরকারের দায়িত্বশীলদের কথাবার্তা শুনে আমাদের মনে হচ্ছে কৃষকরা বেশি ধান উৎপাদন করে যেন অতি বড় পাপ করে ফেলেছেন। এই দায়িত্বহীনতা ও অবহেলার প্রতিফল একদিন হাড়ে হাড়ে টের পেতে হবে। কৃষকরা কোন কারণে, এবং যে কারণটা স্পষ্ট হতে শুরু করেছে, যদি ধান উৎপাদন থেকে মুখ ফিরিয়ে নেয় তখন বুঝা যাবে কত ধানে কত চাল।